তাজউদ্দীন আহমদের সমাজ ও রাষ্ট্র ভাবনা

taj

অধ্যাপক শামসুল হুদা লিটন : 

তাজউদ্দীন আহমদ বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে চির উন্নত ও চির ভাস্কর একটি নাম। তাজউদ্দীন আহমদ একটি আদর্শের স্মারক। অন্যায় দূর্নীতি ও অপরাজনীতির বিরুদ্ধে এক প্রচন্ড দ্রোহ। ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকে বাঁকে তাঁর সফল বুদ্ধিদৃপ্ত পদচারনা জাতিকে করেছে উজ্জীবিত। তিনি যেন প্রেরনার এক উৎস।

বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী বঙ্গতাজ তাজউদ্দীন আহমদ এর বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের অমর কীর্তি মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দেশের স্বাধীনতা অর্জন। তিনি ছিলেন ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার প্রধান প্রকৌশলী, নিপুনকারিগর ও অনন্য রূপকার। বিস্ময়কর প্রতিভা ও ক্যারিশমাটিক নেতৃত্বের অধিকারী তাজউদ্দীন ছিলেন এক অসাধারণ সমাজ ও রাষ্ট্রচিন্তক। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের বরপুত্র এবং আদর্শিক রাজনীতির মূর্ত প্রতিক।

ন্যায়-নীতি, সততা, স্বচ্ছতা সত্য প্রকাশের সাহসিকতা ও আদর্শ ধারণ ও লালন করার মাধ্যমে তিনি হয়ে উঠেছিলেন জনতার হৃদয়ের সম্রাট। তাঁর বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্র ভাবনা ছিল খুবই উন্নত এবং দার্শনিক মানের। দেশের মাটি ও মানুষের সত্যিকারের ভাষা বুঝার অসাধারণ ক্ষমতা ছিল ক্ষণজন্মা এই রাজনীতিবিদের।

রাজনৈতিক জীবনে বিভিন্ন সভা-সমাবেশ, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম ও মিডিয়া সাক্ষাৎকারে সমাজ, রাষ্ট্র, রাজনীতি, নীতি ও আদর্শ নিয়ে অনেক মূল্যবান বক্তব্য প্রদান করেছেন। এসব বক্তব্যের মাধ্যমে তাঁর সমাজ ও রাষ্ট্র ভাবনার ধারণা পাওয়া যায়। তিনি চেয়েছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশ হবে গণতান্ত্রিক ও দুর্ণীতিমুক্ত। এখানে থাকবে সামাজিক ন্যায় বিচার, আইনের শাসন, বাক স্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, বিরোধীদলের রাজনীতি করার স্বাধীনতা। তিনি এমন একটি সমাজ ব্যবস্থার স্বপ্ন দেখেছিলেন যেখানে থাকবে না হিংসা-বিদ্বেষ, খুন-রাহাজানী, শোষন, নির্যাতন ও প্রতিহিংসা। যেই সমাজে থাকবে পরমত সহিষ্ণুতা, সহনশীলতা, ভ্রাতৃত্ববোধ, সাম্য, মৈত্রী স্বাধীনতা, পরস্পর শ্রদ্ধা ও গভীর ভালোবাসা। যেখানে থাকবে সরকারী ও বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক, সম-অধিকার ও মর্যাদা।

তিনি যা বিশ্বাস করতেন এবং ব্যক্তিজীবনে অনুশীলন করতেন তাই তিনি বিভিন্ন বক্তৃতায় প্রকাশ করতেন। তাঁর এসব অমর কথামালার মাঝেই ফুটে উঠে নিজস্ব সমাজ ও রাষ্ট্রভাবগুলো। এ ভাবনায় আছে আলোকিত সমাজ বিনির্মানের রূপরেখা। সংক্ষিপ্ত পরিসরে তাঁর সমাজ ও রাষ্ট্রভাবনাগুলো আলোচনা করা সম্ভবনয়। এ ভাবনার মধ্যে খুজে পাওয়া যায় সমাজ ও রাষ্ট্রচিন্তক তাজ উদ্দীনকে। খুজে পাওয়া যায় আদর্শবাদী এক মহান রাষ্ট্র নায়ক ও বাঙালীর কিংবদন্তীর এক বিপ্লবীকে।

তাজ উদ্দীন আহমদ মনে প্রাণে বিশ্বাস করতেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে সহনশীলতার প্রয়োজন সবচেয়ে বেশী। তিনি মনে করতেন জনগনের পরস্পরের অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা স্বাধীনদেশের নাগরিকদের অন্যতম দায়িত্ব ও কর্তব্য। শুধু বড় বড় কথা বলে এবং অপরের কাঁধে দোষ চাপিয়ে কোন সমস্যার সমাধান করা যায় না।

তাঁর সমাজ ও রাষ্ট্র ভাবনা জুড়ে আছে খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ। তিনি প্রায় বক্তৃতায় বলতেন, “বাংলাদেশের চাষি, শ্রমিক, তাঁতী, মজুর, ছাত্র-যুবকসহ সর্বশ্রেণীর মানুষ যে আশা ও আকাঙ্খা নিয়ে স্বাধীনতা লাভের রক্তক্ষয়ী বিপ্লব শুরু করেছিল, সেই আশা-আকাঙ্খা বাস্তবে রূপায়িত হলেই আমাদের বিপ্লব সকফ হবে, তার আগে নয়।”

তিনি বাংলাদেশে নিরন্ন দুঃখী মানুষের জন্য একটি নতুন পৃথিবী গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন। তাঁর ভাবনার সমাজ ও রাষ্ট্রে থাকবে না শোষন, নির্যাতন ও বঞ্চনা। যেখানে মানুষ মানুষকে শোষণ করবে না। মানুষ মানুষের অধিকার ও বাক স্বাধীনতা কেড়ে নিবে না। সমাজে থাকবে না আশারাফ-আতরাফের পার্থক্য। রাষ্ট্র থাকবে না নিপিড়কের ভুমিকায়। তাজউদ্দীন আহমদের প্রতিজ্ঞা ছিল ক্ষুধা, রোগ বেকারত্ব, অজ্ঞতা এবং দরিদ্রতার অভিশাপ থেকে মুক্তি। মানুষের সামগ্রিক মুক্তিই ছিল তাঁর আজীবন লড়াই-সংগ্রামের মূল ভিত্তি।

গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে ক্ষমতাশীন ও বিরোধীদলের নেতাকর্মীদের মধ্যে সহনশীলতার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য বলে তিনি বিশ্বাস করতেন। এ ব্যাপারে তাজউদ্দীন আহমদের স্পষ্ট বক্তব্য হলো, “গণতন্ত্রের মূল কথাই হচ্ছে সহনশীলতা। এর অভাবে শুধু রাজনৈতিক দলগুলোরই ক্ষতি হবে না, খোদ রাষ্ট্রের স্বার্থ ও বিঘ্নিত হয়। রাজনৈতিক কাদা ছোড়াছুড়ির পথ পরিহার করে সহনশীলতার অনুশীলন শিক্ষার প্রয়োজন। রাষ্ট্র ও জনগণের স্বার্থকে উর্ধ্বে রেখে পারস্পরিক মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে।”

তাজউদ্দীন এর সমাজ ও রাষ্ট্র চিন্তায় শক্তিশালী রাজনৈতিক দল গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি খুবই অর্থবহ। রাষ্ট্রে বিরোধী দল ও মতাদর্শের ব্যাপারে তাঁর বক্তব্য হলো, “গণতান্ত্রিক পরিবেশের পূর্ণ সুযোগ নিয়ে দেশে সুস্থ্য ও দায়িত্বশীল বিরোধী দল গড়ে তোলা প্রয়োজন। দায়িত্বশীল বিরোধী রাজনৈতিক দলই গঠনমূলক সমালোচনা করে সরকারকে রাষ্ট্র পরিচালনয় সাহায্য করতে পারে। এমনকি জনসমর্থন নিয়ে তারা সরকার ও গঠন করতে পারে।”

তিনি বিশ্বাস করতেন, “বল প্রয়োগে কোন সমস্যারই সমাধান করা যায় না। রাজনৈতিক সমস্যাদি রাজনৈতিকভাবেই এবং সামাজিক সমস্যাদি সামাজিকভাবে সহজেই সমাধান করা যায়”।

তাজউদ্দীন আহমদ ছিলেন সংসদীয় গনতন্ত্রের প্রতি খুবই শ্রদ্ধাশীল। সংসদীয় গনতন্ত্রে বিরোধীদলকে তিনি বিকল্প সরকার বলে আখ্যায়িত করেছেন। তাঁর রাজনৈতিক ভাবনা ছিল বিরোধী দলগুলোকে এমন হতে হবে যেন তারা জনগনের পূর্ন আস্থা লাভ করতে পারে। তা না হলে দেশের জনগণ হতাশার শিকার হবে। বিরোধী রাজনৈতিক দলের ব্যাপারে তাঁর সুস্পষ্ট বক্তব্য হচ্ছে- বাংলাদেশের জনগনকে নৈরাজ্যের শিকারে পরিনত করার অধিকার কোন বিরোধী দলের নেই।

তিনি জাতীয় স্বার্থে অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির কথা ভাবতেন। এ ব্যাপারে তিনি বলেছেন, “গণতন্ত্রে প্রত্যেকের মত প্রকাশের স্বাধীনতা আছে এবং এ ক্ষেত্রে মতামতের ভিন্নতা ও একটা স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু এই পার্থক্য আমাদের মধ্যে দলমত নির্বিশেষে একটা অভিন্ন দৃষ্টি ভঙ্গি থাকা উচিৎ।”

তাজউদ্দীন আহমদ জনসমর্থিত সরকারে বিশ্বাসী ছিলেন। যথাসময়ে সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে তিনি গুরুত্বারোপ করেছেন। এ ব্যাপারে তিনি বলেন, “নির্বাচন যথাসময়ে অনুষ্ঠিত হওয়া উচিত। যে কোন পরিস্থিতিতে জনগণের আস্থাভাজন প্রতিনিধিত্বশীল সরকারই সবচাইতে কর্যকরিভাবে জনগণের বিপদের মোকাবিলায় এগিয়ে আসতে পারে।”

তিনি প্রশাসনকে দলীয় করনের ঘোর বিরোধী ছিলেন। সৎ,দক্ষ ও জনবান্ধব প্রশাসন গড়ে তোলা ছিল তাঁর স্বপ্ন। সরকারী কর্মকর্তাদের রাজনীতির ক্ষমতার বাইরে রাখার বাস্তব চিন্তা ছিল তাঁর মাথায়। এ প্রসঙ্গে তাজউদ্দীন আহমদ বলেছেন, “সরকরি কর্মকর্তারা দলীয় কর্মকর্তার পদে বহাল থাকতে পারবে না। একজন মন্ত্রীর পক্ষে দলীয় কর্মকর্তার পদে বহাল থাকা উচিত নয়। কোন ব্যাক্তি যদি একই সাথে সরকার এবং দলে অন্তর্ভূক্ত হন তা হলে দলের রাজনৈতিক ভারসাম্যের ক্ষতি এবং শাসন কাজে অসুবিধার সৃষ্টি হয়।”

তাজউদ্দীন আহমদ কথায় নয়, কাজে বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি প্রায়ই বলতেন, “সুন্দর কল্যাণময় সমাজ গড়ে তোলা বক্তৃতা মঞ্চ থেকে উঠে আসে না। এ জন্য প্রয়োজন কাজ করার। বক্তৃতা কমাতে হবে। এখন ভেবে দেখতে হবে বক্তৃতায় যা বলা হয়েছে তা করা হয়েছে কিনা।”

তিনি দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করে বলেছিলেন, “সবাইকে নিজ নিজ ঘর থেকে দুর্নীতি উচ্ছেদ অভিযান শুরু করতে হবে। অন্যথায় দুর্নীতি উচ্ছেদ হবে না এবং বাংলাদেশ থেকে দুর্নীতি কখনো যাবে না।” তিনি দুর্নীতির ব্যাপারে আরো বলেছেন, “দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে যারা বড় বড় কথা বলেন, দুর্নীতিবাজ ধরা পড়লে ছেড়ে দেয়ার জন্যে তাদের অনেকেই ওকালতি করেন। এমনিভাবে প্রত্যেক দুর্নীতি পরায়নই যদি কারো না কারো ভাই ও খালু হয়, তাহলে সরকার কার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে?”

বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্র নিয়ে তাজউদ্দীন আহমদ যে সব কথা বলেছেন তাঁর ব্যাক্তিগত জীবনে তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছেন। তাঁর চরিত্রে কথা ও কাজে খুবই মিল ছিল। তাজ উদ্দীনের এই সমাজ, রাষ্ট্র চিন্তার বাস্তব প্রতিফলন হলে বাংলাদেশের বর্তমান সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অস্থিরতা ও অস্থিতিশীলতার অন্ধকার দুরিভূত হবে। তাজউদ্দীনের আদর্শে বিশ্বাসীরা এ ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিাকা পালন করতে পারে।

লেখক : শামসুল হুদা লিটন
কবি, সাংবাদিক, কলামিষ্ট
কাপাসিয়ার ইতিহাস ও ঐতিহ্য গবেষক
অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, তারাগঞ্জ কলেজ, কাপাসিয়া, গাজীপুর
মোবাইল: ০১৭১৬৩৩৩১৯১।