কাপাসিয়ার সাদির মোক্তার আ’লীগ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সন্ধ্যা বাতি জ্বালাতেন

নাজমুল হাসান চৌধুরী পিন্টু :  কাপাসিয়ার কৃতি সন্তান অ্যাডভোকেট চৌধুরী মোহাম্মদ সাদির। যিনি সাদির মোক্তার নামেই সুপরিচিত ছিলেন।তার জন্ম ১ অক্টোবর ১৯১৬ সালে গাজীপুর জেলার কাপাসিয়া উপজেলার সন্মানিয়া ইউনিয়নের মামরুদি গ্রামে। পিতা মরহুম চৌধুরী মোহাম্মদ হাসান। তিনি ঢাকা থেকে মেট্রিক পাস করেন ১৯৩৯ সালে। এরপর ব্রিটিশ ভারতের কোলকাতা ফোর্ট উইলিয়ামে অবস্থিত হাইকোর্ট এর অধীনে মোক্তারি পাস করেন ১৯৪২ সালে। এরপর ঢাকা এসে আইন ব্যবসা শুরু করেন ব্রিটিশ শাসনের শেষ সময় ১৯৪৩ সালে। অল্প দিনেই আইন পেশায় সুনাম অর্জন করেন তিনি। পুরানো ঢাকার বংশাল মালিটোলায় তার চেম্বার স্থাপন করেন। যারা প্রবীণ অনেকের স্মৃতিতে হয়তো এখনো আছে। 

সুদীর্ঘ জীবন আইন পেশায় নিয়োজিত থাকার সময়ে কয়েক বার তিনি ঢাকা মোক্তার বার কাউন্সিল এর প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর যার নামকরন হয় ঢাকা মেট্রোপলিটন অ্যাডভোকেটস বার এ্যাসোসিয়েশন।

বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ এর জন্মলগ্ন থেকে আওয়ামী রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন তিনি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বঙ্গতাজ তাজউদ্দীন আহমদের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হিসাবে আওয়ামী রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। ষাটের দশকে ঢাকা নগর আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ ছিলেন এবং পরবর্তীতে ঢাকা সদর নর্থ সাব ডিভিসন (বর্তমান গাজীপুর জেলা) আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন।

ঢাকা সদর উত্তর মহকুমা শুধু গাজীপুর নয়, নরসিংদি ও মানিকগঞ্জ সহ এই মহকুমা।সাদির মোক্তারই আওয়ামীলীগের প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সন্ধ্যা বাতি জ্বালাতেন।ঢাকা শহর কার্যালয়ই ছিল কেন্দ্রীয় কার্যালয়।

১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে বঙ্গতাজ তাজউদ্দীন আহমদ এর প্রস্তাবকারী ছিলেন জনাব চৌধুরী মোহাম্মদ সাদির মোক্তার এবং সমর্থনকারি ছিলেন জনাব হেকিম মোল্লা।

সমাজসেবক হিসাবেও যথেষ্ট সক্রিয় ছিলেন তিনি। ১৯৬৫ সালে তৎকালীন কাপাসিয়ার প্রখ্যাত বাক্তিবর্গ সর্বজনাব বঙ্গতাজ তাজউদ্দীন আহমদ, মন্ত্রী ফকির আব্দুল মান্নান, চেয়ারম্যান সফিউদ্দিন আহমদ, অ্যাডভোকেট মেজবাহ উদ্দিন, রশিদ মিয়া, সামাদ মিয়া, ডাঃ সানাউল্লাহ, মমতাজ খান, জমি দাতা বাবু  ও আরও অনেকের সাথে একান্তভাবে থেকে বর্তমান ‘কাপাসিয়া ডিগ্রী কলেজ’ প্রতিষ্ঠা করেন।

যতদুর জানা যায়, সকলের অনুরোধে জনাব চৌধুরী মোহাম্মদ সাদির মোক্তার সাহেব তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে একটা বড় অংকের টাকা ডিপোজিট রাখেন এবং ৬ মাসের শিক্ষকদের বেতন ও অন্যান্য খরচের টাকার কর্পোরেট গ্যারান্টি দেন ‘শীতলক্ষ্যা ন্যাভিগেশন’ থেকে । এর ফলেই ‘কাপাসিয়া ডিগ্রী কলেজ’ বাস্তব আলোর মুখ দেখে ।

পাকিস্তানের শেষ দিকে ১৯৭০ সালে নারী শিক্ষা বিস্তারের জন্য সন্মানিয়া ইউনিয়নে প্রতিষ্ঠা করেন তার মায়ের নামে ‘আখতার বানু গার্লস হাই স্কুল’। যা বর্তমানে কাপাসিয়ার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ‘আখতার বানু হাই স্কুল’ নামে সুপরিচিত।

সে সময়কার পশ্চাৎপদ যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতিকল্পে ১৯৬০ সালে প্রতিষ্ঠা করেন বিখ্যাত ‘ শীতলক্ষ্যা ন্যাভিগেশন লঞ্চ কোম্পানি’। যার বহরে ছিল পান্না, বাবলা, ফাদিয়া, সান লাইট, চৌধুরী, নাজির, জলপিপি ইত্যাদি লঞ্চ সমূহ।

যেগুলি নারায়ণগঞ্জ থেকে তারাব, রুপগঞ্জ, কালিগঞ্জ, ঘোড়াশাল, পলাশ, চরসিন্দুর ইত্যাদি এলাকা হয়ে কাপাসিয়া, টোক, বর্মী ও হাতিরদিয়া পর্যন্ত চলাচল করত।

সে সময় রাস্তা ঘাট বিহীন এই বিশাল এলাকার জনগণের যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম ছিল এগুলো। অনুন্নত বিশাল এই এলাকার শিক্ষা বিস্তারের জন্য ছাত্র ছাত্রীদের বিনা ভাড়ায় স্কুল কলেজে যাতায়াতের সুযোগ করে দিয়েছিলেন তিনি।

তিনি জনগণের যোগাযোগ উন্নতির লক্ষে এলাকায় ‘হাসানপুর পোষ্ট অফিস’ প্রতিষ্ঠা করেন। এছাড়াও তিনি বহু স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, এতিমখানা ইত্যাদিতে বিভিন্ন সাহায্য সহযোগিতা করেছেন ও জনকল্যাণমূলক বহু কাজ করে গেছেন।

১৯৭০ সালে জাতীয় নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চেয়েছিলেন। কিন্তু পান নাই । স্বাধীনতার পরপরই তিনি ও তার একমাত্র বড় ভাই কাপাসিয়ার সন্মানিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জনাব আব্দুল কাদির চৌধুরী বিভিন্ন অসুখে অসুস্থ হয়ে উভয়েই কাছাকাছি সময়ে ইন্তেকাল করেন।

তার মৃত্যু বার্ষিকীতে সকলের কাছে তার রুহের মাগফেরাতের জন্য দোয়া কামনা করছি। একই সঙ্গে ৫০/৬০ দশকের কোন তথ্য কারো জানা থাকলে তা বলার জন্য আন্তরিকভাবে অনুরোধ করছি।