জাপানিদের দীর্ঘ জীবনের রহস্য কী জানেন?

যদি হয় সুজন, তেঁতুল পাতায় ন’জন

চ্যানেল ডেস্ক : যদি হয় সুজন, তেঁতুল পাতায় ন’জন।  জাপানিরা কি এই মন্ত্রে বিশ্বাসী? তাই যদি হবে তাহলে আধুনিক “নিউক্লিয়ার পরিবার” কন্সেপ্টে এরা এতোটাই বিশ্বাসী কিভাবে যে বাসা পর্যন্ত মাইক্রো সাইজ? ভুলেও কাউকে এই ক্যাপসুল বাড়িতে নিয়ে যাবে না। মূলতঃ জনবসতি বেশি  হওয়াতেই এদের এমন ক্যাপসুল সাইজ বাসা বাড়ি ডর্মেটরি সব। কিন্ডারগার্টেন থেকে স্কুল, কলেজে সবখানেই সকাল- বিকাল ক্লাস, স্পোর্টস সেরেই বাসায় ফেরে, ফিরেই ৬ টায় ডিনার, ৯টা-দশটার মধ্যে ঘুম। বাবাও কাজ থেকে ফিরে দ্রত সব সেরেই ঘুম। তাই বাসা বড় দিয়ে কি হবে?  ফ্যামিলি ফ্ল্যাটের স্ট্যান্ডার্ড সাইজ হয় ৫০০-৭০০ স্কয়ার ফিট।

পাঠক চোখ কপালে তুললেও জাপানিরা আমাদের দেশে তাদের তিনভাগের এক ভাগ সাইজ আর দেড়গুণ বেশি জনসংখ্যা নিয়ে ১২০০ স্কয়ার ফিটের নিচে ফ্ল্যাট-বাড়ি হয় না শুনেও একইভাবে চোখ কপালে তোলে! এদের বিস্ময়- তাহলে রাস্তা, পার্ক এসব কোথায় হয়! `কি করে বলিব আমি` এসব কিছুই আর বলা হয় না! বাংলাদেশে রাস্তার কয়েকগুণ গাড়ি, আবাসস্থল। পার্ক কিসের? দৌড়াবে কে? ফুটপাথই নাই হাঁটার! আর পার্কে খেলবে কে? বাচ্চাদের ইলেক্ট্রনিক্স গেজেড দিয়ে দাও-সারাদিন গেইম খেলবে। কিসের শারীরিক কসরত? সারাদিন বসে বসে জাংক ফুড খেয়ে সবার শরীরের একটাই শেইপ, রাউন্ড।

মাস্টার্সের এক ছেলে খুব আগ্রহ করে তার বাসায় আমাদের দাওয়াত দিল। দরজা দিয়ে ঢুকে দেখি দুই হাত দেয়ালের দুই প্রান্তে লেগে যায়। টয়লেটে কমোডে বসলে লম্বা ছেলেদের হাঁটু দেয়াল ছুঁয়ে যায়। সটান হেঁটে দরজা দিয়ে ঢুকতেই ডানে এক বার্নারের ইলেক্ট্রিক চুলা যাতে শুধুমাত্র ১ কেজির একটি পাত্র আটবে। ঠিক তার পাশেই সেই পাত্র ধোবার সাইজেরই বেসিন। এই পেরিয়ে একটাই রুম, সেই রুমে একটা সিংগেল বেড, একটা টেবিল চেয়ার ছাড়া আর কিছুই রাখার জায়গা নাই! গায়ক কবীর সুমনের “ ১০ ফুট বাই ১০ ফুট” গান মনে পড়ে যায়!  এখন বলতে পারেন, “মোটা হলে কি করবে?” এইখানেই তো কবি নীরব আছেন!

মোটা হওয়া এমন দায় যে কিছু অফিসে কোমড়ের মাপ এদের স্ট্যান্ডার্ড না মানলে বেতন কাটা হয়। জী। সাধে কি এদের ৯৫% মানুষ স্লিম? এবং এই স্লিম বাঙালি স্লিম না রে ভাই, জাপানিজ স্ট্যান্ডার্ডে স্লিম! সেটা কেমন? BMI (Body Mass index) টার্ম দিয়ে বোঝাই। একটু পাটিগণিত কষতে হবে, বডি ম্যাস ইন্ডেক্স কত এটা বের করতে। আপনার শরীরের ওজনকে উচ্চতার বর্গ দিয়ে ভাগ করুন ( কেজি/ মিটার স্কয়ার)। যদি ২৫ এর নিচে হন, তবে সাধারণ স্ট্যান্ডার্ডে আপনি স্লিম। এতে সর্বত্র উতরে গেলেও জাপানি স্ট্যান্ডার্ডে আটকে যাবেন। কারণ, জাপানিজ স্ট্যান্ডার্ডে ২১ এর ভেতরে হলেই কেবল আপনি স্লিম। ২১ থেকে ২৪.৯ হলে আপনি স্বাস্থ্যবান /বতী- স্লিম নন মোটেই। তাই এদের বিবাহিত সদ্য প্রসূত মায়েদেরও দেখি এই ইন্ডেক্সে ১৮-২১ এর ভেতরেই থাকে।

মাথায় হাত দিয়ে বসতে পারেন, আমি মাথায় হাত দিয়ে দিয়েই ৭ বছর পার করেছি। এখন উদাস হয়ে থাকি। এদের বডি মেটাবলিজম আমাদের চেয়ে ভিন্ন, এদের শরীরের গড়ন ভিন্ন। কিন্তু এর অনেকটাই এদের জীবনযাপন পদ্ধতি, যার অনেকখানি মহামতী বুদ্ধের আদর্শের আদলের সাথে মিলে যায়, যদিও এরা মূলত ধর্মহীন, অন্তত এই যুগে।  এদের  জীবনযাপন একটু লাইন আপ করি।

এক.
এরা ভোরে ওঠে সবাই। দিন শুরু হয় ভারী নাস্তা দিয়ে, কিন্তু এদের খাবার কখনোই তৈলাক্ত বা মশলাযুক্ত হয় না। লবণের বাইরে মশলা খুব সামান্যই। এমনকি মিষ্টিও বেশি হয় না। (আইসক্রিম খেলে মনে হয়ে ওপরে চিনি ছিটিয়ে নেই )। অনেক খাবারই এরা কাঁচাই খেয়ে থাকে। এদের সুশী, সাশিমি তো সারাবিশ্বেই জনপ্রিয়, কিন্তু সবকিছুই হতে হবে একেবারে টাটকা। এরা রোজ বাজার করে, মার্কেটেও রোজের জিনিস আসে, দিন গেলে বিক্রি না হলে ফেলে দেয়।

দুই.
স্কুলে ২-৬ ঘন্টা স্পোর্টস এদের আবশ্যিক। কাজেই শরীরের আদর্শ গড়ন এভাবেই তৈরি হয়ে যায়। এবং সুদীর্ঘ এই অভ্যাসে এরা এভাবে অভ্যস্ত হয় যে ৮০ বছরে পৌঁছেও এরা জগিং, হাঁটা থামাতে পারে না। তাই পেটে চর্বি, ‘মেদ ভুঁড়ি কি করি’র যাতনাই নাই।

তিন.
এদের সন্ধ্যা বলে কোন বিষয় নেই, তাই সান্ধ্যকালীন নাস্তাও নেই। দুপুরের খাবার ১২টায়, এরপর ৬টায় রাতের খাবার। ঘুমের আগে ক্ষুধা পেয়ে গেলে দুধ চলতে পারে। উল্লেখ্য, গৌতম বুদ্ধের নীতি ছিল দুপুরের পর আহার গ্রহণ না করা।

মজার বিষয় হলো, এই টুথপিক-স্লিম জাপানিদের দেশে বাইরে থেকে কেউ এলেই সাধারণত মোটা হয়ে যায়। তার মূল কারণ এদের আঠালো ভাত। ভাতটা আমাদের “বসাভাত” এর মত যাতে মাড় গালার বিষয় থাকে না এবং অতিউচ্চ পুষ্টিগুণ সম্বৃদ্ধ। তো আমরাও তার শিকার হলাম। এরপর অফিস থেকে বাৎসরিক হেলথ চেকআপে গিয়ে দেখি রিপোর্টে যাবতীয় ক্যান্সারসহ সকল কিছুই ক্লিন এলেও কোলেস্টেরল ক্যাটাগরীতে E পেয়ে বসে আছি। পুনরায় সেই নির্দিষ্ট পরীক্ষায় পাঠানো হলো কিউশ্যু ইউনিভার্সিটির বড় হাসপাতালে।

আমি ভয় পেতে চাচ্ছিলাম না, কিন্তু এদের সিরিয়াসনেস দেখেই আমি ভয়ে অর্ধেক হতে বাধ্য হলাম। মনে হলো, আহা বাস্তবেই যদি ভয়েই অর্ধেক হওয়া যেত, কোন ডায়েট লাগতোনা !   ডাক্তার রি-চেকের রিপোর্ট দেখে থমথমে কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, – পরিবারে কেউ হার্টের অসুখে মারা গেছে? – জী, আজ পর্যন্ত যারা মারা গেছেন শুধুমাত্র হার্টের অসুখেই মারা গেছেন। ডাক্তার বজ্রাহত হয়ে তাকিয়ে থাকলেন।  শুরু হলো হাসপাতালের নিউট্রিশিয়ানিস্টের মেপে দেয়া জীবনযাপন। তাদের হিসাবে আমাকে ১০ কেজি কমাতে হবে, এবং তাও ২-৩ মাসে। কেমন করে?

১। যতদূর লেকচার মনে আছে, দিনে পূর্ণবয়স্ক নারীর দরকার হয় ১৬০০ ক্যালরি, পুরুষের ২১০০ । তো আমি যদি দিনে আমার রোজের খাবার ৭০০ ক্যালরিতে নামিয়ে আনতে পারি সপ্তাহে ১ কেজি হারে ওজন কমবে।
আমার ৭০০ ক্যালরির সারাদিনের হিসাব হল এমন-
সকালে গ্রিন টি বা স্কিম মিল্কের কফি ( ব্ল্যাক কফি হলে ভাল)। একটা ছোট পাউরুটি। একটা কলা । ৫টা চিনা বাদাম  বা ওয়াল-নাট ।
দুপুরে ২০০ ক্যালরির ভেতরে কোন কিছু ,যেমন, নুডলস সিদ্ধ (তেল ছাড়া) বা স্যান্ডইউচ, গাজর ও শসা একটা করে।
সন্ধ্যায় আবারো গাজর , শসা একটা করে, সাথে এক কাপ ভাত এবং তেল ছাড়া ( তন্দুরী বা গ্রিল)  মাছ বা মাংস ৮০- ১২০ গ্রাম।

২। এবং, এখানেই সব কিছু শেষ নয়! সপ্তাহে অন্তত ৫ দিন দুই ঘন্টা করে জিম। ট্রেড মিলে দৌড়ানো, সর্বাঙ্গের ফ্রি হ্যান্ড এবং মেশিনে ব্যায়াম।

সেই তিনমাস আমার কেমন গেছে জানতে চেয়ে আর দাগা দিয়েন না, কিন্তু ডাক্তারের মুখে হাসি ফোটাতে পেরেছিলাম! “মোরা একটি মুখের হাসির জন্য অস্ত্র ধরি” অবস্থা! কিন্তু, আমার মহামান্য কোলেস্টেরল কি আর এতো নিচে নামতে পারে? পারিবারিক ঐতিহ্য! অসহায় ডাক্তার দীর্ঘকালীন ওষুধ ধরিয়ে দিলেন। তিনমাস পর পর যাও, রক্ত দাও , আবার ওষুধ নিয়ে আসো তিন মাসের।

প্রায়শঃই বাংলাদেশিদের আহ্লাদে আটখানা হয়ে ভাবি, “কিসের ডায়েট! একদম ঠিক আছি। আজান দিয়ে খাবো।” কিন্তু সকালে অফিসে গিয়েই যখন দেখি আমাদের পঞ্চাশ ঊর্ধ্ব পুরুষ কলিগগুলিও আমার চেয়ে স্লিম, ফিট, শেইপ্ড তখন আবারো চিরতার রস খাওয়া চেহারা করে করে খাবারে টান দেই। এরা এদের মতোই আমাকে সুস্থ, সচল, আজীবন চলাফেরায় পরনির্ভরতামুক্ত দেখতে চায়, এরা বিশ্বে দীর্ঘজীবী,আমাকেও তাই চায়। তথাস্তু!