গাইবান্ধায় প্রকৃতির সঙ্গে মিশে আছে ফ্রেন্ডশীপ সেন্টার

গাইবান্ধা থেকে তোফায়েল হোসেন জাকির: ফ্রেন্ডশীপ নামের একটি ভবন। ভবনের বিভিন্ন করে ছাদ মাটির সমতলে। তাতে লাগানো সবুজ ঘাস মিশে গেছে আশপাশের মাঠের সঙ্গে। গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার কঞ্চিপাড়া ইউনিয়নের মদনের পাড়া গ্রামে ফ্রেন্ডশীপ সেন্টার নামক এই ভবনের দিকে সবাই অবাক হয়ে তাকায়। প্রকৃতির সঙ্গে মিশে যেন অদৃশ্য হয়ে আছে কমপ্লেক্সটি। গাইবান্ধা- বালাসী সড়ক ঘেঁষে গড়ে ওঠা এই ভবনের আয়তন ৩২ হাজার বর্গফুট। স্থানীয় ভাবে তৈরি ইটের গাঁথুনি দিয়ে নির্মিত ভবনটি দেখতে প্রতি দিনই কৌতহলী মানুষের ভীড় জমে।

একাধিক ব্লকে বিভক্ত একটি ভবন। এ ভবনে প্রশিণ খেলাধূলা ও থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা। একটির সংঙ্গে আরেকটির সংযুক্ত বারান্দা ও খোলা প্যাভিলিয়ন দিয়ে। পুরো ভবনটিই দৃষ্টির আড়ালে। পাশ দিয়ে চলে গেছে গ্রাম্য সড়ক। অথচ সেখানে দাঁড়িয়ে ভবনটি চোখেই পড়বে না। কারণ, পুরো ভবনটি মাটির নিচে।

স্থানীয়রা বলেন, বাইরে থেকে অনেক লোক প্রতিদিন ভবন দেখতে আসে। ফলে এলাকায় বেচা-বিক্রি হয় বেশি। একই এলাকার মদনেরপাড়া গ্রামের কলেজ শিক্ষক মেরাজ আলী বলেন, নদী ভাঙ্গন কবলিত এই প্রত্যন্ত এলাকায় এমন একটি ব্যতিক্রমী স্থাপনা এলাকার সৌন্দর্য বাড়িয়ে দিয়েছে।

ফ্রেন্ডশীপ সূত্রে জানা গেছে, আধুনিক ও চৌকস স্থপত্যশৈলীর এই ভবণ এবার আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজের উপস্থিতি জানানও দিয়েছে। সারা বিশ্বের সম্মান জনক আগাখাঁন স্থপত্য পুরস্কারের জন্য সংক্ষিপ্ত তালিকায় এবার বাংলাদেশের যে দুটি স্থাপনা মনোনয়ন পেয়েছে এটি তার একটি। সুইজারল্যান্ড ভিত্তিক আগাখাঁন ডেভেলপমেন্ট নেটওয়ার্কের (একেডিএন) পুরস্কারের জন্য বিশ্বের ৩শত ৮৪টি স্থাপনাকে পিছনে ফেলে সেরা ১৯ স্থাপনার তালিকায় রয়েছে গাইবান্ধার ফ্রেন্ডশীপ সেন্টার। এটির স্থপতি কাসেফ মাহবুব চৌধুরী।

তরুণ স্থপতিদের উদ্ভাবনী ধারনাকে স্বীকৃতি দিতে আগাখাঁন ডেভেলপমেন্ট নেটওয়ার্ক প্রতি তিন বছর পর পর এই পুরস্কার দেয়। অনেক বিষয় এক্ষেত্রে বিবেচনা করা হয়। উদ্ভাবনী আইডিয়ার পাশাপাশি স্থাপনাটি কতটা পরিবেশ বান্ধব সেটি দেখা হয়। সেই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দেশের সংস্কৃতির সঙ্গে এটির যোগ সূত্রও বিবেচনা করা হয়।

ফ্রেন্ডশীপ সেন্টার সম্পর্কে বলতে গিয়ে স্থপতি কাসেফ মাহবুব চৌধুরী বিজ্ঞাপন চ্যানেলকে বলেন, স্বল্প বাজেটে প্রকল্পটি নির্মাণের চিন্তা ছিল। কম খরচের চিন্তা আর চাপের কারনে চমৎকার এই সৃষ্টি সম্ভব হয়েছে। এই ভবনের অনুপ্রেরণা বৌদ্ধবিহারের ধারণা থেকে এসেছে বলে জানালেন তিনি। ফ্রেন্ডশীপ সেন্টারের ভবনটি ওপর দিক থেকে দেখলে মহাস্থানগড়ের প্রাচীন বৌদ্ধ বিহারের ছবি ফুটে ওঠে অনেকটা।

ভবনের বিশেষত্ব জানতে চাইলে তরুণ স্থপতি বলেন, ভবনের জমি খুবই নিচু ছিল। পানি আটকাতে চারিদিকে বাঁধ দেওয়া হয়েছে। ভবনের ছাদের লেভেল রাস্তার প্রায় সমতলে। আমার লক্ষ্য ছিল অল্প খরচে সবার জন্য ভিন্নধর্মী কিছু একটা করা। এটি একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার কার্যালয়। সংস্থাটি চরের মানুষের জন্য কাজ করে। সেখানে প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের পাশাপাশি চরের মানুষ জনের জন্য সেবা দেওয়ার বিষয়টি রয়েছে। তাই সেখানে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বিদেশী দাতা সংস্থার লোক জন আসবেন, থাকবেন-সেটাও একটি বিষয়। তাই সবাই যাতে ভবনে স্বাচ্ছন্দ্যে বিচরণ করতে পারেন সেটাও মাথায় রাখতে হয়েছে।

কাশেফ মাহবুব চৌধুরী জানালেন, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে এটা ব্যবহৃত হবে জেনে নিরিবিলি ও শান্ত একটি পরিবেশ তৈরির বিষয়টি ভাবা হয়েছে। পর্যাপ্ত আলো আর বাতাসের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ব্যবহার করা হয়েছে দেশী বিদেশী উপকরন।

ফ্রেন্ডশীপ সেন্টার কার্যালয় সূত্র জানিয়েছে, এই ভবণ নির্মাণে খরচ হয়েছে আনুমানিক আট কোটি টাকা। নির্মাণ কাজ শেষ করতে সময় লেগেছে প্রায় দুই বছর। প্রতিষ্ঠানটি মনে করেছে, মাটি ভরাট করে ভবন নির্মাণ করতে গেলে বাজেটের ৬০শতাংশই শেষ হয়ে যেত। এছাড়া প্রতিষ্ঠানটির অবস্থান গ্রামে হওয়ার কারনে সেখানে দোতলা ভবন করলে গ্রামের পরিবেশের সঙ্গে মিলত না। তাই সমতল ভুমির সাথে মিল রেখে ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছে। এতে গ্রামের প্রকৃতির অংশ হয়ে উঠেছে ভবনটি।

ফ্রেন্ডশীপ সেন্টারের সহকারি ব্যবস্থাপক লোকমান হোসেন বিজ্ঞাপন চ্যানেলকে বলেন, মাটির নিচে ভবনের কক্ষ অনেকটা ঠান্ডা থাকে। বাইরের আলো বাতাসো পাওয়া যায়। এটি পরিবেশ বান্ধব কার্যালয়। কাশেফ মাহবুব চৌধুরী ১৯৯৫ সালে বুয়েট থেকে স্নাতক শেষ করে স্থপত্য পেশায় যোগ দেন। আরেক স্থপতি মেরিনা তাবাসসুমের সঙ্গে প্রতিষ্ঠা করেন আরবানা। দুই জনেই যৌথ ভাবে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্বাধীনতা স্তম্ভ ও স্বাধীনতা জাদু ঘরের নকশা করেন। এখন কাসেফ মাহাবুবই আরবানার একক প্রধান।