পা দিয়ে লিখেই জিপিএ-৫, ভবিষ্যতে শিক্ষক হতে চায় বিউটি

নিয়াজ মোরশেদ, আক্কেলপুর(জয়পুরহাট): ইচ্ছে শক্তি দিয়ে প্রতিবন্ধীকতাকে যে জয় করা যায় জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলার বিউটি আকতার তার জলন্ত উদাহরণ। স্থানীয় আকলাস শিবপুর ম্যামপুর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এবারের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পা দিয়ে লিখে এই সাফল্য পেয়েছে অদম্য মেয়েটি। তার এই সাফল্যে বিদ্যালয়সহ পরিবার ও গ্রামের মানুষ এখন গর্বিত। তার ইচ্ছে এখন উচ্চ শিক্ষা নিয়ে সমাজে অবহেলিতদের পাশে দাাঁড়ানো।

শরীরের সব অংঙ্গ থাকলেই কেবল সাফল্য পাওয়া যায় তা নয়। ইচ্ছে শক্তি থাকলে যেকোন অসাধ্যকেই সাধন করা যায়, শিবপুরের বায়েজিদ প্রামানিক ও রহিমা বেগমের গরীব ঘরের মেধাবী ছাত্রী বিউটি তা প্রমান করেছে। এসএসসিতে জিপিএ-৫ পাওয়ায় গ্রামের মানুষের সুদৃষ্টিও এখন তার দিকে।

কি পারেনা সে? তরকারি কাটা, পেঁয়াজ কাটা, রান্না করা, সেলাই করা, বাসন মাজা, গৃহস্থালীর প্রায় সব কাজই করতে পারে অনায়াসে। জন্ম থেকেই দুটি হাত তার একদম ছোট এবং অকেজো আর তাই পা’কেই বেছে নেয় জীবন তৈরীর মুল হাতিয়ার হিসাবে। প্রতিবন্ধীকতার কাছে হার না মেনে ছোট বেলা থেকেই পা দিয়ে অভ্যেস করে সব কাজ ও লেখা পড়া করার। অদম্য ইচ্ছে থাকায় সাফল্যও এসেছে বারবার।


প্রতিবন্ধী হওয়ায় অবহেলা করেনি পরিবারের কেউ। মেয়ের ইচ্ছে অনুযায়ী সাহায্য করেছে তারা তবে হার মানতে হয়েছে দারিদ্রতার কাছে।
বিউটির মা রহিমা বেগম জানান, ছোট বেলা থেকেই মেয়েটি শান্তশিষ্ট এবং মেধাবী। পড়ালেখা এবং কাজের প্রতি তার অসম্ভব ইচ্ছে। যেকোন কাজ একবার দেখলেই শিখে নিতে পারে। অভাবের কারনে মেয়েকে প্রাইভেট টিচার দিতে পারেনি তারা তবে শিক্ষকদের আন্তরিকতা ছিল বিউটির প্রতি আর সৃষ্টিকর্তার অশেষ রহমতে তার মেয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। সকলের দোয়া এবং সহযোগিতা পেলে বিউটি একদিন জয়পুরহাটের নাম কুড়াবে বলে আশা করেন তিনি।

বিউটির বাবা বায়েজিদ প্রামানিক বলেন, মেয়ের ইচ্ছেকেই প্রাধান্য দেন তিনি। অভাব থাকলেও বিউটিকে বুঝতে দেননি সে। মেয়ের লেখাপড়ার জন্য প্রয়োজনে মানুষের দ্বারে দ্বারে যাবেন তিনি।

একদিকে অভাব অন্যদিকে শারিরিক সমস্য নিয়ে বেড়ে ওঠা বিউটি কখনো কাউকে বুঝতে দিতে চায়না তার কোন সমস্যা আছে। অভাবী সংসারে কখনো বাবা মাকে কষ্ট দেয়নি সে। কখনো কোন কিছুর জন্য বায়না ধরতনা বাবা-মা’র কাছে তবে মনে সংকল্প একটায় প্রতিবন্ধীতাকে জয় করতে হবে সামনে এগুতে হবে। আর তাই মন দিয়ে পড়ালেখা করে আর বাড়ির যেকোন কাজ করে দিয়ে পরিবারের বোঝা থেকে নিজেকে মুক্ত রাখে সে। অদম্য মেয়েটি একান্ত সাক্ষাতকারে জানায় এইচএসসিতে ভাল কলেজে পড়তে চায় সে কিন্তু দারিদ্রতা বাধা হতে পারে এই আশংকা তার। তবে শতবাধা পেরিয়ে ভবিষ্যতে পড়ালেখা শেষ করে একজন আদর্শ শিক্ষক হতে চায় আর তার মত প্রতিবন্ধী এবং গরীব মেধাবী শিক্ষার্থীদের পাশে দাাঁড়াতে চায় সে।

২০১১ সালে পিএসসিতে এ+ পাওয়ার পর মিডিয়ায় তাকে নিয়ে বেশ লেখালেখি হয়। তৎকালীন জেলা প্রশাসক অশোক কুমার বিশ^াস তাকে এই সাফল্যে নিজের মেয়ে হিসাবে গ্রহন করেন এবং কিছু আর্থিক সাহায্য করেন। তার এই সাফল্যে পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়ার জন্য রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক তাকে নগদ একলক্ষ টাকা দেয়।

পিএসসির পর জেএসসিতেও ভাল ফলাফল করে বিউটি। স্কুলে নিয়মিত উপস্থিতি এবং মনযোগী হওয়ায় শিক্ষকদের সহনুভুতি ছিল তার প্রতি।
শ্যামপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আকাম উদ্দীন আখন্দ বলেন,, ৬ষ্ট শ্রেণি থেকেই বিউটি কাশে বেশ মনযোগী। সে নিজেই বিজ্ঞানের সব ছবি আঁকাতে পারত এবং পড়া করে দিতে পারত। যদিও শিক্ষকদের বিশেষ দৃষ্টি ছিল তার দিকে। তাকে প্রাইভেট পড়তে হতনা।

ক্ষেতলাল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কামরুজ্জামান বিজ্ঞাপন চ্যানেলকে বলেন, বিউটির এ ফলাফল ক্ষেতলাল উপজেলা তথা জয়পুরহাট বাসীর মুখ উজ্জল করেছে সেইসাথে অন্য শিক্ষার্থীদের কাছে একটা উদাহরণ হিসাবে তুলে ধরেছে। তার উচ্চ শিক্ষা অর্জনের ক্ষেত্রে ক্ষেতলাল উপজেলা প্রশাসন সব সময় পাশে থাকবে বলে আশ্বাস দেন তিনি।

দারিদ্রতার কারনে উচ্চ শিক্ষা বাধাপ্রাপ্ত হতে পারে তাই বিত্তবানদের সাহায্য কামনা করলেন স্কুলের প্রধান শিক্ষকসহ গ্রামের মানুষ।
চার সদস্যের পরিবারে পিছু ছাড়েনি অভাব অনটন তবে অদম্য বিউটিকে দমাতে পারেনি তার পড়ালেখা থেকে সড়ে দাড়াতে আর তাই পিএসসি, জেএসসি পর এসএসসিতেও ভাল ফলাফল। তবে আত্মপ্রত্যয়ী মেয়েটির না বলা ভাষাতে একটা বিষয় পরিস্কার বুঝাগেছে তার আগামী পথ চলাতে অর্থনৈতিক সমস্যা না থাকলে সমাজের বোঝা না হয়ে পড়ালেখায় ভাল ফলাফল করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চায় সে।