টঙ্গীতে শিক্ষকের প্রহারে অন্ধত্ব বরণ করতে হচ্ছে ছাত্রকে!

রেজাউল সরকার (আঁধার), গাজীপুর : টঙ্গী পাইলট স্কুল এন্ড গার্লস কলেজ শিক্ষকের প্রহারে আহত ছাত্র মিরাজ হোসেন শাওন চোখের জ্যোতি আর ফিরে পাচ্ছে না। শিক্ষকের বেত্রাঘাতে তার ডান চোখ পুরোপুরি অন্ধ হয়ে গেছে। এ ঘটনায় থানায় মামলা না নেওয়ায় ছাত্র ও অভিভাবকদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে।
আহত ছাত্রের মা বিলকিস সুলতানা বিজ্ঞাপন চ্যানেলকে জানান, মিরাজ হোসেন শাওন টঙ্গী পাইলট স্কুল এন্ড গার্লস কলেজ থেকে গত বছর এসএসসি পাস করার পর উত্তরা হাইস্কুল এন্ড কলেজে ভর্তি হয়। গত বুধবার সকালে শাওন তাদের টঙ্গী কলেজ রোডের বাড়ি থেকে উত্তরায় কলেজে যাচ্ছিল। পথিমধ্যে তার বন্ধুর কাছ থেকে নোটশিট নেওয়ার জন্য পাইলট স্কুল অতিক্রম করে সুলতানা রাজিয়া রোডে যাচ্ছিল। সে পাইলট স্কুলের গেট দিয়ে ভেতরের রাস্তায় প্রবেশ করতেই পেছন দিক থেকে স্কুলের দারোয়ানরা তাকে টেনে ধরে এবং স্কুলের রাস্তা দিয়ে যেতে নিষেধ করে। এসময় শাওন দারোয়ানদের অনুরোধ জানিয়ে বলে, ‘কলেজের সময় হয়েছে ঘুরে গেলে সময় নষ্ট হবে, দয়া করে আমাকে যেতে দিন’। এসময় পাইলট স্কুলের শিক্ষক শাহাবুদ্দিন সজিব গিয়ে শাওনকে কিলঘুষি ও লাথি মারে। পরে তাকে টেনে হেঁচরে ভেতরে অধ্যক্ষের অফিসের সামনে নিয়ে যায়। সেখানে শিক্ষক সজিব অধ্যক্ষের সামনেই তাকে মোটা বেত দিয়ে বেধড়ক পিটিয়ে আহত করে। বেত্রাঘাতে তার ডান চোখ দিয়ে প্রচন্ড রক্তক্ষরণ শুরু হলে তাকে গলা ধাক্কা দিয়ে স্কুল গেট দিয়ে বাহিরে বের করে দেয়া হয়। এসময় পথচারীরা তাকে উদ্ধার করে স্থানীয় সিটি চক্ষু হাসপাতালে নেয়। সেখানে অবস্থার আরো অবনতি ঘটলে তাকে দ্রুত ঢাকায় ইস্পাহানী ইসলামিয়া চক্ষু হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। পর দিন এই সংবাদ উত্তরা হাইস্কুল এন্ড কলেজে পৌছলে শাওনের সহপাঠীরা বৃহস্পতিবার টঙ্গী পাইলট স্কুল এন্ড গার্লস কলেজে এসে শিক্ষক শাহাব উদ্দিন সজীবের বিচারের দাবীতে বিক্ষোভ করে। খবর পেয়ে পুলিশ স্কুলে গিয়ে বিক্ষুব্ধ ছাত্র ও অভিভাবকদের লাঠিচার্জ করে ছত্রভঙ্গ করে দেয়।
এদিকে শাওনের মা বিলকিস সুলতানা বৃহস্পতিবার অভিযুক্ত শিক্ষক সজিবের বিরুদ্ধে থানায় লিখিত অভিযোগ দেন। কিন্তু পুলিশ গত তিন দিনেও অভিযোগ এফআইআরভুক্ত করেনি।
অভিভাবকরা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, টঙ্গী থানা ছাত্রলীগের সাবেক সহ-সভাপতি শাহাব উদ্দিন সজীব শিক্ষক নামধারী ক্যাডার। পাইলট স্কুল কর্তৃপক্ষ যোগ্যতার মাপকাঠি বিবেচনা না করে শুধুমাত্র দলীয় বিবেচনায় গত ৪ বছরে অপ্রয়োজনীয় প্রায় ৬০ জন শিক্ষক কর্মচারী নিয়োগ দিয়েছেন। নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত এসব শিক্ষক শ্রেণীকক্ষে পাঠদানে অযোগ্য। অনেকের শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদপত্র নিয়েও জালজালিয়াতির অভিযোগ রয়েছে। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সাথে এদের আচরণ শিক্ষক সুলভ নয়। এরা রাজনৈতিক দলের ক্যাডার ও সন্ত্রাসীদের মত আচরণ করে থাকে। এদের অধিকাংশই প্রাথমিক শাখায় পাঠদানে অক্ষম। অথচ তাদেরকে মাধ্যমিক শাখায় ক্লাশ দেওয়া হচ্ছে। এঘটনায় এমপিওভুক্ত পেশাদার শিক্ষকদের মধ্যেও ক্ষোভ রয়েছে।
এদিকে যোগাযোগ করা হলে অভিযুক্ত শিক্ষক শাহাবুদ্দিন সজীব বলেন, আমি শাওনকে প্রহার করিনি। ইভটিজিংয়ের অভিযোগে ছাত্রীদের অভিভাবকরা তার ওপর চড়াও হলে আমি তাকে উদ্ধার করে প্রিন্সিপালের কক্ষে নিয়ে যাই।
টঙ্গী মডেল থানার ওসি ফিরোজ তালুকদার জানান, উভয়পক্ষ থানায় পাল্টাপাল্টি অভিযোগ দিয়েছে। আহত ছাত্র শাওনের মা বিলকিস সুলতানা স্কুলের আলোচিত শিক্ষক সজীব ও দারোয়ানদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দিয়েছেন। অপরদিকে স্কুল কর্তৃপক্ষ আহত ছাত্র শাওনের বিরুদ্ধে ছাত্রী উত্যাক্তের অভিযোগ দিয়েছেন। উভয় অভিযোগ নিয়ে তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
শাওনের চিকিৎসক রাজধানীর বসুন্ধরা আই হসপিটাল এন্ড রিসার্জ ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক প্রফেসর ডা. মো. সালেহ আহমেদ জানান, শাওনের ডান চোখের দুই তৃতীয়াংশ নষ্ট হয়ে গেছে। তার ওই চোখের দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাওয়ার আশা খুবই ক্ষীন। ডান চোখের রেটিনায় প্রচন্ড রক্তক্ষরণ ঘটেছে। পূর্ণাঙ্গ অপারেশন শেষে শাওন ডান চোখের জ্যোতি ফিরে পাবে কিনা নিশ্চিত করে বলা যাবে। সেজন্য তাকে আরো অন্তত এক সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হবে।
এব্যাপারে টঙ্গী পাইলট স্কুল এন্ড গার্লস কলেজ অধ্যক্ষ মো. আলাউদ্দিন মিয়া বলেন, বুধবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ছাত্রীদের ছুটি হওয়ার সময় শাওন ছাত্রীদের উত্যাক্ত করার উদ্দেশ্যে স্কুলের গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকে। তখন দারোয়ান বাধা দিলে সে দারোয়ানদের সাথে উচ্চবাচ্য করে এবং একপর্যায়ে মারতে যায়। পরে ছাত্ররা তাকে ধরে নিয়ে বেধম মারধর করে।