একগুচ্ছ কবিতা

স্মৃতি যায়, বৃষ্টিবৃত্ত আসে

পুষ্ট ঝর্ণা গায়ে মাখি। পেরিয়ে শীতভোর, সূর্যকে বলি-
তুমি কি লিখবে আমার নাম। তুমি কি ধারণ করবে
আমার কবিতার জ্যোতি, আমার ধ্যানে ঘেরা সবুজ
ফসল, ফুলের বৃন্তে আঁকা প্রেমিকার জলজ কুসুম।

বিগত সময় বুকে আঁকি। পুকুরের বালিহাঁস, যেভাবে
টলমল স্মৃতি ঝেড়ে ছায়া খুঁজে পাড়ের রোদে, ঠিক
সেভাবেই ঘাসগুচ্ছের মাঝে রাখতে চাই হাত, পদরেখা
ডাক দিতে চাই, কাছে এসো নবীনার পালের নৌকো।

পুনরায় প্রেমচিঠি লিখি। হারিয়ে গেল যেসব মানুষ
অনেকগুলো কথা বাকি রেখে, আহা! বর্ষের বেদনা-
শুধু তুমিই তো জানো, বৃষ্টিবৃত্তে ফিরে যে জীবন
মানুষই কেবল অনুগত তার- পাশে রেখে কাললগ্ন ক্ষণ।

****

তোমার ছায়ার কাছে

আমি কি কোনও ভুল করিনি! আমি কি একটি বারও
তাকাইনি সমুদ্রশামুকের দিকে! একটিবারও কি বলিনি
ঘোর কেটে গেলে এই সবুজকেই ঘিরে রাখে ভোর-
আর তার বিনম্র প্রকাশ, ছায়া হয় সকল মানুষের।

অনেক কিছুই করেছি আমি। অনেক আত্মদগ্ধ জোনাকীর
জালে জালে আটকে থাকে যে রাত- তাকেও বলেছি
মুক্ত রাখো বাহু হে! আবার কোনও চন্দ্র জড়াবার
দরকার হতে পারে। যেতে হতে পারে অবিচল ঝড়ের কাছে।

কোনও অপরাধের ক্ষমাই চাইবো না তোমার কাছে আজ।
কোনও সকালকেই বলবো না- আরেকটু ধীরে বও!
অনেক কিছুই হারিয়ে গিয়েছে। আরো যাক- আরো,
আঁধার চিরে ভাসুক মুখ তোমার- প্রিয়তমা পৃথিবী আমার।

****

ভূমিকম্পের আগে

তোমার কাঁপন দেখলেই বুঝতে পারি, কেউ
সমুদ্রে গভীর রাতে খেলেছে ঢেউখেলা। দিগন্তের
আড়মোড়া ভেঙে উঠছে পূবের সূর্য। কামকুয়াশায়
ভেজা পৌষের শেষ সন্ধ্যা- কয়েকটি রক্তজবা হাতে
অপেক্ষা করেছে আরেকটি কাঁপনের।

পৃথিবী কেঁপে উঠলে ভয় পায় মানুষ। মানুষ কেঁপে
উঠলে গোলাপ ছড়িয়ে দেয় তার প্রথম পরাগ।

পরাগায়ণের প্রথম নিশীথে- একটি উটপাখি কাঁধে
তুলে নিয়েছিল পৃথিবীর ভার। সেই পাখিটির একটি
পালক খসে পড়লেই আমাদের চারপাশে ভূমিকম্প
হয়। আমাদের প্রেমিকারা স্পর্শের বিজলীতে আবার
খুলে দেয় তাদের খোঁপার সম্ভার।

****

বিনম্র বিষের মায়া

সাক্ষী দিতে গিয়ে দেখি আমার ছাউনি সরিয়ে নেয়া হয়েছে
বেশ আগে। দংশনের বিপক্ষে কথা বলার আগে, আমিই হয়েছি
দংশিত লখিন্দর। বিনম্র বিষের মায়া আঁকড়ে ধরেছে আমার
সর্বাঙ্গ। ভঙ্গ করে সকল অঙ্গীকার আমি দাঁড়িয়েছি জলের
কাঠগড়ায়। বৃষ্টিতে ভিজে একটি আশ্বিন খুঁজে বার বার গিয়েছি
সমবেত শরতের কাছে। এভাবে চিনে নিতে হয়, ঠিক এভাবে
অতিক্রম করে যেতে হয় সময়ের দংশনকাল। মহাল করায়ত্ব
না-ই বা হলো। তবুও নীল অমরতা এলে তাকেই দেখানো
যাবে শবদেহের মুখ। স্তরে স্তরে সাজানো প্রেমের শববৃত্তান্ত।

****

পুনরায় জন্মজীবনে

খুব বেশি হাঁটতে পারিনি। খুব বেশি বলতে পারিনি
এখানে দাঁড়াও। আমার জন্য অপেক্ষা করো, অথবা
আমিই থেকে যাবো অপেক্ষায়- এমন ওয়াদা,
কোনোদিনই দেয়া-নেয়া হয়নি আমার। বিরহী জলে
আর অবশিষ্ট মেঘাবর্তে- শুধুই লিখেছি মরম, মৃত্তিকা।

একদিন ভূমিষ্ঠ হবো, তা যেমন জানা হয়নি, তেমনি
জানা হয়নি হামাগুড়ির কৌশল, পদরেখার ছাপতন্ত্র
জেনে লিখে রাখবো নতুন কোনো বিধান- সারতে
পারিনি সেই প্রস্তুতিও। কেঁপেছি- কেবলই কেঁপেছি।

মানুষের একজীবন কেঁদেই কেটে যায়। একজীবন
কেটে যায় ধূসর আকাশের রঙ দেখে দেখে। যে জীবন
আরাধ্য থাকে, কিছু স্রোত জমে উঠে তার কিনারে।