এক বা দু’সপ্তাহের মধ্যে ছাড়া পেতে পারেন খালেদা জিয়া!

খালেদা জিয়া

স্টাফ রিপোর্টার: জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় পাঁচ বছরের সাজাপ্রাপ্ত বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে ঢাকার নাজিম উদ্দিন রোডের পুরোনো কেন্দ্রীয় কারাগারে রাখা হয়েছে।

সেখানে আসামিদের বাচ্চাদের জন্য একসময় ব্যবহৃত কিডস ডে কেয়ার সেন্টারের তিনতলা ভবনের নিচতলায় দুটি রুমে তাঁর থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

খালেদার আইনজীবীরা বলেছেন, তারা আপীল করবেন। বিএনপি বলেছে, এ রায়কে তারা আইনী ও রাজনৈতিক উভয়ভাবেই মোকাবিলা করবে।

অনেকের মনেই এ প্রশ্ন উঠতে পারে যে তাহলে খালেদা জিয়াকে আসলে ঠিক কত দিন জেলে থাকতে হতে পারে?

আইনবিদ এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক শাহদীন মালিক বলছেন, রায়টা কতটা ঠিক হয়েছে তা বোঝা যাবে উচ্চতর আদালতে আপীল শুরু হলে।

প্রশ্ন হলো: রায়ের সত্যায়িত কপি হাতে পাবার পরই কেবল খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা আপীলের প্রক্রিয়া শুরু করতে পারবেন, এবং ততদিন পর্যন্ত খালেদা জিয়া বন্দী থাকবেন।

এই রায়ের কপি পাবার কি কোন সময়সীমা আছে?

শাহদীন মালিক বলেন, কোন সময়সীমা বাঁধা নেই। তবে সার্টিফায়েড কপির আগে টাইপ করা কপি যাকে বলা হয় ট্রু কপি – সেটা হয়তো আইনজীবীরা আগামি সপ্তাহের প্রথম দিকেই পেয়ে যেতে পারেন এমন কথা শোনা গেছে। তাহলে তারা হয়তো আগামী সপ্তাহের মাঝামাঝি নাগাদই আপীল দায়ের করে দেবেন, হয়তো আপীলের সাথেই জামিনের আবেদনও করবেন।

“আইনী প্রক্রিয়ায় যেটা হয়, নারীদের ব্যাপারে, বয়েস বেশি হলে, বা সাজা কম বলে – কারণ এটা যাবজ্জীবন কারাদন্ড নয় এবং পাঁচ বছরের কারাদন্ডকে কম সাজাই বলতে হবে – তাই এসব বিবেচনায় হয়তো আমার সাধারণ জ্ঞানের যেটা ধারণা হয় – জামিন হয়ে যেতে পারে।”

“এক বা দু’সপ্তাহে ছাড়া পেয়ে গেলে এক অর্থে তিনি স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারবেন, রাজনৈতিক কর্মকান্ডও শুরু করতে পারবেন।”

খালেদা জিয়ার পাঁচ বছরের জেল

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে। বৃহস্পতিবার বেলা আড়াইটার দিকে রাজধানীর বকশীবাজারের আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে স্থাপিত বিশেষ জজ আদালতের বিচারক মো. আখতারুজ্জামান এ রায় ঘোষণা করেন।

এ ছাড়া বাকি পাঁচ আসামিকে ১০ বছর করে কারাদণ্ড ও প্রত্যেককে দুই কোটি ১০ লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে।

দীর্ঘ ১০ বছরের আইনি প্রক্রিয়া শেষে টানটান উত্তেজনার মধ্যে বহুল আলোচিত এ রায় ঘোষণা করা হল।

এর আগে সকালে কারাগারে থাকা দুই আসামি মাগুরার সাবেক সংসদ সদস্য কাজী সলিমুল হক কামাল ও ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমেদকে আদালতে নেওয়া হয়।

মামলার অপর আসামি তারেক রহমান, সাবেক মুখ্য সচিব কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী ও জিয়াউর রহমানের ভাগিনা মমিনুর রহমান পলাতক রয়েছেন।

বিএনপির বিক্ষোভ শুক্রবার

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘জনবিচ্ছিন্ন, অনৈতিক সরকার রাজনীতি ও নির্বাচন থেকে দূরে রাখার জন্য মিথ্যা মামলা-নথি তৈরি করে খালেদা জিয়াকে সাজা দিয়েছে। এ রায় দেশের জনগণ কোনো দিন গ্রহণ করবে না। আমরা অত্যন্ত ঘৃণার সঙ্গে এ রায় প্রত্যাখ্যান করছি।’

রায়ের প্রতিবাদে কাল শুক্রবার নামাজের পর সারা দেশের প্রতিটি জেলা-উপজেলায় শান্তিপূর্ণভাবে বিএনপির বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করা হবে বলে জানান মির্জা ফখরুল। দলের প্রতি খালেদা জিয়ার নির্দেশনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, কোনো ধরনের সহিংস এবং হঠকারী সিদ্ধান্ত না নেওয়ার কথা বলেছেন খালেদা জিয়া। সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণভাবে ধৈর্য ধরতে হবে। তিনি বলেন, ‘আমরা শান্তি চাই। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করতে চাই।’

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলার রায়ের প্রতিক্রিয়ায় আজ বৃহস্পতিবার নয়াপল্টনে এক সংবাদ সম্মেলনে মির্জা ফখরুল এসব কথা বলেন।

বিএনপির মহাসচিব অভিযোগ করেন, শুধু রাজনৈতিকভাবে খালেদা জিয়াকে হেয়প্রতিপন্ন করার জন্য ও আগামী জাতীয় নির্বাচন থেকে তাঁকে দূরে রাখার জন্য এই রায়। একদলীয় শাসনব্যবস্থা কায়েম করার জন্য যে নীলনকশা, তা বাস্তবায়নের জন্যই এই সাজার রায় দেওয়া হয়েছে।

মির্জা ফখরুল বলেন, এই রায় বর্তমান রাজনৈতিক সংকটকে আরও ঘনীভূত করবে; বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা চলে যাবে। তিনি বলেন, রায়কে কেন্দ্র করে গত তিন দিন ধরে এই সরকার দেশে যুদ্ধাবস্থা তৈরি করে রেখেছে। সরকার দেশের পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করেছে এবং রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস করেছে।

গাড়িবহরে হামলার বিষয়ে ফখরুল ইসলাম বলেন, আজ খালেদা জিয়ার গাড়িবহরের সঙ্গে অত্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে নেতা-কর্মীরা আসছিলেন। তখন আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা বিএনপির ওপর চড়াও হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, আজ ঢাকা শহরের মোড়ে মোড়ে আওয়ামী সন্ত্রাসীরা পাহারা বসিয়েছে, তারাই পুলিশের সহায়তায় খালেদা জিয়ার গাড়িবহরের ওপর হামলা চালিয়েছে।
মির্জা ফখরুল দাবি করেন, বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা শামসুর রহমান দুদু, চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির শাহাদত হোসেনসহ সারা দেশে এক হাজারের বেশি নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সব মিলিয়ে মোট সাড়ে তিন হাজারের বেশি নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

সংবাদ সম্মেলনে স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মওদুদ আহমদ, মির্জা আব্বাস, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

এরশাদের হাতের গাছের বরই খালেদাকে খাওয়ান

কারাগারে থাকতে জাতীয় পার্টির (জাপা) চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদের লাগানো গাছের বরই খালেদা জিয়াকে খাওয়ার সুযোগ দিতে বলেছেন জাপার এক সাংসদ। বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে জাপার সাংসদ ইয়াহইয়া চৌধুরী এ আহ্বান জানান।

ইয়াহইয়া চৌধুরী বলেন, ‘ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া একদিন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে বিনা অপরাধে কারাগারে পাঠিয়েছিলেন। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস, সেই জেলখানায় এখন খালেদা জিয়া। আজ থেকে ২৮ বছর আগে কারাগারে থাকা অবস্থায় হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ একটি বরইগাছ লাগিয়েছিলেন। সেই গাছে এখন বরই ধরেছে। কারাবিধান অনুযায়ী এ বরই খাওয়া যাবে কি না জানি না। সুযোগ থাকলে খালেদা জিয়াকে সেই বরই খেতে দেওয়া হোক।’

রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় সরকারদলীয় সদস্য মেহের আফরোজ চুমকি বলেন, ধর্মের কল বাতাসে নড়ে। তবে যে পরিমাণ অর্থ আত্মসাতের জন্য খালেদা জিয়ার সাজা হয়েছে, তা জিয়া পরিবারের লুটপাট করা অর্থের তুলনায় খুবই সামান্য। এতিমদের হক মেরে খাওয়ায় পচা শামুকে খালেদা জিয়ার পা কেটেছে।

খালেদা জিয়ার রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে সরকারি দলের হুইপ মাহবুব আরা গিনি বলেন, এটি খালেদা জিয়ার কর্মফল। অপরাধ, অন্যায় কখনো কাউকে ছাড়ে না। কথায় আছে, পাপ বাপকেও ছাড়ে না।