কাপাসিয়ায় মাদকের স্বর্গ রাজ্য, প্রশাসনের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ

কাপাসিয়া (গাজীপুর) প্রতিনিধি : গাজীপুরের কাপাসিয়া সদর সহ বিভিন্ন এলাকা মাদকের স্বর্গ রাজ্যে পরিনত হয়েছে। হাত বাড়ালেই মাদক পাওয়া যাচ্ছে উপজেলা সর্বত্র। এলাকার অলি গলিতে মাদক ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট গড়ে তুলে অবাধে বিক্রি করছে মাদক। এ যেন দেখার কেউ নেই। এতে সব চেয়ে বেশী নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়ছে স্কুল কলেজের ছাত্ররা। এদের বিরুদ্ধে কেউ প্রতিবাদ করলে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। ফলে মাদকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার সাহস পাচ্ছেন না কেউ।

সুত্র জানায়, উপজেলার কাপাসিয়া বাজারে, কলেজ রোড বাঁশতলা মোড়ে ,রাওনাট বাজারে, রানীগঞ্জ,তারাগঞ্জ, তরগাঁও খেয়া ঘাট মোড়ে, ফকির মজনু শাহ সেতুতে, আমরাইদ, নরসিংপুর, রায়েদ সহ উপজেলার প্রায় ৫০টি স্পটে প্রকাশ্যে মাদক বেচা কেনা হচ্ছে। সন্ধ্যা বা দিনের বেলায় প্রকাশ্যে চলে এসব স্পটে মাদক বিক্রি।হোন্ডা বা সাইকেলে করে ক্রেতারা এসে নিয়ে যাচ্ছে । এসব স্পট থেকে নিয়মিত পুলিশ মাসোহারা নিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠছে।

মাদকের সঙ্গে পুলিশের সম্পৃক্তা অস্বীকার করছেন না খোদ পুলিশ কর্তারাই।গাজীপুরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ কাপাসিয়ার এক অনুষ্ঠানে দায় স্বীকার বলে ছিলেন, “পুলিশ সদস্যরা প্রায়ই মাদক সেবীদের ২/১ জনকে ধরে একটু শাসিয়ে-শুসিয়ে ছেড়ে দেয়।অধিকাংশ সময়ই মাদক ব্যবসায়ীরা থাকে ধরা-ছোয়ার বাইরে।কারণ মাদক ব্যবসার সঙ্গে পুলিশ সদস্যরা সম্পৃক্ত। তিনি প্রশ্ন রাখেন, পুলিশ মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে ভাগ-বাটোয়ারায় ব্যস্ত থাকলে মাদক নিরোধ করবে কে? মাদককে কেউ পছন্দ করে না।বঙ্গতাজের এলাকায় মাদকের রাম রাজত্ব চলবে এটা হতে পারে না।“

মাদক, চুরি, ডাকাতি বন্ধে  গ্রাম পুলিশ ও  কমিউনিটি পুলিশ সদস্যদের কাজে লাগানোর জন্য ইউপি চেয়ারম্যানগণকে পরামর্শ দিয়ে ছিলেন পুলিশ সুপার। মাদক ব্যবসায়ীদের সাথে রফা-দফা না করে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে তিনি কাপাসিয়া থানার ওসিকে বলেন।

কিন্তু এক সেকেন্ডের জন্যেও থেমে থাকেনি ইয়াবা, গাঁজা, হিরোইনের ব্যবসা।দিন দিন বেড়েই চলছে মাদক ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য।বিভিন্ন মাদকদ্রব্যের মধ্যে ইয়াবার ব্যবসা এখন রমরমা।

কাপাসিয়া বাজার ব্যবসায়ী সমিতির লোকও মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত বলে অভিযোগ উঠেছে। বানারহাওলা এলাকার নজরুল ও রাউৎকোনা এলাকার রাসেলের বিরুদ্ধে ইয়াবা ব্যবসার অভিযোগ রয়েছে।

২০১৬ সালের ২৩ জুলাই রাতে এক সাংবাদিককে সাক্ষী রেখে রাউৎকোনা ফাজিল মাদ্রাসা সংলগ্ন মুন্তা পুলিশের বাড়ি নিকট সিএনজি থামিয়ে রাউৎকোনা গ্রামের ৫ গাঁজা ব্যবসায়ীকে ২৫০ গ্রাম গাঁজাসহ আটক করে থানায় নিয়ে যান কাপাসিয়া থানার এসআই দুলাল। পরে অজ্ঞাত কারণে রাতেই তাদেরকে ছেড়ে দেয়া হয়। কিন্তু উদ্ধারকৃত এই গাঁজা গেল কই তা আর জানা যায়নি।

কান্দানিয়া এলাকায় ইয়াবা ব্যবসা করতেন শামসুল। পুলিশ তাকে একাধিকবার আটক করেছিল। তিনি বিদেশ চলে যাওয়ার পর হাল ধরেছেন তার ভাই ইমরান।

পাবুর এলাকার ইয়াবা ব্যবসায়ী মাসুদ, লিমন, সোলায়মান, লোকমান, শামীম, সোহেল ও গাঁজা ব্যবসায়ী কালাম। আরও আছেন চিনাশুখানিয়ার রুবেল ও টমটম চালক নয়ন। তাদের মধ্যে লোকমান টেকনাফ থেকে ইয়াবা আনতে গিয়ে র‌্যাবের হাতে গ্রেফতার হয়েছিলেন।

দুর্গাপুর ইউনিয়নের কামড়া এলাকার ইয়াবা ব্যবসায়ী মাজহারুল, রাওনাট এলাকার সুশান ও ইয়াছিন। এর মধ্যে মাজহারুল একবার গ্রেফতার হয়েছিলেন।যে কোনো সময় গণধোলাইয়ের শিকার হতে পারেন ইয়াছিন।সে প্রায়ই কৌশলে জেলেদের পকেটে ইয়াবা ট্যাবলেট ঢুকিয়ে দিয়ে পুলিশের ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করে।

তরগাঁও এলাকার ইয়াবা ব্যবসায়ী সোহেল, রানা, রিপন, ঋষিপাড়ার জুয়েল, ঋষিপাড়া মোড়ের বিপ্লব, দক্ষিণপাড়ার মোবারক, মোশারফ, সোহেল, রাকিব, বাবু ও পশ্চিমপাড়ার জুয়েল।

উত্তর খামের এলাকার ইয়াবা ব্যবসায়ী জাহিদুল ও দক্ষিণ খামের এলাকার রাজীব। ত্রিমোহনী এলাকার ইয়াবা ব্যবসায়ী বেলায়েত ও ফয়সাল। বেলায়েতের দোকান বাজারে। কাজীর টেকের সুমন তার সহযোগী।

চর সনমানিয়া এলাকার গাঁজা ব্যবসায়ী গোলাপ। তার বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে  প্রতিবাদ সভা করেন এলাকাবাসী।

বারিষাব ইউনিয়নের ভিকারটেক এলাকার ইয়াবা ব্যবসায়ী রতন ফকির। এরই মধ্যে কয়েকজন লোক তাকে চেংনা এলাকায় আটক করে ২০ হাজার টাকা আদায় করেন।

এছাড়া ইকবাল তালাশীর নাম জানেন না এমন কেউ বারিষাব ইউনিয়নে আছেন? তিনি কেবল মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িতই না, অন্যের পকেটে, ব্যাগে কৌশলে ইয়াবা, গাঁজা ঢুকিয়ে পুলিশ দিয়ে গ্রেফতার করিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা লাভের ব্যবসা তার দীর্ঘ দিনের।তার সহযোগী হাবিবুর।

তাদের মাদক ব্যবসার প্রতিবাদ করায় হাবিবুরের মিথ্যা মামলায় নামা বারিষাব গ্রামের ৫/৭ জন নিরীহ ব্যক্তিকে জেলা খাটায় ইকবাল তালাশী গং। মাদক ব্যবসায়ী হাবিবুর একবার ইয়াবার বড় চালান সহ জনতার হাতে ধৃত হয়ে গণধোলাইয়ের শিকার হন।ঘটনাটি ধামাচাপা দেন বারিষাব ইউপি’র তিন মেম্বর- সেলিম, মমতাজ ও সুমন।

চাঁদপুর, কড়িহাতা, রায়েদ, সিংহস্রী, টোক ও ঘাগটিয়ায় মাদক ব্যবসা নেই এমনটা নয়। এসব ইউনিয়নেও হাত বাড়ালেই মিলছে ইয়াবা। সন্ধ্যার পর বসে নেশার আসর।

টোক নয়ন বাজারে দিনের বেলায় প্রকাশ্যে চলে ইয়াবার ব্যবসা।পাশের পুলিশ ফাঁড়ির লোকেরা মাদকের গডফাদারদের নিকট হতে বখরা পায় বলে জনশ্রুতি রয়েছে।

রায়েদ বাজারের অলিগলিতে চলে গাঁজা-ইয়াবার ব্যবসা।ঘাগটিয়ার খিরাটী বাজারের পাশে ঋষি বাড়িতে দিনরাত চলে মদের ব্যবসা। সিঙ্গুয়া বাজার পূর্ব হতেই ক্রাইম জোন হিসেবে খ্যাত।মদ, গাঁজা, ইয়াবা, হিরোইন সহ মাদকের সব আইটেই আছে এই বাজারে। সিঙ্গুয়া বাজার ও বারিষাব বাজার সহ চরদুর্লভখাঁ গ্রামের দেখবাল করেন স্থানীয় ইউপি সদস্য সুমন মেম্বর।

“কড়িহাতায় মাদক থাকবেনা, বাল্য বিয়ে হবেনা” বলেছিলেন সেই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মাহবুবুল আলম মোড়ল। গত বছর ৬ জুন গাজীপুর জেলা তথ্য অফিস আয়োজনে এক কর্মশালায় তিনি এই প্রতিশ্রুতি দিয়ে ছিলেন।বাস্তবতা উল্টো।

চাঁদপুর ও সিংহস্রী বসে নেই। সেখানেও রয়েছে বড় বড় মাদক ব্যবসায়ী। মাদক সেবীর সংখ্যাও কমছে না।  প্রতিদিনই চাঁদপুর বাজার এলাকায় মাদকসেবী ও ব্যবসায়ীদের আনাগোনা দেখা যায়।সিংহস্রী শীতলক্ষ্যা নদীর পূর্ব পাশে ১৭টি গ্রাম নিয়ে অবস্থিত। সব গ্রামেই চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী রয়েছে। মাদক ব্যবসায়ীদের পক্ষে দালালির কারণে প্রশাসনিকভাবে মাদক ব্যবসায়ীদের দমনের উদ্যোগ ভেস্তে যাচ্ছে।

মাদকাসক্তির প্রভাবে যুবশ্রেণির নৈতিক অধঃপতন ঘটেছে। নেশাগ্রস্থদের মধ্যে অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। মাদকাসক্ত ব্যক্তি নেশার খরচ যোগানোর জন্য নানা রকম সমাজবিরোধী কাজে লিপ্ত হয়ে পড়েছে। মাদকের ছোবলে ধ্বংসের পথে যুবসমাজ। উঠতি বয়সের ছেলে মেয়েরা নেশায় আসক্ত হচ্ছে, অশ্লীলতার ছোবলে হারাচ্ছে নৈতিক চরিত্র।

মো: নজরুল ইসলাম নামে স্থানীয় বাসিন্দা জানান, মাদকাসক্তদের উৎপাতে এলাকায় আমাদের বসবাস করাই দায় হয়ে পড়েছে। এদের বিরুদ্ধে প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা গ্রহন করছেনা বলে তিনি অভিযোগ করেন।

এ ব্যাপারে কাপাসিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাখাওয়াত হোসেন বিজ্ঞাপন চ্যানেলকে বলেন, “আমরা পরিষদ মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহন করেছি। আমার এলাকা মাদকমুক্ত করার জন্য অভিভাবকদের নিয়ে সচেতনতামূলক সভা এবং মাদকের কুফল বিষয়ে লোকজনকে অবহিত করা হচ্ছে।”

জানতে চাইলে কাপাসিয়া থানার ওসি মোহাম্মদ আবু বকর সিদ্দিক বলেন, “আমরা কয়েক দফা মাদক বিরোধী অভিযান চালিয়েছি । আমরা আরো অভিযান চালাব। কাপাসিয়াকে মাদকমুক্ত এলাকা ঘোষনা করা হবে।”