কাপাসিয়া শীতলক্ষ্যা নদীতে লাশের মিছিল, প্রয়োজন সচেতনতা

শাহানাজ আক্তার রিয়া : গাজীপুর-নরসিংদী সীমান্ত এলাকা দিয়ে বয়ে যাওয়া শীতলক্ষ্যা নদীতে ইঞ্জিন চালিত নৌকা ডুবে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৫ জন। তবে ঠিক কতজন আহত হয়েছেন তা নির্দিষ্ট করে বলতে পারছেন না কেউ।

গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার তারাগঞ্জ এলাকায় শুক্রবার (৩০ ডিসেম্বর) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে তারাগঞ্জ বাজার এলাকায় শীতলক্ষ্যা নদীর খেয়াঘাটে এদুর্ঘটনা ঘটে। ৫ জনের মরদেহ উদ্ধার কাজ শেষ করেছে ডুবুরী দল ও স্থানীয়রা।

নিহতরা হলেন- নরসিংদীর শিবপুর থানার পাড়াতুল এলাকার বাবুল মিয়ার ছেলে আতিক (২৫), একই থানার মধ্যনগর এলাকার ননি খাঁনের ছেলে তাজিম খাঁন (২১) ও আলীনগর এলাকার নূর মোহাম্মদের স্ত্রী কোহিনুর বেগম (৩০), লাকপুর এলাকার হাছেন আলীর ছেলে আশু মিয়া (৪৫) ও  পাড়াতুল এলাকার তারা মিয়ারর ছেলে আব্দুল কাইয়ুম মিয়া (১৭)।

কাপাসিয়া থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. দুলাল মিয়া জানান, নরসিংদীর শিবপুর থানার বিভিন্ন এলাকা থেকে ২০-২৫ জন কাপাসিয়ায় তারাগঞ্জ এলাকায় একটি অনুষ্ঠানে আসছিলো। পরে কাপাসিয়া তারাগঞ্জ বাজার এলাকায় শীতলক্ষ্যা নদী পার হওয়ায় সময় তাদের ইঞ্জিন চালিত খেয়া নৌকাটি নদীর মাঝখানে ডুবে যায়। এসময় স্থানীয়রা ও ডুবুরীদল উদ্ধার কাজ শুরু করে মধ্যে রাত পর্যন্ত নদী থেকে ৫ জনের লাশ উদ্ধার করে। যারা নদী থেকে সাঁতরে উঠে আসছিল তারা পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ না করায় ১০-১৫ জন নিখোঁজ ছিল বলে জানা যায়। তাদের সন্ধান পাওয়ায় উদ্ধার অভিযান রাতেই শেষ হয়।

কাপাসিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবু বক্কর সিদ্দিক জানান, খেয়া নৌকা ডুবির ঘটনায় ৫ জনের জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। নিখোঁজের তালিকায় কেউ না থাকায় রাতেই উদ্ধার অভিযান সমাপ্ত করা হয়।

বিজ্ঞাপন চ্যানেলের অনুসন্ধানীতে দেখা যায়, গত দেড় বছরে কাপাসিয়ায় শীতলক্ষ্যা নদী থেকে কমপক্ষে ২৫ জনের লাশ উদ্ধার হয়েছে। উপজেলার তরগাঁও ইউনিয়নের ঋষিপাড়া এলাকার উজ্জ্বল চন্দ্র মনিদাস নিখোঁজের তিনদিন পর তার গলাকাটা লাশ গত ১৯ নভেম্বর দুপুরে শীতলক্ষ্যা নদীর বলদা এলাকা থেকে মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। শীতলক্ষ্যা নদীতে লাশটি ভাসতে দেখে এলাকাবাসী পুলিশে খবর দেয়।

কাপাসিয়ার শীতলক্ষ্যা নদীতে নিখোঁজের তিনদিন পর দু’ বালু শ্রমিকের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয় গত ২০অক্টোবর বৃহষ্পতিবার। ডুবুরিরা মৃতদেহ দুটি উদ্ধার করেন।এ ঘটনায় গ্রেপ্তার করা হয় বরমী এলাকার বালু ব্যবসায়ী হাজী রফিক মুন্সী ও ড্রেজার মালিক হাবিবুর রহমানকে।

গত ১ এপ্রিল উপজেলার সাফাইশ্রী গুদারা ঘাটের কাছে নদীতে গোসল করতে নেমে অবৈধ বালু উত্তোলনকারীদের সৃষ্ট গর্তে আটকে গিয়ে ডুবে মারা যায় সাদিকুল ইসলাম(১২) নামের এক মাদ্রাসা ছাত্র।

পাশেই কিছুদিন আগেও একই ভাবে আরেকটি শিশুর মৃত্যু হয়।সে উপজেলার রায়নন্দা গ্রামের হানিফের ছেলে আলিফ (০৯)। শিশুটির ভাসন্ত লাশ ৯ মার্চ সকাল সাড়ে ৯ টায় শীতলক্ষ্যা নদীর বলধা ঘাট থেকে উদ্ধার করে স্থানীয় জনতা।

গত ২৫ জুলাই শনিবার দুপুরে উপজেলার নারায়নপুর গ্রামে মামার বাড়ীতে বেড়াতে এসে শীতলক্ষ্যা নদীতে গোসল করতে গিয়ে পানিতে ডুবে আখিয়ার জামান মিছিল (১৪) নামে এক স্কুল ছাত্রের মৃত্যু হয়।

কাপাসিয়ায় পিকনিক করতে গিয়ে লাশ হয়ে বাড়ি ফিরে ফয়সাল মোল্লা (১৮)। শীতলক্ষ্যা নদীতে নিখোঁজ হওয়ার একদিন পর কালীগঞ্জ তীরে ভেসে উঠে ফয়সালের মৃতদেহ।২২ জুলাই  বিকেল ৪টার দিকে কালীগঞ্জের গুদারাঘাট তীর থেকে পুলিশ তরুণের মৃতদেহটি উদ্ধার করে। কাপাসিয়া উপজেলার রাওনাট এলাকা থেকে এক দল কিশোর ২১ জুলাই মঙ্গলবার দুপুরে ইঞ্জিন চালিত নৌকা যোগে শীতলক্ষ্যা নদীতে পিকনিক করতে গিয়ে পানিতে পড়ে তলিয়ে গিয়ে মারা যান তিনি।

কাপাসিয়া উপজেলার রাণীগঞ্জের পূর্বপার্শ্বে শীতলক্ষ্যা নদীতে ডুবে মারা যায় এক হতদরিদ্র ক্ষেতমজুর। তার নাম কাজল মিয়া (৩৫)। উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের নাশেরা গ্রামের মরহুম ফালাজ উদ্দিন মাঝির পুত্র সে। এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনাটি ঘটে ৯ জুন বেলা দেড়টার দিকে।

এভাবে শীতলক্ষ্যা নদীতে ডুবে একের পর এক মারা যাচ্ছে ছাত্র, ক্ষেতমজুর সহ অাবাল-বৃদ্ধ বনিতা। ভুক্তভোগীদের প্রশ্ন, এই  মৃত্যুর মিছিলের শেষ কোথায়? এ অকাল অস্বাভাবিক মৃত্যুর দায় কার? কোন অবস্থায় আছে নদীর গর্ভে তলিয়ে যাওয়া মানুষদের পরিবার? এসকল প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার আগেই নাকি এই  মৃত্যুর মিছিলে যুক্ত হয়ে যায় আরেক মায়ের সন্তান!

বিশেষজ্ঞদের অভিমত, একটু সচেতন হলে হয়তো এই মর্মান্তিক ঘটনাগুলো ঘটতো না।