অসাধারণ ভূমিকায় কমিউনিটি ক্লিনিক || বিশ্বব্যাংকের স্বীকৃতি

আনোয়ার রোজেন : দেশের স্বাস্থ্যখাতের উন্নতিতে ‘অসাধারণ ভূমিকা’ রাখার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেল কমিউনিটি ক্লিনিক। বহুজাতিক দাতা সংস্থা বিশ্বব্যাংকের মতে, স্বাস্থ্যখাতে বাংলাদেশ সাম্প্রতিক সময়ে অভাবনীয় উন্নতি করেছে। এর মূলে রয়েছে কমিউনিটি ক্লিনিক ধারণা। এটি সাধারণ মানুষের হাতের নাগালের মধ্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেয়া নিশ্চিত করেছে। ফলে নবজাতক ও শিশুমৃত্যু, মাতৃমৃত্যু, প্রজনন হার নিয়ন্ত্রণে সাম্প্রতিক সময়ে ১০টি সূচকে সন্তোষজনক অগ্রগতি হয়েছে বলে মনে করছে বিশ্বব্যাংক।

সংস্থাটির সাম্প্রতিক এক মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০৭ সালে প্রতি হাজারে ৬৫ শিশু মারা যেত ৫ বছর বয়সের মধ্যে। ২০১৪ সালে এ সংখ্যা নেমে এসেছে প্রতি হাজারে ৪৬ জনে। এ হিসেবে শিশুমৃত্যুর হার কমেছে ২৯ শতাংশ। ১৯৯০ সালে দেশে নারীপ্রতি শিশুর জন্মদানের সংখ্যা ছিল গড়ে ৩ দশমিক ৩। সম্প্রতি নারীপ্রতি শিশুর জন্মদানের এ সংখ্যা নেমে এসেছে ২ দশমিক ৩-এ। ২০০৯ সালে ৪৩ শতাংশ শিশু শুধু মায়ের বুকের দুধ পান করত। ২০১৪ সালে এ হার উঠেছে ৫৫ শতাংশে। একই সময় জন্মের আগেই দক্ষ স্বাস্থ্য কর্মীর সেবা পাওয়া শিশুর সংখ্যা ৫৩ শতাংশ থেকে উঠেছে ৬৪ শতাংশে। প্রয়োজনের তুলনায় কম ওজনের শিশুর সংখ্যা ৪১ শতাংশ থেকে নেমে এসেছে ৩৩ শতাংশে।

বিশ্বব্যাংক বলছে, স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা এবং পুষ্টি সেক্টর উন্নয়ন কর্মসূচীর (এইচপিএনএসডিপি) সুবাদে এ অগ্রগতি সম্ভব হয়েছে। এইচপিএনএসডিপি’র আওতায় ২০১৪ সাল থেকে দেশে ১৩ হাজারের বেশি কমিউনিটি ক্লিনিক চালু রয়েছে। কর্মসূচীর আওতায় সচেতনতামূলক পদক্ষেপের কারণে প্রসবকালে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত স্বাস্থ্য কর্মীর সেবা নেয়ার হার ২১ শতাংশ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪২ শতাংশে। জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী ব্যবহারের প্রবণতা ৫৫ শতাংশ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬২ শতাংশে। হামের টিকা গ্রহণের প্রবণতা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৬ শতাংশে। ২৩ মাসের মধ্যে সবগুলো মৌলিক টিকা গ্রহণের হার এখন ৮৪ শতাংশ। এসব অগগ্রতির কারণে সাম্প্রতিক সময়ে দেশের মানুষের গড় আয়ুও বেড়েছে। প্রতিবেদনটিতে স্বাস্থ্যখাতের উন্নতির জন্য নেয়া সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের প্রশংসার পাশাপাশি চ্যালেঞ্জের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বিশ্বব্যাংকের তরফে বলা হয়েছে, সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এমডিজি) আওতায় ৫ বছরের কম বয়সী শিশুমৃত্যুর হার কমিয়ে বাংলাদেশ ২০১০ সালে জাতিসংঘের এমডিজি এ্যাওয়ার্ড অর্জন করেছে। এর পরও বাংলাদেশের অনেক মানুষ মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এর ফলে প্রতিদিন দেশের অর্থনীতির বিপুল পরিমাণ ক্ষতি হচ্ছে। তবে একই সঙ্গে তৃণমূল পর্যায়ে নারী, শিশু ও দরিদ্রদের উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে এইচপিএনএসডিপি ভাল ভূমিকা রাখছে। প্রকল্পের আওতাধীন উপজেলা হাসপাতালগুলোতে নিশ্চিন্ত ও নিরাপদ সেবা পাচ্ছেন গর্ভবতীরা। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে রনি নামে মাদারীপুরের এক নারী বলেছেন, আমার দ্বিতীয় পুত্র সন্তান সানির জন্ম হয়েছে বাড়ির কাছের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। সুস্থ শিশু হওয়ায় আমি খুব খুশি।

আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর ১৯৯৬ সালে সারাদেশে সাড়ে ১৩ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা নেয়া হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৯৮ সালে শুরু হয় প্রকল্পের কার্যক্রম। ২০০১ সাল পর্যন্ত সারাদেশে ১০ হাজার ৭২৩টি ক্লিনিক প্রতিষ্ঠা করা হয়। ২০০১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট ক্ষমতায় আসার পর বন্ধ করে দেয় এই প্রকল্পের কার্যক্রম। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রকল্পটি ফের চালু করে। ২০০৯ সালের জুলাই থেকে ২০১৪ সালের জুন পর্যন্ত সময়ের জন্য ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা ব্যয় নির্ধারণ করে প্রকল্পের কার্যক্রম শুরু হয়। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে আসায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি উন্নয়ন (এইচপিএনএসডিপি) কর্মসূচীর আওতায় মেয়াদ চলতি বছরের জুন পর্যন্ত।

বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়ন প্রতিবেদনে কয়েকটি চ্যালেঞ্জের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। স্বাস্থ্যখাতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দারিদ্র্য, চিকিৎসা উপকরণের অভাব, বিভিন্ন রোগের প্রকৃতির পরিবর্তনকে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, শতকরা হিসাবের পাশাপাশি প্রকৃত সংখ্যায়ও বাংলাদেশে অপুষ্টির শিকার নারী ও শিশুর সংখ্যা এখনও বেশি। তাছাড়া জনসংখ্যা বৃদ্ধি, নগরায়ণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে স্বাস্থ্যসেবার চাহিদা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। মোট দেশজ আয়ের (জিডিপি) তুলনায় পর্যাপ্ত রাজস্ব আহরণ না হওয়ায় সরকারের একার পক্ষে এ চাহিদা পূরণ করা অনেক কঠিন। অনেকেই সরকারের সরবরাহের বাইরে স্বাস্থ্যসেবা নিতে বাধ্য হচ্ছে। এর ফলে অনেক দরিদ্র মানুষ আরও দারিদ্র্যের শিকার হচ্ছেন।

তবে স্বাস্থ্য খাতে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে এর বাইরেও আরও কিছু চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করেছে সরকার। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দাতাদের অর্থছাড়ের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে সরকারী তহবিলের অর্থ ছাড় হচ্ছে না বলে জানানো হয়েছে। দক্ষ জনবলের স্বল্পতা ও দুর্গম এলাকায় স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের কাজ করার অনাগ্রহে মানসম্পন্ন সেবা দেয়া যাচ্ছে না। তাছাড়া গাইনি ও এনেসথেশিয়া বিভাগের চিকিৎসকের অভাবে উপজেলা পর্যায়ে প্রসূতি সেবা এখনও নিম্ন পর্যায়ে রয়েছে।

কেন্দ্রীভূত ক্রয় কার্যক্রম ও ক্রয় প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা এবং এডিপি বরাদ্দের স্বল্পতাকে কার্যক্রমের চ্যালেঞ্জ হিসেবে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। প্রতিবেদনে পুষ্টিসেবাগুলোকে কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে মূলধারায় সম্পৃক্ত করতে এবং সরকারী ও বেসরকারী উদ্যোগের মাধ্যমে নগর এলাকায় স্বাস্থ্যসেবার পরিধি সম্প্রসারণের কথাও বলা হয়।

প্রসঙ্গত, ২০১১ সালের ২৩ আগস্ট প্রায় ৫৭ হাজার কোটি টাকা ব্যয় ধরে কর্মসূচীটি একনেকে অনুমোদন দেয়া হয়। প্রকল্পে রাজস্ব খাতের আওতায় ব্যয় হবে প্রায় ৩৪ হাজার ৮১৭ কোটি টাকা। আর উন্নয়ন খাতে ব্যয় করা হচ্ছে প্রায় ২২ হাজার ১৭৭ কোটি টাকা। কর্মসূচী বাস্তবায়নে ৪৩ হাজার ৪২০ কোটি টাকা সরকারী তহবিল থেকে ব্যয় করা হচ্ছে। আর উন্নয়ন সহায়তা বাবদ বিদেশী উৎস থেকে আসছে প্রায় ১৩ হাজার ৫৭৬ কোটি টাকা। প্রকল্পে বিশ্বব্যাংকসহ ১৪ দাতা দেশ ও সংস্থা অর্থ সহায়তা দিচ্ছে। প্রথমে এ খাতে ৩৫ কোটি ৯০ লাখ ডলার ঋণ দেয়ার ঘোষণা দেয় বিশ্বব্যাংক। পরে এ প্রকল্পে আরও ১৫ কোটি ডলার সহায়তা দিতে ঋণ চুক্তি করে সংস্থাটি। সব মিলে এতে সংস্থাটির সহায়তা দাঁড়ায় ৫০ কোটি ৯০ লাখ ডলারে। দেশীয় মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ৪ হাজার ৭০ কোটি টাকা। এর বাইরে ডিএফটিএডি, ডিএফআইডি, জাইকা, ইকেএন, জিআইজেড, কেএফডব্লিও, কেওআইসিএ, এসআইডিএ, ইউএসএআইডি, আইডিএ, ডব্লিওএইচও, ইউএনআইসিইএফ, ইউএনএফপি ও ইউএনএআইডিএস ছাড়াও মোট ১৪টি দাতা দেশ ও সংস্থা প্রকল্পে সহায়তা দিয়েছে।

কর্মসূচীর উন্নয়ন অংশ ৩২টি অপারেশনাল প্ল্যানের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হচ্ছে। এর মধ্যে স্বাস্থ্য অধিদফতর ১৭টি, পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতর সাতটি, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় পাঁচটি এবং সেবা পরিদফতর, ওষুধ প্রশাসন অধিদফতর ও নিপোর্ট একটি করে প্ল্যান বাস্তবায়ন করছে।