কারা কর্মকর্তা বনাম কয়েদিদের মধ্যে প্রীতি ফুটবল ম্যাচ অনুষ্ঠিত

স্টাফ রিপোর্টার: তখন বিকেল সাড়ে চারটা। বল জড়াল কারা কর্মকর্তাদের জালে। দর্শক হিসেবে মাঠে হাজির হাজারো কয়েদির তীব্র উল্লাস। চলছে হাততালি। এরপর বহু চেষ্টা করেও কয়েদিদের জালে বল জড়াতে পারেননি কারা কর্মকর্তারা। শেষমেশ কয়েদিদের কাছে হার মেনে মাঠ ছাড়ে কেরানীগঞ্জের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের কারা কর্মকর্তাদের ফুটবল দল। আজ শুক্রবার নববর্ষের দিন চার দেয়ালের মাঝে হাজার হাজার বন্দীকে নির্মল আনন্দ দিতে প্রীতি ফুটবল ম্যাচ আয়োজন করে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার কর্তৃপক্ষ। কারাগার সূত্র এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।

জানতে চাইলে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের জ্যেষ্ঠ তত্ত্বাবধায়ক জাহাঙ্গীর কবির বলেন, পয়লা বৈশাখ বাঙালির বড় উৎসবের দিন। দেশবাসী আনন্দে মেতেছে। বন্দীরাও বাংলাদেশেরই মানুষ। বাংলার সংস্কৃতিকে তাঁরাও ধারণ করেন। তাঁদের আনন্দ দিতে এই ফুটবল ম্যাচের আয়োজন করা হয়। আগে কয়েদি বনাম কয়েদি ফুটবল খেলেছে। কিন্তু এই প্রথমবারের মতো কয়েদিদের আনন্দ দিতেই কয়েদিদের কারা কর্মকর্তাদের সঙ্গে ফুটবল খেলার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ ইফতেখার উদ্দীনের পরামর্শেই কয়েদিদের জন্য এসব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

কারা সূত্র বলছে, বেলা তিনটার পর থেকে কেরানীগঞ্জে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের অভ্যন্তরে খেলার মাঠের চতুর্দিকে কয়েক হাজার বন্দী কয়েদি বনাম কারা কর্মকর্তাদের প্রীতি ফুটবল ম্যাচ দেখার জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন। বেলা সাড়ে তিনটার দিকে কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার মাহবুবুল ইসলামের নেতৃত্বে কারা কর্মকর্তাদের ফুটবল দল মাঠে চলে আসে। তখন মাঠে হাজির হয় কয়েদিদের ফুটবল দল। খেলা শুরুর কয়েক মিনিটের ব্যবধানে কয়েদিরা বল জড়ান কারা কর্মকর্তাদের জালে। কিন্তু এর আগে রেফারি বাঁশি বাজিয়ে জানিয়ে দেন, বল জড়ানোর আগে কয়েদি ফুটবলার অফসাইড হন। খেলার শুরু থেকে ধারাভাষ্য দেন একজন কয়েদি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কারারক্ষী বলেন, খেলা চলার সময় ধারাভাষ্যকার বারবার বলছিলেন, ‘কয়েদিরা চার দেয়ালের মধ্যে বন্দী থাকলেও আজ তাঁরা মহাখুশি। কয়েদিরা কখনো কল্পনাই করেননি, তাঁরা খেলবেন কারা কর্মকর্তাদের সঙ্গে।’ কোনো কয়েদি ফুটবলার যখন বল নিয়ে কারা কর্মকর্তাদের গোল পোস্টের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন হাজারো বন্দী হাততালি দিয়ে তাঁদের উৎসাহ দিতে থাকেন। কয়েদি ধারাভাষ্যকার আবেগতাড়িত হয়ে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলছিলেন, ‘কয়েদিদের জীবনে এত আনন্দের দিন আর কখনোই আসেনি। বহু পয়লা বৈশাখ কেটেছে চার দেয়ালের মধ্যে। কোনো দিন এত আনন্দ পাননি কয়েদিরা।’ কয়েদিদের ফুটবল দলের সঙ্গে যখন কারা কর্মকর্তাদের ফুটবল দলের খেলা শেষ হয়, তখন দর্শক বন্দীরা উল্লাস করতে থাকেন। বিশেষ করে বৃদ্ধ ও তরুণ কয়েদিদের মধ্যে উল্লাসটা ছিল বেশি।

কারাবন্দীদের কথা চিন্তা করে এ বছর নানা কর্মসূচি হাতে নেয় কারাগার কর্তৃপক্ষ। কয়েক দিন আগে থেকে কারাগারের ভেতরে সড়কে আলপনা আঁকা হয়। দেয়ালে ঝোলানো হয় ফেস্টুন-ব্যানার। পুরো কারাগার সাজে অন্য রূপে। এই কারাগারটিতে বন্দী আছেন ৭ হাজার ৩৮২ জন। কারাগার সূত্র নিশ্চিত করেছে, পয়লা বৈশাখ উপলক্ষে কয়েদিদের জন্য বিশেষ খাবারের ব্যবস্থা করেছে কারাগার কর্তৃপক্ষ। সকাল দেওয়া হয়েছে ভুনা খিচুড়ি, ডিম ভুনা। দুপুরে রুই মাছ আর আলুর দম। আর রাতে পোলাও মুরগি। সঙ্গে আছে পান সুপারি আর মিষ্টি।

কারাগারের ভেতরে কেস টেবিল নামের একটি জায়গা রয়েছে। সেখানেই তৈরি হয় স্টেজ। আনা হয় বাদ্যযন্ত্র। সকাল নয়টা থেকে বেলা দুইটা পর্যন্ত কয়েদিদের কেউ করেন গান, কেউ করেন অভিনয়। এভাবে কাটে বন্দীদের সকাল-দুপুর।

খাবার দেওয়া নিয়ে তুলকালাম
নববর্ষের দিন বন্দীদের সঙ্গে দেখা করতে কারাগারে ঢল নামে দর্শনার্থীদের। সকাল থেকে জড়ো হতে থাকেন তাঁরা। বন্দীদের জন্য নিয়ে আসেন বাসায় রান্না করা খাবার। বাইরের খাবার বন্দীদের জন্য দেওয়া হয় না, সেই অজুহাত দেখায় কর্তৃপক্ষ। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে দর্শনার্থীরা। পরে কারা কর্তৃপক্ষ বন্দীদের কাছে খাবার পৌঁছে দেয়। জানতে চাওয়া হলে কারাগারের জ্যেষ্ঠ তত্ত্বাবধায়ক জাহাঙ্গীর কবির বলেন, বাইরের খাবার বন্দীদের দেওয়া নিষেধ। তারপরও দর্শনার্থীদের কথা চিন্তা করে খাবার পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।