আইনস্টাইন ছিলেন মানবতাবাদী মহান বিজ্ঞানী

অ্যালবার্ট আইনস্টাইন

অধ্যাপক শামসুল হুদা লিটন: বিজ্ঞানের বিস্ময়কর আবিস্কারের ক্ষেত্রে একটি নাম আইনস্টাইন । পৃথিবীতে  এ পর্যন্ত যত বিজ্ঞানীর জন্ম হয়েছে তার মধ্যে আইনস্টাইন শীর্ষস্থানীয়।পুরো নাম আলবার্ট আইনস্টাইন । আইনস্টাইন ১৮৭৯ খৃস্টাব্দের ১৪ মার্চ জার্মানীতে জন্ম গ্রহন করেন । বাবা হার্মান আইনস্টাইন ছিলেন নামকরা ইঞ্জিনিয়ার ।

বিজ্ঞানের জগতে আইনস্টাইন ছিলেন রূপকথার সম্রাট। ছাত্র জীবনেই তাঁর মেধা ও   প্রতিভার স্ফূরণ ঘটেছিল । তিনি ছিলেন বিশ্ববিখ্যাত তত্ত্বীয় পদার্থবিদ। আইনস্টাইন ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে  আপেক্ষিকতাবাদ উদ্ভাবন করেন । দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্যবহৃত পারমানবিক বোমার জনক হলেন আলবার্ট আইনস্টাইন । ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের হিরোসিমা ও রাগাসাকিতে তারই উদ্ভাবিত পারমানবিক বোমা নিক্ষেপের মারাত্মক পরিনতি দেখে তিনি নিজেকে  আর পরমাণু বিজ্ঞানী হিসেবে ভাবতে লজ্জাবোধ করতেন।আইনস্টাইন মানুষের কল্যাণে বিজ্ঞানকে ব্যবহারের জন্যই কাজ করেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন বিজ্ঞান মানুষের কল্যাণের জন্য, মানবতাকে ধ্বংস করার জন্য নয় । তিনি সব সময় মানুষের কল্যাণে কাজ করেছেন । তিনি মানুষকে খুবই ভালোবাসতেন। হিরোসিমা-নাগাসাকির ঘটনায় তিনি একজন বিজ্ঞানীর পাশাপাশি হয়ে উঠেছিলেন  মানবতাবাদী। জনগণের কল্যাণে উৎসর্গ করেছিলেন নিজেকে।

জার্মানীর হিটলার , ইতালীর মুসোলিনীর স্বৈরশাসনকে তিনি কখনো মেনে নিতে পারেননি।হিটলারের নাৎসী দলের পক্ষ থেকে আইনস্টাইনের মাথার মূল্য ধার্য করা হয়েছিল বিশ হাজার মার্ক । কিন্তুু তিনি  হিটলার–মুসোলিনীর  একনায়কতান্ত্রিতক স্বৈরশাসনের কাছে মাথা নত করেননি।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখন তারই সূত্র এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রয়োগ করে পারমানবিক বোমা তৈরী করে মানুষ ধ্বংস করার কাজে  পারমানবিক শক্তিকে ব্যবহার করলো তখন তিনি সিংহের মতো গর্জে উঠলেন। এর বিরুদ্ধে আইনস্টাইনের কন্ঠ প্রতিবাদী হয়ে উঠেছিল।প্রথম বিশ্বযুদ্ধ তিনি নিজ চোখে দেখেছিলেন ।দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কথা ভাবতেই তিনি আতংকিত হয়ে উঠেন।

আইনস্টাইন বিশ্বসেরা বিজ্ঞানী হলে ও বিশ্বরাজনীতির ব্যাপারে তিনি সচেতন ছিলেন। জার্মানী, ইতালীতে হিটলার-মুসোলিনীর  মতো চরম জাতীয়তাবাদী স্বৈরশাসকের উত্থানে তিনি শুনতে পেয়েছিলেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পদধ্বনি।পরবর্তীতে তারঁ ধারণা সত্যে পরিনত হয়েছিল ।

আইনস্টাইন এর চিন্তায় ছিল বিশ্বমানবতাবোধ। শোষণ নির্যাতনের বিরোদ্ধে তিনি সব সময় সোচ্চার ছিলেন।তারঁ মন ছিল মানবপ্রীতি ও বিশ্বমানবিকতায় ভরপুর।ব্যক্তি ও জাতির স্বাধীনতার প্রতি  আইনস্টাইনের ছিল গভীর অনুরাগ।হিটলার–মুসোলিনীর মতো একনায়কতান্ত্রিক উগ্র স্বৈরশাসককে  তিনি মনে প্রাণে ঘৃণা করতেন।তিনি তাদেরকে কখনো সহ্য করতে পারেননি।এসব জনধিক্কিত ফ্যাসীবাদী শাসকদের বার বার ধিক্কার জানিয়েছিলেন আইনস্টাইন।
১৯৩৯ সালে বেতার মারফত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের খবর শুনে আইনস্টাইনের মন বিপদের আশংকায়  ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে চির শান্তিবাদী  এই বিজ্ঞানী মানব জাতিকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষার জন্যে সৈনিকের ভূমিকায় অবতীর্ন হন। ইউরোপে হিটলার দানবের আবির্ভাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পৃথিবী ধ্বংস লীলায় পরিনত হতে পারে তা ভেবে তিনি দারুনভাবে বিচলিত ও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন।তার আশংকা ছিল জার্মান যদি পরমাণু বোমা তৈরী করে ফেলে এবং তা যদি ব্যবহার করে তাহলে পৃথিবীতে মানব সভ্যতা শেষ হয়ে যাবে।

১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দে ৬ আগস্ট মারানাক হ্রদে অবকাশ যাপন শেষে তিনি যখন নৌকাযোগে ফিরছিলেন তখন নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকার একজন রিপোর্টার তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করেন। নিউইয়র্ক পত্রিকার ওই সাংবাদিক আইনস্টাইনকে বললেন,“আজ হিরোসিমা শহরের উপর প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যানের নির্দেশে  পরমাণু বোমা নিক্ষেপ করা হয়েছে। আমার সম্পাদক এই সংবাদটা আপনাকে জানাতে বলেছেন।” একটু থেমে রিপোর্টার আরো বলতে থাকেন,“৬০ হাজারের বেশী লোক পারমানবিক বোমায় মারা গেছে। বিকিরন জনিত অসুখে আরো অনেক লোক  হয়তো মারা যাবে।” সাংবাদিকের কাছে হিরোসিমার শহরের ধ্বংসের ভয়াবহতা শুনে আইনস্টাইন একেবারে স্তম্ভীত হয়েগিয়েছিলেণ।তাঁর দেহ-মন  সম্পূর্ণ ভেঙ্গে পড়ে ছিল।তিনি অসুস্থতাবোধ করলেন । মনুষ্যত্বেও অবমাননায় তিনি বাকরুদ্ধ হয়ে গেলেন। সে সময় তাঁর এক বন্ধুকে দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে চিঠি লিখে জানিয়ে ছিলেন,“আমার আশংকা হয় এই পৃথিবী যত  দিন মানুষ থাকবে, ততো দিনই চলতে থাকবে হিংসার বীভৎস কান্ড।”

হিরোসিমা শহরে পরমাণু বোমা ফেলার পর থেকেই বিজ্ঞানী আইনস্টাইন একেবারে বদলে গেলেন। তাঁর মুখের হাসি যেন কোথায় মিলিয়ে গেল।সারাক্ষণ বিষন্নতায় ভুগছিলেন তিনি।

হিরোসিমা-নাগাসাকির ঘটনায় বিজ্ঞানীর খোলস থেকে বেরিয়ে এলেন আইনস্টাইন। তিনি হয়ে উঠলেন মানবতাবাদী আইনস্টাইন । মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি শান্তির পতাকা নিয়ে এক দেশ থেকে আরেক দেশে ঘুরে বেড়িয়েছেন। জীবনের শেষ ১০ বছর তিনি বিশ্বশান্তির জন্য নিজের জীবনকে বিলিয়ে দিয়েছিলেন। বিজ্ঞানের নতুন নতুন অবিস্কার ও গবেষণার চেয়ে পারমানবিক বোমার ধ্বংস ঠেকানোই প্রাধান্য পেয়েছিল তাঁর জীবনে।

হিরোসিমায় পারমানবিক বোমা ফেলার ঘটনায় অনুশোচনায় ভরে উঠলো তাঁর মন । তিনি বলেছিলেন,“আমি নিজেকে পারমানবিক বোমার জনক মনে করি না। এ ব্যাপারে আমার যেটুকু ভূমিকা ছিল তা ছিলো পরোক্ষ। আমার জীবিত কালেই এই বিস্ফোরণ ঘটাবে এটা  আমার চিন্তার বাইরে ছিল। তাত্ত্বিকভাবে এটা সম্ভব, আমি শুধু এইটুকুই বিশ্বাস করেছিলাম।”

আইনস্টাইনের এক জীবনীকার লিখেছিলেন, আইনস্টাইন নাকি বলেছিলেন, “এভাবে পরমাণু বোমা ব্যবহার করা হবে এটা যদি জানতাম, তাহলে আমি কখনো পরমাণু গবেষণা ব্যাপারে অগ্রসর হওয়ার জন্য মার্কিন সরকারকে চিঠি লিখে পীড়াপীড়ি করতাম না। তখন আমাদের সামনে ছিলো বেপরোয়া হিটলারী  আক্রমনের বিভীষিকা।”

হিরোসিমা-নাগাসাকিতে পরমাণু বোমা নিক্ষেপের ঘটনায় আইনস্টাইনের বিরুদ্ধে সমালোচনার তীব্র ঝড় বইতে শুরু করে। পারমাণবিক বোমার জনক হিসেবে আইনস্টাইনকে নানা সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। তিনি এই সমালোচানাকে স্বাভাবিক ভাবেই মেনে নিয়েছিলেন। সমালোচনার জবাবে তিনি বলেছিলেন,“পারমানবিক বোমার জন্যে যদি কাউকে দায়ী করতে হয়, তাহলে তার জন্যে দায়ী বিজ্ঞান নয়, দায়ী আমাদের বিশ্ব রাজনীতি। বিজ্ঞানীরা রাজনীতি বোঝেনা। কেননা রাজনীতি বিজ্ঞান থেকে  অনেক বেশি জটিল এবং দুর্বোধ্যও বটে ”। তিনি আরো বলেছিলেন,“ ইতিহাস প্রমাণ করে যুগে যুগে পৃথিবীতে যত অকল্যাণ ও অমঙ্গল দেখা দিয়েছে তার প্রত্যেকটির জন্য দায়ী হলো রাজনীতিবিদরা।”

আইনস্টাইন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্যবহৃত পারমানবিক বোমার ভয়াবহতা অনুধাবন করেছিলেন মর্মে মর্মে। পৃথিবীতে আর যাতে মানুষ ধ্বংসের কাজে পারমানবিক বোমা ব্যবহার করা না হয় সে ব্যাপারে বিশ্বজনমত সৃৃষ্টির জন্য সর্বাত্মক চেষ্ট করেছেন। তিনি বিভিন্ন সভা সেমিনারে পারমানবিক বোমার ব্যাহারের বিরুদ্ধে  মানুষকে সচেতন করতে চেষ্টা করেন। বিভিন্ন পত্রিকায় তিনি প্রবন্ধ লিখে মানুষকে বোঝাবার চেষ্টা করেন পরমাণু শুধু ধ্বংসই করে না, মানুষের কল্যাণও করে ।
১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দের ১৮ এপ্রিল সোমবার মহান বিজ্ঞানী ও মানবতাবাদী লেখক আলবার্ট আইনস্টাইন মৃত্যুবরণ করেন ।

লেখক: শামসুল হুদা লিটন
অধ্যাপক রাষ্ট্র বিজ্ঞান, তারাগঞ্জ কলেজ
সাধারন সম্পাদক , কাপাসিয়া প্রেসক্লাব, কাপাসিয়া ,গাজীপুর
মোবাইলঃ ০১৭১৬৩৩৩১৯১