প্রশ্ন ফাঁসের দায় কি শুধুই শিক্ষকদের?

আলী আকবর

আলী আকবর: সাম্প্রতিক কালে শিক্ষার বিভিন্ন স্তরে প্রশ্ন ফাঁস শিক্ষা ক্ষেত্রে এক নতুন মহামারীর নাম। প্রাথমিকের পিইসি থেকে জেএসসি, এসএসসি থেকে এইচএসসি, অনার্স, মাস্টার্স মেডিকেল, পিএসসি সহ এমন কোন শিক্ষার স্তর নেই যেখানে প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়নি। মজার কথা হলো- পরীক্ষা চলাকালীন যখন প্রশ্ন ফাঁস হয় তখন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ স্বীকার করতে চান না প্রশ্ন পত্র ফাঁস হয়েছে। মাননীয় শিক্ষা মন্ত্রী মহোদয়ও বারবার প্রশ্ন ফাঁসের বিষয়টি উড়িয়ে দেবার চেষ্টা করেছেন।

কিন্তু তথ্য প্রযুক্তির এ যুগে কোন কিছুই বেশি দিন গোপন করে রাখা যায় না। উল্লেখিত পরীক্ষা সমূহের প্রশ্ন ফাঁসের সচিত্র প্রতিবেদন দেশের শীর্ষ স্থানীয় সকল পত্রিকায় ফলাও করে ছাপা হলো। অনাগত ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য চিন্তিত হয়ে পড়লেন অভিভাবক সহ দেশের সুধীজন। তারা প্রশ্ন ফাঁসের বিরুদ্ধে গভীর প্রতিক্রিয়া জানালেন। অবশেষে শিক্ষা মন্ত্রী মহোদয় প্রশ্ন ফাঁসের কথা পরোক্ষভাবে স্বীকার করেও এর দায় এড়িয়ে অন্যের কাঁধে চাপানোর চেষ্টা করলেন।

লক্ষ্য করলে দেখা যাবে- বিগত বছর গুলোতে প্রশ্নপত্র ফাঁস সম্পর্কে শিক্ষা মন্ত্রী মহোদয় বারবার শিক্ষকদেরই শুধু আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন। বিভিন্ন সভা সেমিনারে প্রশ্ন ফাঁসের প্রসঙ্গ এনে তিনি শিক্ষকদের একতরফা করে দায়ী করেছেন। সাম্প্রাতিক সময়ে তিনি বলেছেন, “এই শিক্ষকরাই আমাকে ডুবিয়েছে। প্রশ্নপত্র ফাঁসে শিক্ষকরাই জড়িত”। মন্ত্রী মহোদয়ের একপেশে এ অভিযোগের তীর দেশের সমগ্র শিক্ষক সমাজাকে ক্ষুব্ধ, হতাশাগ্রস্থ ও অপমানিত করেছে। মাননীয় মন্ত্রী মহোদয় মহান ব্রত সম্বলিত শিক্ষক শব্দের সাথে একটি ‘ই’ প্রত্যয় যোগ করে বুঝাতে চেয়েছেন যে, প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো এমন জঘন্য অপকর্মে শিক্ষক ছাড়া এদশে দ্বিতীয় কোন পক্ষ নেই। অর্থাৎ একমাত্র শিক্ষকরাই এ ঘৃণিত কাজের মূল হোতা। শিক্ষক সমাজের অভিভাবক হিসেবে একজন শিক্ষা মন্ত্রীর কাছ থেকে এদেশের শিক্ষক সমাজ এমন মনগড়া একতরফা অভিযোগ প্রত্যাশা করিনি।

প্রশ্ন পত্র ফাঁসে কারা জড়িত তা খুঁজে বের করার জন্য সরকারের গোয়েন্দা সংস্থা সহ অনেক বিভাগ রয়েছে। নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্যিকারের অপরাধীকে শনাক্ত করে বিচারের আওতায় এনে দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তি প্রদান সকলের কাম্য। এর পূর্বে অনুমান নির্ভর কোন বিশেষ গোষ্ঠীকে অপরাধী বানানোর চেষ্টা করলে সত্যিকারের অপরাধীরা ধরা ছোঁয়ার বাহিরে থেকে যাবে। তখন আড়ালকৃত অপরাধীরা আরোও বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনায় তাদের ঘৃণিত অপকর্ম চালিয়ে যাবে। কারণ তারা অবগত আছে যে, অপরাধ করেও তারা দোষী হবে না- দোষী হবে নিরপরাধ কোন ব্যক্তি কিংবা গোষ্ঠী।

দুর্নীতি কমিশনের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নাসির উদ্দিন আহমদ গত ১৭ ডিসেম্বর ২০১৭ তারিখে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ব্যাপারে এক অনুসন্ধানীমূলক প্রতিবেদনে বলেন, “প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে সরকারী কর্মকর্তা সহ শিক্ষাবোর্ড, বিজিপ্রেস, ট্রেজারী, পরীক্ষা কেন্দ্র সহ আরো কিছু অসাধু চক্র জড়িত”। অথচ একই দিনে একই সম্মেলন কক্ষে মাননীয় শিক্ষা মন্ত্রী শুনালেন ভিন্ন কথা। তিনি আবারও জোর গলায় বললেন, “প্রশ্ন ফাঁসের সাথে শিক্ষকরাই জড়িত”। তাই স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে- আমরা কার কথা বিশ্বাস করব- যারা মাঠ পর্যায়ে অনুসন্ধান করে সত্যিকারের চিত্র বের করলেন সেই দুদকের রিপোর্ট- না কিনা শিক্ষকদের উদ্দেশ্য করে শিক্ষামন্ত্রীর একপেশে অভিযোগ!

মাননীয় মন্ত্রী মহোদয় এবছর জোর দিয়ে বলেছিলেন, “এবার প্রশ্ন ফাঁসের সব পথই সীলগালা করা হয়েছে। আর প্রশ্ন ফাঁসের কোন সুযোগ নেই”। প্রশ্ন ফাঁস রোধে এত পদক্ষেপ নেয়ার পরও কেন তা কার্যকর হচ্ছে না তা খতিয়ে দেখার প্রয়োজন ছিল। তা না করে জাতীয় এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে শুধুই কাদা ছুড়াছুড়ি করা হচ্ছে। একে বায়োবীয় আকারে রাজনৈতিক রূপ দেয়ার চেষ্টা চলছে। এমনও বলা হচ্ছে যে, সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে প্রশ্নপত্র ফাঁস করছে শুধু শিক্ষকরাই।

কয়েকদিন আগে ড. মুহাম্মদ জাফর ইকবাল বলেছেন, “সরকার চাইলেই প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকানো যায়। সরকার বা শিক্ষা মন্ত্রণালয় চাইলে প্রশ্নপত্র ফাঁস হতো না”। জনপ্রিয় লেখক প্রশ্নপত্র ফাঁসের জন্য কোন দিকে ইঙ্গিত করেছেন তা সহজেই অনুমেয়। প্রশ্ন ফাঁসের জন্য শুধুই এক পক্ষকে দায়ী না করে সরকারকেও এর দায় নিতে হবে। দায় নিয়ে সংকট উত্তোরনের পথ খুঁজে বের করতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে প্রশ্ন ফাঁসের কালো থাবার গহ্বরে আমরা আমাদের শিক্ষার্থীদের ঠেলে দিতে পারি না।

লেখকঃ
আলী আকবর, শিক্ষক/কলামিষ্ট ও সাধারণ সম্পাদক বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি, গাজীপুর জেলা শাখা।