জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক কাপাসিয়ার মোতালিবের দাফন সম্পন্ন

মোঃ রুহুল আমীন বি.এস-সি: বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক, কাপাসিয়ার কৃতি সন্তান ফুটবলার মোঃ মোতালিব হোসেন (৬৫) শনিবার দিবাগত রাত সাড়ে তিনটায় ব্রেইন স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন (ইন্নালিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজেউন)।

তিনি কাপাসিয়া উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান আবদুল গাফফারের বড় ভাই। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়েসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে যান। তার মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে।

তার জানাজার নামাজ গ্রামের বাড়ি দুর্গাপুরে রোববার বিকাল দু’টায় অনুষ্ঠিত হয়। জানাজার নামাজে কৃষকলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি মোতাহার হোসেন মোল্লা ,কাপাসিয়া উপজেলা আওয়ামীলীগের ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারী মিজানুর রহমান, বাংলাদেশ রেলওয়ের সাবেক শ্রমিকনেতা হাবিবুর রহমান আকন্দ, বিশিষ্ট ক্রীড়া সংগঠক ও কাপাসিয়া বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী (বদু), বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির গাজীপুর জেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক ও প্রধান শিক্ষক আশরাফুল আলম খান সহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

কাপাসিয়া উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার পক্ষ থেকে মরহুমের কফিনে শ্রদ্বা নিবেদন করে পুষ্প স্তবক অর্পন করেন উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারন সম্পাদক জাকির হোসেন দর্জি বকুল সহ ক্রীড়া সংস্থার অন্যান্য কর্মকর্তা।

আজ বাদ জোহর কাপাসিয়ায় মোতালেবে প্রথম জানাজা হওয়ার পরে বিকালে ঢাকা আবাহনী ক্লাব ও পলাশী মসজিদে তৃতীয় জানাজার পর মোতালেবকে আজিমপুর কবরস্থানে দাফন করা হয়।

কাপাসিয়ার মোতালিবসাবেক কৃতি এই ফুটবলার ১৯৭৩ থেকে১৯৮২ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের সফল অধিনায়ক ছিলেন। তার সফল নেতৃত্বে ১৯৮২ সালে বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দল এশিয়ান গেমসে অংশগ্রহণ করে। ১৯৬৯ সালে রহমতগঞ্জ ক্লাবের সদস্য হয়ে জাতীয় পর্যায়ের একজন ফুটবলার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে তিনি ঢাকা প্রিমিয়ারলীগ,সাধারণ বীমা, বাংলাদেশ নৌবাহিনী,ঢাকা আবাহনী সহ নানা দলের সদস্য ও অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেন। কৃতি এই ফুটবলার ১৯৯৩ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের কোচের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি মালয়েশিয়া ও জামানিসহ বিভিন্ন দেশ থেকে কোচেস প্রশিক্ষণ গ্রহন করেন। কৃতি এই ফুটবলার ১৯৫২ সালের ২৮ এপ্রিল গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার দুর্গাপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম মরহুম আব্দুর রশিদ। তিনি ১৯৬৮ সালে কাপাসিয়া পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি, ১৯৭০ সালে এইচএসসি এবং ১৯৭৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক পাশ করেন। খেলোয়ার জীবনের পাশাপাশি তিনি নৌবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন। দীর্ঘদিন যাবৎ তিনি নানা রোগে ভোগছিলেন।

বাংলাদেশে এখন মানসম্পন্ন ফুটবলারের বড় অভাব। বিশেষ করে গোলরক্ষক পজিশনে শূন্যতায় ভুগছে বলা যায়। মহসিন, কাননের পর আমিনুল ও বিপ্লব এখনও খেলছেন কিন্তু তাদের নৈপুণ্য চোখে পড়ার মতো নয়। জাতীয় দলের গোলরক্ষকরা যেন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গোল হজম করছে। ফুটবলে দুর্দশা এখানেই ফুটে উঠছে। অথচ এক সময়ে দেশে তারকা গোলরক্ষকের অভাব ছিল না। ভারতের ভাস্কর গাঙ্গুলীকে বলা হতো এশিয়ার সেরা অন্যতম গোলরক্ষক। বর্তমান প্রজন্মের ক্রীড়ামোদীদের বিশ্বাস করানো মুশকিল হবে যে পাকিস্তান আমলে শহিদুর রহমান শান্টুর খেলা দেখে ইন্দোনেশিয়া কোচ আবু নেছার বলেছিলেন শান্টুর মতো গোলরক্ষক তিনি আর দেখেননি। চুম্বুক বলা হতো শান্টুকে। সেই শান্টুর একক রাজত্বে ভাগ বসান মো. মোতালেব হোসেন। ইস্টঅ্যান্ড থেকে ঢাকা ফুটবলের ক্যারিয়ার শুরু করেন তিনি। রহমতগঞ্জে যোগ দিয়েই সাড়া ফেলে দেন গোলরক্ষক মোতালেব। তখনও রহমতগঞ্জ মাঝারি মানের দল গড়তো। কিন্তু বড় বড় দলের ঠিকই পয়েন্ট নষ্ট করতো। সুলতান, স্কুটার গফুর, তসলিম, কালারা খেলতেন তখন রহমতগঞ্জে। কিন্তু একাই যেন খেলতেন মোতালেব। প্রতিপক্ষের কত নিশ্চিত গোল যে ঠেকিয়েছেন তা হিসাব মেলানো মুশকিল। সেই মোতালেব চলে গেলেন না ফেরার দেশে। দীর্ঘ ফুটবল ক্যারিয়ারে অধিকাংশ সময়ে মোতালেব রহমতগঞ্জেই খেলেছেন। এই দলের অধিনায়ক ছিলেন তিনিই। তার নেতৃত্বে ১৯৭৭ সালে রহমতগঞ্জ লিগে রানার্সআপ হয়। লিবারেশন কাপ টুর্নামেন্টেও রহমতগঞ্জ রানার্সআপ হয়।

১৯৭৭ ও ১৯৭৮ সালে জনপ্রিয় ঢাকা আবাহনীর গোলরক্ষক ছিলেন শ্রীলঙ্কার লায়ন পিরিচ। এরপরই মোতালেব যোগ দেন আবাহনীতে। সেই সময়ে সালাউদ্দিন, নান্নু, অমলেশ, টুটুল, চুন্নু, খোরশেদ বাবুল, আনোয়ার, হেলালদের মতো তারকা ফুটবলার থাকলেও আবাহনী যোগ্য গোলরক্ষক খুঁজে পাচ্ছিল না। সেই শূন্যস্থান পূরণ হয় মোতালেব আগমনের পর। পারফরম্যান্সের বিচারে তিনিই তখন ছিলেন দেশের সেরা গোলরক্ষক। ১৯৮১, ১৯৮৩, ১৯৮৪ ও ১৯৮৫ সালে আবাহনীর শিরোপার জয়ে সঙ্গী ছিলেন মোতালেব। পোস্টে মোতালেব ছিলেন বলেই আবাহনী নির্ভয়ে খেলতে পারত। শুধু গোলরক্ষকের দায়িত্ব পালন করতেন না। সামনে এগিয়ে এসে সতীর্থদের নির্দেশনাও দিতেন তিনি। অনেক গোলরক্ষকের দেখা মিলেছে মাঠে। কিন্তু শান্টু ও মোতালেবের নামটি চির স্মরণীয় হয়ে থাকবে। নিয়মিত না হলেও মোতালেব ১৯৭৬ সালে ঢাকা মোহামেডানের পক্ষে দক্ষিণ কোরিয়া সম্মিলিত বিশ্ববিদ্যালয়ের বিপক্ষে এক প্রীতি ম্যাচে অংশ নেন।

১৯৮২ সালে মোতালেবের নেতৃত্বে জাতীয় দল দিল্লি এশিয়ান গেমসে অংশ নেয়। আরেক গোলরক্ষক মহসিনও দলে ছিলেন। নিয়মিত গোলরক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন মোতালেবই। ওই আসরে শক্তিশালী মালয়েশিয়াকে ২-১ গোলে হারিয়েছিল বাংলাদেশ। সেই ম্যাচে অসাধারণ খেলেছিলেন মোতালেব। ফুটবলের কোচিংয়ের ওপর ১৯৯৩ সালে মালয়েশিয়া এএফসি ইন্টারন্যাশনাল কোচেস ট্রেনিং। ১৯৯৫ সালে ব্রাজিলে ফিফা ইন্টারন্যাশনাল কোচেস ট্রেনিংয়ের অভিজ্ঞতা রয়েছে মোতালেবের।  তার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কীয় সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি সিমিন হোসেন রিমি এমপি, ওয়ার্ল্ড হিউম্যান রাইটস ডিপার্টমেন্ট, বাফুফে, ঢাকা আবাহনী, ঢাকা মোহামেডান, রহমতগঞ্জ, সম্মিলিত ক্রীড়া পরিবার, বাংলাদেশ স্পোর্টস জার্নালিস্ট কমিউনিটি, বাংলাদেশ ক্রীড়া সাংবাদিক সংস্থা, ক্রীড়া লেখক সমিতি, বিজ্ঞাপন চ্যানেল সহ বিভিন্ন সংগঠন মোতালেবের মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন।