জেলযাত্রাসহ সবধরনের পরিস্থিতির জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত খালেদা

বিএনপি

স্টাফ রিপোর্টার : বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া বলেছেন, রাজনীতিতে পা রাখার পর থেকে আমি জনগণকে যত সময় দিয়েছি, পরিবার ও পরিজনকে ততটা সময় দিতে পারিনি। কারাগারে থাকতে আমি আমার মাকে হারিয়েছি। অফিসে অবরুদ্ধ থাকা অবস্থায় আমি একটি সন্তান হারিয়েছি। আরেকটি সন্তান নির্যাতনে পঙ্গু হয়ে দূর দেশে চিকিৎসাধীন। আমার এ স্বজনহীন জীবনে দেশবাসী আমার স্বজন। আল্লাহই আমার একমাত্র ভরসা। আমি যেখানেই থাকি যতক্ষণ বেঁচে থাকব দেশ ছেড়ে যাবো না।

বুধবার বিকেল ৫টা ৬ মিনিটের দিকে বক্তব্য শুরু করেন খালেদা জিয়া। বিএনপির অফিসিয়াল ফেসবুক গ্রুপ facebook.com/bnpbd.org এ বক্তব্য লাইভ দেখানো হয়।

তিনি বলেন, প্রতিবারের নির্বাচনে জনগণ আমাকে পাঁচটি আসনে নির্বাচিত করেছে। কোনো নির্বাচন প্রার্থী হয়ে আজ পর্যন্ত পরাজিত হয়নি। জনগণের সমর্থনে আমি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলাম। তারা আমাকে তিনবারের প্রধানমন্ত্রী করেছিল।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত আছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এ ছাড়া আরো আছেন স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান, ড. আবদুল মঈন খান, বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা খন্দকার মাহবুব হোসেন প্রমুখ।

আগামীকাল বৃহস্পতিবার জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার রায় ঘোষণার দিন ধার্য আছে। ওই মামলার প্রধান আসামি খালেদা জিয়া। রায়ের আগের দিন আজ সংবাদ সম্মেলন করেন তিনি।

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার রায়কে কেন্দ্র করে জেলযাত্রাসহ সবধরনের পরিস্থিতির জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত খালেদা জিয়া। দলের নির্বাহী কমিটির সভায় তৃণমূল নেতাদের প্রতি সে ইঙ্গিত আগেই দিয়েছেন তিনি।

সেদিন বলেছেন, ‘আমার বেশি হলে জেল হবে। এই সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে বিএনপির অনেক নেতাকর্মী-ভক্তকেও জেলে যেতে হয়েছে। যেখানে থাকি না কেন আমি আপনাদের সঙ্গে আছি, আপনাদের সঙ্গে থাকব। বহু সন্ত্রাস হবে, ষড়যন্ত্র হবে, নানাভাবে হয়রানি করার চেষ্টা করা হবে; কিন্তু আমরা ভয়ে ভীত নই।

এদিকে মামলার রায়কে কেন্দ্র করে গৃহকর্মী ফাতেমা বেগমকেও কিছুদিনের জন্য পারিবারিক জীবন থেকে দূরে থাকার মানসিক প্রস্তুতি নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। রায়ের পর কারাগারে যেতে হলে গৃহকর্মী ফাতেমাকে সঙ্গে নেয়ার আবেদন জানাবেন খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা।

সূত্র জানায়, আগামী জাতীয় নির্বাচনকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছেন বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব। নির্বাচন থেকে দূরে রাখতে সরকারের কোনো ফাঁদে পা দিতে চায় না বিএনপি। নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকারের দাবিতে দশম জাতীয় নির্বাচন বর্জন ও টানা নয় বছর ধরে আন্দোলন করে আসা বিএনপি যে কোনো পরিস্থিতিতে আগামী নির্বাচনে মাঠে থাকতে চায়।

ফলে রাজপথের নৈরাজ্যময় আন্দোলনের পথে হেঁটে দেশের মানুষ ও আন্তর্জাতিক মহলের সমালোচনার মুখে পড়তে চায় না তারা। সে লক্ষ্যেই সম্প্রতি প্রতিটি পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনার মাধ্যমে। ফলে মামলার রায় মোকাবিলায় দলটি আইনি প্রক্রিয়াকেই প্রাধান্য দিচ্ছে।

পাশাপাশি সরকারের ওপর জনমতের চাপ সৃষ্টি, সরকারের বাইরে থাকা রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বৃহত্তর ঐক্য সৃষ্টি এবং আন্তর্জাতিক মহলের সমর্থন আদায়েও চলছে নানা তৎপরতা। তারই অংশ হিসেবে হযরত শাহজালাল ও শাহপরানের মাজার জিয়ারতের উদ্দেশ্যে সিলেট সফর করেছেন খালেদা জিয়া। সুযোগ থাকা সত্ত্বেও যাত্রাপথে কোনো পথসভায় বক্তব্য বা মতবিনিময়ে অংশ নেননি তিনি। তবে তার এ সফরের মধ্যেও সরকারের ওপর জনমতের চাপ সৃষ্টি এবং নির্বাচনমুখী বার্তা দেখতে পাচ্ছে রাজনৈতিক মহল।

তারা বলছেন, প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা এবং জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের নির্বাচনী প্রচারণায় সিলেট সফরের এক সপ্তাহের মধ্যেই ৩৬০ আউলিয়ার পূণ্যভূমি ঘুরে এসেছেন খালেদা জিয়া। সবসময় প্রকাশ্য ভোট চাওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। তার এ সফরের বার্তা পৌঁছে গেছে সিলেট বিভাগের চার জেলার ঘরে ঘরে।

তার সিলেট সফরকে কেন্দ্র করে পুরো পথে কঠোর নিরাপত্তা নিয়েছে পুলিশ। বিএনপি নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষকে দাঁড়াতে দেয়া হয়নি রাস্তায়। পুরো পথের দুইপাশের সমস্ত দোকানপাট ও যানবাহন বন্ধ রাখা, ব্যাপক ধরপাকড়ের কারণে ঢাকা থেকে সিলেট মহাসড়ক সংলগ্ন প্রতিটি জেলায় প্রচলিত প্রচারণার চেয়ে বেশি প্রচারণা পেয়েছে বিএনপি।

বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, হযরত শাহজালাল ও শাহপরানের মাজার জিয়ারতে সিলেট সফরে গিয়ে নীরবতার ভাষায় নিজের মনের কথা জানিয়ে দিয়েছেন চেয়ারপারসন। সিলেটের জনগণ খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলার প্রতিবাদ জানিয়েছেন। মূল কথা হচ্ছে- বিএনপি চেয়ারপারসন যেখানে যান লাখো জনতা স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাস্তায় নেমে আসেন, যা দেশের অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের নেত্রীর ক্ষেত্রে হয় না।

এদিকে খালেদা জিয়ার রায়কে কেন্দ্র করে আইনি উদ্যোগ, রাজপথে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদসহ নানামুখী প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপি। শনিবার অনুষ্ঠিত দলের নির্বাহী কমিটির সভায় তৃণমূল নেতাদের বক্তব্যের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার সম্ভাব্য রায়।

নেতারা পরিষ্কার বলেছেন, সরকারের প্রভাবে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে অন্যায় কোনো রায় দেয়া হলে রাজপথে প্রতিবাদের কোনো বিকল্প নেই। কেন্দ্রের কাছে আন্দোলনের নির্দেশনা চাওয়ার পাশাপাশি তারা এ ঘোষণাও দিয়ে রেখেছেন, নেতিবাচক রায় হলে প্রতিবাদ কর্মসূচির জন্য তারা কেন্দ্রের দিকে তাকিয়ে থাকবেন না।

এক্ষেত্রে সারা দেশে দলের সাংগঠনিক ইউনিটগুলোর প্রতি পরিস্থিতি বিবেচনায় কর্মসূচি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের সবুজ সংকেত রয়েছে কেন্দ্রের। দলটির দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, বৃহস্পতিবার রাজধানীর রাজপথে শান্তিপূর্ণভাবে অবস্থানের সর্বাত্মক চেষ্টা করবে মহানগর বিএনপি। রায় ঘোষণার আগ পর্যন্ত তারা কৌশলী অবস্থান নেবেন।

তবে তৃণমূল পর্যায়ে প্রতিবাদের মাত্রা থাকবে কিছুটা তীব্র। রায় প্রতিকূলে গেলে উচ্চ আদালতের ধাপগুলো সম্পন্ন হওয়ার আগে রাজধানীতে প্রতিবাদের তীব্রতা বাড়াতে চায় না বিএনপি। সেজন্য নেতাদের প্রতি রয়েছে আপাতত গ্রেপ্তার এড়িয়ে কৌশলে পরিস্থিতি মোকাবিলার নির্দেশনা। সে অনুযায়ীই প্রতিবাদের প্রস্তুতি নিচ্ছেন মহানগর বিএনপির নেতাকর্মীরা।