এমপি লিটনের স্ত্রী এবং ইসলামী ব্যাংককাহন ।। মোমিন মেহেদী

জামায়াত নেতাদের নিয়ে খুন হওয়া এমপি লিটনের স্ত্রীর নানা রকম বাণিজ্য যে ছিলো, তা এখন প্রকাশিত হচ্ছে একারনে যে, জামায়াত ইসলামীর নেতাকর্মীদের সাথে স্থানিয়ে ষড়যন্ত্রকারী আওয়ামী নেতাদের দূরত্ব তৈরি হয়েছে। আর তারও আগের খবর হলো- নভেম্বরে এক জামায়াত নেতাকে মারতে গিয়েছিলেন এমপি লিটন; অথচ তা কাকপক্ষিও টের পায় নি। এভাবেই বয়ে চলেছে ষড়যন্ত্রের রাজত্বের অন্যতম জেলা গাইবান্ধা-১ (সুন্দরগঞ্জ) আসনের সরকারি দলের সংসদ সদস্য মঞ্জুরুল ইসলাম লিটন হত্যার কল্প কাহিনী। গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে অবশ্য বলা হয়েছে, এই ঘটনায় জামায়াত-শিবির জড়িত বলে দাবি করেছেন তার স্ত্রী খুরশিদ জাহান স্মৃতি। অথচ বিভিন্নভাবে প্রচলিত আছে যে, লিটনের আপত্তি থাকা সত্ত্বেও জামায়াত নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরি ও ব্যবসায়িক কর্মকান্ডে জড়িত ছিলেন স্মৃতি। নিয়োগ বাণিজ্য থেকে শুরু করে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে তাদের ঠিকাদারির কাজও পাইয়ে দেয়ার অভিযোগ রয়েছে এমপি পত্নী স্মৃতির বিপক্ষে। এ নিয়ে লিটনের সঙ্গে স্মৃতির একাধিকবার বিরোধও তৈরি হয়েছে বলেও গণমাধ্যম এখন দাবী করছে।

পত্রিকাগুলোর দাবী অনুযায়ী নভেম্বরের প্রথম দিকে নিয়োগ বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে স্মৃতির ঘনিষ্ঠ জামায়াত নেতা মাসুদুর রহমান ওরফে মিসকিন মুকুলকে মারতে গিয়েছিলেন লিটন। খোলস পাল্টানো এই জামায়াত নেতাকে লিটনের কাছে নিয়ে যান ছাত্রলীগের দুই নেতা আবদুল্লাহ ও লোকমান। তাদের সঙ্গে উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান ও স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা আহসান কবীর মাসুদের ঘনিষ্ঠতা রয়েছে। লিটন হত্যার ঘটনায় দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদের পর মাসুদকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। স্থানীয় আওয়ামী লীগ, পুলিশ ও একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা এসব তথ্য গণমাধ্যমকে দিয়েছে। এমপি লিটনের স্ত্রী স্মৃতি যেমন জামায়াত নেতাদের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে জামায়াতে ইসলাম-ছাত্র শিবিরের অর্থনৈতিক শক্তিকে বৃদ্ধি করতে তুরুপের তাসে পরিণত হয়েছিলেন; ঠিক একইভাবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের একটা বড় অংশ শিবির-জামায়াতের অর্থনৈতিক শক্তিকে রক্ষায় অর্থাৎ ইসলামী ব্যাংকে রক্ষায় অবিরত কাজ করে যাচ্ছে। অথচ সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জানেন ই না যে, জঘণ্য নীল নকশা নিয়ে এগিয়ে চলেছে ছাত্রশিবির-জামায়াত নিয়ন্ত্রিত ইসলামী ব্যাংক। পরিচালনা পর্ষদে বড় ধরনের পরিবর্তনের পরও ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডে জামায়াতপন্থীরা বহাল তবিয়তে থেকে যাবে বলে আমি মনে করছি। কেননা, তাদের কাউকেই চাকুরিচ্যুত করার কোন পরিকল্পনা নেই নতুন পরিচালনা পর্ষদের। যা আছে, তা কেবল ‘খাও-দাও ফূর্তি করো, ইসলামী ব্যাংক ও জামায়াত-শিবির হালাল করো’ কর্মসূচী। তবে ব্যাংকের ভেতর থেকে গুজব ছড়িয়ে কেউ অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে একটা সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে দায়সাড়া কায়দায়। পাশাপাশি স্বাধীনতার পক্ষের পরিচালনা পর্ষদের মুখোশ পরিহিত নব্য জামায়াত-শিবিরের নেতাদের দ্বারা আরেকটি ঘোষণা দেয়ানো হয়েছে, আর তা হলো- ‘ইসলামী ব্যাংকে কর্মরত কারো সঙ্গে রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকান্ড বিশেষ করে আগুন সন্ত্রাসের সংশ্লিষ্টতা পেলে সঙ্গে সঙ্গে তাকে চাকুরিচ্যুত করা হবে।’ অথচ ইসলামী ব্যাংকের তত্বাবধায়নে জামায়াতে ইসলামের সংস্কৃতি বিষয়ক সংগঠন বাংলাদেশ সংস্কৃতি কেন্দ্রে ঠিকই বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।

ইসলামী ব্যাংকের গজিয়ে ওঠার ইতিহাস সবসময় আমাদেরকে ব্যথিত করে, কষ্ট দেয়। কেননা, পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি হিসেবে ১৯৮৩ সালের ১৩ মার্চ প্রতিষ্ঠা করা হয় বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংকিং ধারার নামে ইসলামকে কেনা বেচার ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড। ছাত্রশিবিরের শীর্ষ নেতাদের পাশাপাশি স্বাধীনতা বিরোধী-জামায়াতে ইসলামের শীর্ষ নেতাকর্মীদের স্বমন্বয়ে কেবলমাত্র ধর্মকে পূঁজি করে এগিয়ে চলার সূত্রতায় গ্রাহকসেবা ও আর্থিক উন্নয়নে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে একটি ভালো অবস্থান নির্মাণ করে এই ধর্মী বিক্রিকারী ব্যাংক। শুরু থেকেই ব্যাংকটিতে জামায়াতপন্থীদের যেমন একচ্ছত্র কর্তৃত্ব ছিল; এখনো চলমান রয়েছে তা; বিশেষ করে শাখা ব্যবস্থাপক; এই পদটিতে তারা কখনোই জামায়াতে ইসলাম বা ছাত্র শিবিরের শীর্ষ নেতা না হলে নিয়োগ দেয়নি। যদিও আমাদের সংবিধান অনুসারে, ব্যাংকটিতে বাংলাদেশের সব ধর্মের নাগরিকদের চাকরির সুযোগ থাকার কথা। কিন্তু বর্তমানে ব্যাংকটিতে কর্মরত সাড়ে ১৩ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে সবাই ইসলাম ধর্মাবলম্বী এবং শতকরা ৯৮ ভাগ জামায়াতে ইসলামের রিপোর্ট ফরমপূরণকারী নেতাকর্মী। ব্যাংকটির আয়ের একটি বড় অংশ জামায়াত-শিবিরের রাজনীতিতে ব্যবহৃত হতো বলে বিশ্বের বিভিন্ন অর্থনৈতিক কাগজে সংবাদও প্রকাশিত হয়েছে। এমন একটা পরিস্থিতিতে ব্যাংক ও দলীয় নেতাকর্মীদের বৃহত্তর স্বার্থ চিন্তা করেই ইসলামী ব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তারা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনায় ব্যাপক পরিবর্তন আনার জন্য আওয়ামী লীগের একাংশের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। যার সূত্র ধরে সরকারীভাবে এখন উদ্যোগ নেয়া হয়েছে জনগনের চোখে ধোয়া দেয়ার। যে কারনে কোন দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা না করেই ২ দিনের ব্যবধানে ব্যাংকটির পরিচালনা পরিষদের চেয়ারম্যান পরিবর্তন, ইসলামী ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যানসহ বড় বড় পদে পরিবর্তন আনা হয়েছে। পরিচালনা পর্ষদের বৈঠকে আরমাডা স্পিনিং মিলের পে পরিচালক হিসেবে উপস্থিত থাকা আরাস্তু খানকে চেয়ারম্যান নির্বাচিত করা হয়। তিনি ওই দিনই প্রথম বৈঠকে যোগ দেন। সাবেক আমলা আরাস্তু খান এর আগে কমার্স ব্যাংকের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেছেন। সাবেক চেয়ারম্যান তড়িঘড়ি করেইন ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও জামায়াতে ইসলামের অন্যতম নীতিনির্ধারক মোহাম্মদ আবদুল মান্নানের পদত্যাগপত্র উপস্থাপন করেন। আবদুল মান্নান ২০১০ সাল থেকে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। ২০১৬ সালের জুন মাসে তাকে দ্বিতীয় মেয়াদে ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। আর মুস্তাফা আনোয়ার ইবনে সিনার প্রতিনিধি হিসেবে ব্যাংকের চেয়ারম্যান দায়িত্ব পান ২০১৫ সালে। জামায়াতের নির্বাহী পরিষদ সদস্য আবু নাসের আবদুজ জাহের ২০১৩ সালে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এদিকে ব্যাংকটির শীর্ষ পর্যায়ে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হলেও ব্যাংকে নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে জামায়াত-শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে। তৃণমূলের এই ভুত কে তাড়াবে? এমন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে। কিন্তু উত্তর একটাই ‘খাও-দাও ফূর্তি করো, ইসলামী ব্যাংক ও জামায়াত-শিবির হালাল করো’ কর্মসূচী পালনের লক্ষ্যে এমন পরিবর্তনের ধোয়া ওঠানো হয়েছে।

তবে আমি মনে করি যে, যখন নতুনধারা বাংলাদেশ-এনডিবি ২০১২, ১৩, ১৪, ১৫ ও ১৬ সালের শেষ পর্যন্ত আন্দোলন করে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক কন্যা শেখ হাসিনার টনক নড়াতে পেড়েছে, তখন তিনি দায়িত্ব দিয়েছিলেন অর্থমন্ত্রীসহ শীর্ষ আওয়ামী লীগ নেতাদেরকে। আর তাদেরই উদ্যেগে নতুন বছরে ইসলামী ব্যাংকে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হচ্ছে এমন আভাস জামায়াত-শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত কর্মকর্তাদের কাছে অনেক আগে থেকেই ছিল। গত বছরের জুন মাস থেকে সরকারের বিভিন্ন সংস্থার লোকজন জামায়াতঘেঁষা কর্মকর্তাদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে খোঁজ-খবর নিতে শুরু করে। এই পরিস্থিতিতে ব্যাংক কর্তৃপ কয়েকশ’ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করায়। এদিকে ইসলামী ব্যাংক ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান পরিবর্তন করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে সরকারের সাবেক সচিব সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলামকে। ভাইস চেয়ারম্যান হয়েছেন ইসলামী ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক সামিম মোহাম্মদ আফজাল। শুধু তাই নয়, পরিবর্তন করা হয়েছে কোম্পানি সচিবকেও। কোম্পানি সচিবের দায়িত্ব পেয়েছেন ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের কোম্পানি সচিব জাহিদুল কুদ্দুস মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহ। ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদে নিয়োগ দেয়া হচ্ছে ইউনিয়ন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল হামিদ মিঞাকে। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন চেয়ে চিঠিও দেয়া হয়েছে। তবে আল-রাজীর প্রতিনিধি পরিচালক ইউসিফ আবদুল্লাহ আল-রাজী ও ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের প্রতিনিধি আরিফ সুলেমানকে তাদের পদে রাখা হয়েছে। সেই গোলেমালে আল্লাহু আকবর অবস্থায় আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, ব্যাংকটিকে জামায়াতমুক্ত করার প্রক্রিয়া অনেক আগে থেকেই শুরু হয়।
তবে বিনয়ের সাথে বলবো যে, জাতির জনক কন্যা শেখ হাসিনা ভুলে যাবেন না যে, এই ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী রাজাকার মীর কাসেম আলী এই ব্যাংকের সহায়তায় অনেক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলো এবং সেই সব প্রতিষ্ঠানে জামায়াত-শিবির সমর্থিত লোকদের কর্মসংস্থানে ব্যবস্থা করেছিলো। অতএব, বাংলাদেশকে রক্ষার জন্য হলেও এই ব্যাংকে প্রকৃত দেশপ্রেমিকদেরকে নিয়োগ দিন; বহিষ্কার করুন শাখা ব্যবস্থাপকসহ প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণীর সকল পদে কর্মরত জামায়াত-শিবিরের রাজনৈতিক কর্মীদেরকে। তা না হলে যে সাকা, তেসাকায় আবারো পরিণত হবে ইসলামী ব্যাংক, ক্ষতিগ্রস্থ হবে বাংলাদেশ…

মোমিন মেহেদী : চেয়ারম্যান, নতুনধারা বাংলাদেশ-এনডিবি
Email: [email protected]
Mobile : 01675179189