ফিরে দেখা : বঙ্গতাজ তাজউদ্দীন আহমদ

মাহমুদুল হাসান, গাজীপুর: ঢাকা থেকে সড়কপথে ৮২ কিলোমিটার দূরবর্তী কাপাসিয়ার রায়েদ ইউনিয়নে দরদরিয়া গ্রাম। পিচ ঢালা আঁকা বাঁকা মেঠো পথ, চারপাশে ঘন সবুজের সমারোহ, চেনা-অচেনা পাখির মন-মাতানো কিচির মিচিরশব্দ, নৈসর্গিক সৌন্দর্য ও নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলীর এক মায়াবী রূপ। কিশোরঞ্জ সড়কের মিয়ার বাজার এলাকা থেকে উত্তর দিকে প্রায় ৮ কিলোমিটারের পুরোটা পথের চিত্র এমন। সড়কের প্রতিটি ধূলোকণা যেন জীবন চিনিয়েছে, মানুষ চিনিয়েছে, প্রকৃতি আর সবুজকে করেছে আপন। যেখানে একসময় দিনের বেলায় বাঘ ভাল্লুক ঘুরে বেড়াতো। এ স্থানেই ১৯২৫ সালের ২৩ জুলাই কৃষিনির্ভর বিদ্যোৎসাহী মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম হয় তাজউদ্দীন নামক এক বালকের। যিনি বাল্যকাল থেকেই ছিলেন গরীব অসহায়দের পরম বন্ধু। সহপাঠিদের নিয়ে মাছ ধরতেন, ফুটবল খেলতেন, এমনকি নিজে গাছ থেকে পেয়ারা, কামরাঙা পেড়ে বন্ধুদের খাওয়াতেন। কে জানতো এমন প্রত্যন্ত অঞ্চলে জন্ম হওয়া এ বালকই হবেন বাংলাদেশ নামক স্বাধীন ভুখন্ডের প্রথম প্রধানমন্ত্রী।

বঙ্গতাজ তাজউদ্দীন আহমদ-এর কথা বলছিলাম। এমনই তাঁর জন্মভূমির চিত্র। যেখানে জীবনদশার খানিকটা সময় কাটিয়েছেন তিনি। দোতলা মাটির ঘর, প্রাথমিক বিদ্যালয়, মসজিদ, পুকুর, লিচু বাগান সবখানেই আজও বঙ্গতাজের পদচিহ্ন, স্মৃতি ও স্পর্শ লেগে আছে। মৌলভি মুহাম্মদ ইয়াসিন খান ও মেহেরুন্নেসা খানম দম্পতির চার ছেলে ও ছয় মেয়ের মধ্যে তাজউদ্দীন আহমদ ছিলেন চতুর্থ। প্রায় ৩০০ বছর আগে তাজউদ্দীন আহমদের দাদা ইব্রাহিম খান ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলার নিগরী ইউনিয়নের ধলিয়া গ্রাম থেকে দরদরিয়া এসে জমি কিনে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।

রক্ষণশীল মুসলিম পরিবারের সন্তান তাজউদ্দীন আহমদের শিক্ষাজীবন শুরু হয় বাবার কাছে আরবি শিক্ষার মাধ্যমে। একই সময় তিনি ভর্তি হন বাড়ি থেকে দুই কিলোমিটার দূরবর্তী ভুলেশ্বর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। প্রথম থেকে দ্বিতীয় শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হন মেধাতালিকায় প্রথম হয়ে। এ জন্য স্কুল থেকে জীবনে প্রথম দেড় পয়সার কালির দোয়াত এবং সাড়ে আট পয়সার একটি কলম পান পুরস্কার হিসেবে। চতুর্থ শ্রেণিতে উঠে তিনি ভর্তি হন দরদরিয়া থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরের কাপাসিয়া মাইনর ইংরেজি স্কুলে। এই স্কুলে থাকার সময় তিনি প্রবীণ বিপ্লবী তিনজন নেতার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তাঁরা ওই স্কুলের শিক্ষকদের তাজউদ্দীন আহমদকে আরও ভালো স্কুলে পাঠানোর সুপারিশ করেন। সেই সুবাদে তাঁকে পাশ্ববর্তী কালীগঞ্জের সেন্ট নিকোলাস ইনস্টিটিউশনে (১৯১০ খ্রীষ্টাব্দের পূর্বে প্রতিষ্ঠিত) ভর্তি করা হয়। এখানেও তার মেধা সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করায় স্কুলের প্রধান শিক্ষকের পরামর্শে তিনি ভর্তি হন ঢাকার মুসলিম বয়েজ হাইস্কুলে। তারপর সেন্ট গ্রেগরীজ হাইস্কুলে।

স্কুলে তাজউদ্দীন আহমদ বরাবরই প্রথম স্থান অর্জন করেছেন। ষষ্ঠ শ্রেণির এমই স্কলারশিপ পরীক্ষায় তিনি ঢাকা জেলায় প্রথম স্থান অধিকার করেন। ১৯৪৪ সালে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (তৎকালীন জগন্নাথ কলেজ) থেকে ম্যাট্রিকুলেশন (কলকাতা বোর্ড) পরীক্ষায় তিনি প্রথম বিভাগে দ্বাদশ স্থান অর্জন করেন। ১৯৪৮ সালে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় একই প্রতিষ্ঠান থেকে তিনি প্রথম বিভাগে চতুর্থ স্থান লাভ করেন। তাজউদ্দীন আহমদ পবিত্র কোরআনের হাফেজ ছিলেন, যা তিনি নিয়মিত লেখাপড়ার পাশাপাশি বাবার সান্নিধ্যে আয়ত্ত করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে ১৯৪২ সালে তিনি সিভিল ডিফেন্স ট্রেনিং নেন। তখন স্কুলের ছাত্র থাকা অবস্থায় পুরান ঢাকার বাহাদুর শাহ পার্ক এলাকায় কয়েক মাস নিয়মিত রাতে নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করেন। এ কাজে প্রতি রাতের জন্য তিনি সম্মানী পেতেনে ৮ আনা। তিনি আজীবন স্কাউট আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

তাজউদ্দীন আহমদ স্কুলজীবন থেকে রাজনীতি তথা প্রগতিশীল আন্দোলন ও সমাজসেবার সঙ্গে অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। এ কারণেই তার শিক্ষাজীবনে মাঝে মধ্যেই ছেদ পড়েছে। নিয়মিত ছাত্র হিসেবে পরীক্ষা দেওয়া তাঁর ভাগ্যে বেশ জোটেনি; তবুও রাজনীতি ও শিক্ষা তাঁর হাতে হাত ধরে চলেছে। ১৯৫০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে বিএ (সম্মান) ডিগ্রী লাভ করেন। ১৯৫৪ সালে প্রাদেশিক নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে অংশ নেওয়ার কারণে তার এমএ পরীক্ষা দেওয়া সম্ভব হয়নি। মাত্র ২৯ বছর বয়সে এমএলএ নির্বাচিত হয়েও তিনি আইন বিভাগের ছাত্র হিসেবে নিয়মিত ক্লাস করেছেন এবং পরবর্তী সময়ে ১৯৬৪ সালে রাজনৈতিক বন্দী হিসেবে কারাগারে থাকা অবস্থায় এলএলবি ডিগ্রীর জন্য পরীক্ষা দিয়ে তিনি আইন শাস্ত্রেও স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। পেশায় তিনি আইনজীবী ছিলেন। ১৯৫৯ সালের ২৬ এপ্রিল তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে অধ্যাপক সৈয়দ সিরাজুল হকের কনিষ্ঠ কন্যা সৈয়দা জোহরা খাতুনের বিয়ে হয়। বৈবাহিক সূত্রে স্ত্রীর নামের সঙ্গে যুক্ত হয় তাজউদ্দীন।

তাদের তিন মেয়ে ও এক ছেলে। বড় মেয়ে শারমিন আহমদ রিতি (লেখক, শিক্ষাবিদ ও সমাজকর্মী), মেজো মেয়ে সিমিন হোসেন রিমি (গাজীপুর-৪ আসনের বর্তমান সাংসদ, শিক্ষানুরাগী, লেখক, গবেষক ও সমাজকর্মী)  এবং কনিষ্ঠা মেয়ে মাহজাবিন আহমদ মিমি (শিক্ষানুরাগী)। পরিবারের সর্বকনিষ্ঠ সন্তান তানজিম আহমেদ সোহেল তাজ (সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী)। তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে আসীন অবস্থায় পদত্যাগ করলে ২০১২ সালের ৭ জুলাই গাজীপুর-৪ আসন শূন্য ঘোষণা করা হয়। বর্তমানে তিনি রাজনীতি থেকে অনেকটা সরে গিয়ে প্রবাসে দিন কাটাচ্ছেন।

স্কুলে পড়ার সময় থেকেই তাজউদ্দীন ছিলেন চিন্তাশীল, সমাজ-রাজনীতি, সচেতন এবং সমাজকল্যাণমূলক কাজে সক্রিয়। তিনি নিয়মিত ডায়েরি লিখতেন। বাংলা ১৩৫০ সনের দুর্ভিক্ষে গ্রামের গরিব লোকদের খাদ্যাভাব দেখে বন্ধুদের নিয়ে ‘ধর্মগোলা’ নামে খাদ্যভান্ডার গঠন করেছিলেন তিনি। ফসল ওঠার সময় ধনী কৃষকদের কাছ থেকে ধান-চাল সংগ্রহ করে ভান্ডারে জমা করা হতো এবং আশ্বিন-কার্তিক মাসে দুর্ভিক্ষের সময় অনাহার-অর্ধাহারক্লিষ্ট লোকদের মধ্যে তা বিতরণ করা হতো।

আর্তের সেবায় তাঁর কোনো ক্লান্তি ছিল না। ১৯৫৪ সালে তিনি যখন এমএলএ, তখন তাঁর গ্রামের সাইফুদ্দীন দফাদারের ছেলে আবদুল আজিজ (১৫) বন্দুকের গুলিতে আহত হয়। তখন তাকে ঢাকায় তাজউদ্দীনের কাছে আনা হয়। তিনি অ্যাম্বুলেন্সে করে ওই বালককে হাসপাতালে নেন। তার জন্য তিনি নিজে ১০ আউন্স রক্ত দেন। পরে ওই বালকের মৃত্যুর সংবাদ শুনে তাজউদ্দীন আহমদ উদভ্রান্তের মতো হাসপাতালে যান এবং ময়নাতদন্তের ব্যবস্থা করেন। এই মৃত্যু তাঁকে গভীরভাবে মর্মাহত করেছিল।

তাজউদ্দীন আহমদ নিজ প্রচেষ্টা ও উদ্যোগে বিভিন্ন এলাকায় স্কুল প্রতিষ্ঠা ও সংস্কার করেন। সেখানে তিনি একাডেমিক শিক্ষা এবং এর বিভিন্ন বিষয় নিয়ে শিক্ষক ও ছাত্রদের সঙ্গে আলোচনা করতেন।

ছাত্রজীবন থেকেই বাংলার মানুষের মুক্তির রাজনীতির সঙ্গে তাজউদ্দীন আহমদের সম্পৃক্ততা ঘটে। ১৯৪৩ সাল থেকে তিনি বঙ্গীয় মুসলিম লীগের প্রগতিশীল অংশের সক্রিয় সদস্য ছিলেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আগে থেকেই পূর্ববঙ্গের মানুষের মুক্তির পথানুসন্ধান শুরু করেন। ১৯৪৪ সালে তিনি বঙ্গীয় মুসলিম লীগের কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। কাউন্সিলর হিসেবে তিনি ১৯৪৫ ও ১৯৪৭ সালে দিল্লী কনভেনশনে যোগ দেন। স্বাধীনতা আন্দোলনে দলীয় কর্মসূচি প্রচারের উদ্দেশ্যে তিনি সে সময় অবিভক্ত ভারতের বিভিন্ন অংশে প্রচারাভিযান চালান।

১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পর থেকে ভাষার অধিকার, অর্থনৈতিক মুক্তি ও সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী যত আন্দোলন হয়েছে, তাজউদ্দীন প্রতিটিতেই নিজ চিন্তা ও কর্মের সাক্ষর রাখেন। ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ (বর্তমানে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ) গঠিত হয়। তিনি ছিলেন এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা।

তাজউদ্দীন আহমদ সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন। ১৯৪৮ সালে ভাষার জন্য যে বিক্ষোভ ও প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে ওঠে, তিনি ছিলেন তার সক্রিয় অংশী।

১৯৪৯ সালের ২৩ জুন আওয়ামী লীগ গঠিত হয়। তাজউদ্দীন ছিলেন এর মূল উদ্যোক্তাদের অন্যতম। ১৯৫৪-৫৭ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে তরুণ তাজউদ্দীন সেই সময়ের পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক ফকির আবদুল মান্নানকে ১৩ হাজার ৬৭ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করে এমএলএ (সংসদ সদস্য) নির্বাচিত হন।

১৯৫৫ সালে তিনি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংস্কৃতিক ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৫৮ সালে তাজউদ্দীন আহমদ রাষ্ট্রিয় অতিথি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য সফর করেন। ১৯৬২ সালে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলনে তিনি সক্রিয় অংশ নেন এবং কারাবরণ করেন। ১৯৬৪ সালে তিনি আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন। এর পরের বছরগুলো তাজউদ্দীন আহমদ এবং আওয়ামী লীগের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৬৬ সালে তিনি লাহোরে অনুষ্ঠিত বিরোধীদলীয় সম্মেলনে যোগ দেন। এই সম্মেলনেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালির মুক্তি সনদ ছয় দফা ঘোষণা করেন। ছয় দফার অন্যতম রূপকার ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ। আপন সাংগঠনিক দক্ষতা ও একনিষ্ঠতার গুণে তিনি হয়ে ওঠেন বন্ধবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহযোগী। ওই বছরই তিনি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পদক নির্বাচিত হন। ছয় দফার প্রচারাভিযানের সময় ১৯৬৬ সালের ৮ মে তিনি গ্রেপ্তার হন এবং গণঅভ্যুত্থানের ফলে ১৯৬৯ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি মুক্তিলাভ করেন। এরপর ১৯৭০ সালে পাকিস্তানে জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদ এবং পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। তাজউদ্দীন আহমদ ওই নির্বাচনে জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন।

নির্বাচনের পর গণরায় অস্বীকার করে বাঙালিদের অধিকার অর্জনের দাবি নস্যাতে নতুন করে ষড়যন্ত্র শুরু হয়। ১৯৭১ সালের ১ মার্চ পাকিস্তানের সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আকস্মিকভাবে স্থগিত ঘোষণা করেন। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে শুরু হওয়া অভূতপূর্ব অসহযোগ আন্দোলনে সাংগঠনিক দিকগুলো পরিচালনা ও জনগণের কর্তৃত্বের পরিপ্রকাশক নির্দেশাবলি প্রণয়নে তাজউদ্দীন আহমদ অতুলনীয় সাংগঠনিক দক্ষতা প্রদর্শন করেন। আন্দোলন চলাকালেই পাকিস্তানের সামরিক শাসকদের সঙ্গে ঢাকায় আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক আলোচনা শুরু হয়। ওই বছরের ১৬ মার্চ থেকে শুরু হওয়া আলোচনায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আস্থাভাজন সহযোগী হিসেবে তাজউদ্দীন আহমদ অতুলনীয় বুদ্ধিমত্তা ও দক্ষতার পরিচয় দেন।

২৪ মার্চ তৎকালীন পাকিস্তানের শাসনতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক সংকট নিরসনে চ‚ড়ান্ত বৈঠক হওয়ার কথা থাকলেও তা আর অনুষ্ঠিত হয়নি। বরং ২৫ মার্চ সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খান এবং তাঁর আলোচক ও সহযোগীরা গোপনে ঢাকা ত্যাগ করেন। ওই দিন মধ্যরাত থেকেই ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে শান্তিপ্রিয় জনগণের ওপর পরিচালিত হয় গণহত্যার পূর্বনিধারিত কর্মসূচি। এমন বিশ্বাসঘাতকতার নজির পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। ইয়াহিয়ার নির্দেশে পাকিস্তান সেনাবাহিনী বাংলাদেশে শুরু করে গণহত্যাযজ্ঞ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়।

বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে নেতৃত্বের মূল দায়িত্ব অর্পিত হয় তাজউদ্দীন আহমদের ওপর। ১০ এপ্রিল গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার গঠিত হলে তিনি সর্বসম্মতভাবে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। ১৭ এপ্রিল মুজিবনগরে বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি এবং ওই সরকারের মন্ত্রিপরিষদের সদস্যরা স্থানীয় জনগণ এবং শত শত দেশি-বিদেশি প্রচারমাধ্যমের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ গ্রহণ করেন। শুরু হয় বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ। বাংলাদেশের ইতিহাসের ঐতিহাসিক এই সন্ধিক্ষণে তাজউদ্দীন আহমদের ভ‚মিকা ছিল অবিস্মরণীয়। চরম প্রতিকূলতার ভেতর দিয়ে অতি অল্প সময়ের মধ্যে তিনি মুক্তিযুদ্ধের সামরিক, রাজনৈতিক, কূটনৈতিক বিষয়াদিসহ সব দিক সংগঠিত করে তোলেন। তাঁর সফল নেতৃত্বে বাংলাদেশ মাত্র নয় মাসেই মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জন করে। মুক্তিযুদ্ধকালে তাঁর ত্যাগ, নিষ্ঠা, দক্ষতা ও স্বদেশপ্রেম সবাইকে বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত করে। মুক্তিযুদ্ধে সফল নেতৃত্বদানকে তাজউদ্দীন আহমদের জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় হিসেবে নির্দ্বিধায় অভিহিত করা চলে।

১৯৭২ সালে দেশের জন্য, সাধারণ মানুষের জন্য তাজউদ্দীন আহমদের যে বিশাল অবদান এবং ভালোবাসা তারই ফলস্বরূপ তাঁকে ২১ ফেব্রুয়ারি স্বতঃস্ফুর্তভাবে কাপাসিয়ার মাটিতে ‘বঙ্গতাজ’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের পর তাজউদ্দীন আহমদ বঙ্গবন্ধুর প্রত্যাবর্তন পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। এরপর তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে যে মন্ত্রিসভা গঠিত হয়, সেই মন্ত্রিসভায় অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। মন্ত্রী হিসেবে আত্মনির্ভর বিকাশমান অর্থনীতি গড়ে তোলার জন্য তিনি বিশেষভাবে সচেষ্ট ছিলেন। ১৯৭৪ সালের ২৬ অক্টোবর তিনি মন্ত্রিত্বের পদ থেকে সরে দাঁড়ান। এদেশের রাজনীতিতে মেধা, দক্ষতা, যোগ্যতা, সততা ও আদর্শের এক অনন্য প্রতীক তিনি।

পৃথিবীতে কিছু আলোকিত মানুষের জন্ম হয় যাদের জ্ঞান, মেধা, মনন, আদর্শ দেশ ও জাতির সেবায় সার্বক্ষণিক নিয়োজিত থাকে। এমনই আলোকিত মানুষ ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ। মনে প্রাণে দেশপ্রেমিক এবং সম্পূর্ণ নির্লোভ এক চরিত্রের মানুষ ছিলেন তিনি। মানুষের জন্য একেবারেই নিঃস্বার্থ সেবা ও কল্যাণ ছিল তাঁর রাজনীতির লক্ষ্য। দেশপ্রেম ও দেশের মানুষের প্রতি ভালবাসা যেন তাঁর প্রাণশক্তি।

একমাত্র সহপাঠির স্মৃতিচারণ : অছিম উদ্দীন (৯০) তাজউদ্দীন আহমদের জন্মভূমির একমাত্র জীবিত বন্ধু ও সহপাঠি। তিনি ২৫ বছর ধরে প্যারালাইসিস রোগে আক্রান্ত। তাঁর বাম হাত ও বাম পা অবশ। বয়সের বাড়ে নাজুক এই মানুষটি তাজউদ্দীন আহমদের প্রায় দুই বছরের ছোট। তবুও সম্পর্ক ছিল বন্ধুর। সবসময় তিনি পাশে থাকতেন।

তিনি শৈশবের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, তাজউদ্দীন আহমদের মত ভালো মনের মানুষ হয় না। তিনি (বঙ্গতাজ) এতো বড় মাপের মানুষ হবেন, তা তাঁর চরিত্রে অনেকটা ফুটে উঠেছিল। কেননা তিনি রাস্তা দিয়ে চলার পথে পানিতে একটি পোকা ভেসে থাকলেও সেটা তীরে উঠিতে রাখতেন। তিনি মানবতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। নিস্পাপ চেহারার তাজউদ্দীন সামর্থবানদের কাছ থেকে ধান-চাল চেয়ে এনে বা কিনে গরীব অসহায়দের দিতেন। এলাকার কোন মানুষ অসুস্থ হলে তিনি নিজে সেবা করে সুস্থ করে তুলতেন।

তিনি বলেন, দিনের সকল কর্মের কথা ডায়েরিতে নোট করতেন তাজউদ্দীন আহমদ। ফুটবল খেলতে বেশি পছন্দ করতো। ছোটবেলা থেকেই প্রতিবেশিদের খোঁজ রাখতেন। এলাকায় স্কুল না থাকাতে গাছ তলাতে, তরগাঁও ইউনিয়নের দেওনা এক বাড়িতে, হাফিজ বেপারীর বাড়িতে কয়েকদিন ও তারপর কাপাসিয়ায় কিছুদিন পড়াশোনা করেন। তাজউদ্দীন আহমদের কাছে সবসময়ই সহপাঠিরা ফুটবল খেলায় হার মানতেন। গ্রামের মাঠে ফুটবল খেলতেন। কেউ বল নিতে পারতেন না তাঁর কাছ থেকে। নিজে গাছে উঠে পেয়ারা ও কামরাঙা সংগ্রহ করে বন্ধুদের খাওয়াতেন। তার সবচেয়ে পছন্দের ফল ছিল পেয়ারা। সহপাঠিদের নিয়ে বিলে মাছ ধরতে যেতেন। তিনি মাছ ধরায় খুব অভিজ্ঞ ছিলেন। গাঙ (ছোট নদী) থেকে হাত দিয়ে ডুবিয়ে মাছ ধরতেন। আমরা ব্যাগ নিয়ে তা সংগ্রহ করতাম। কাঁঠালের বিচি কাঁচা খেতেন, যদিও মা খেতে মানা করতেন। উত্তরে তিনি বলতেন, পেট ভাল থাকলে সব হজম হয়। তিনি চ্যাপা শুঁটকি দিয়ে কচুর লতা খেতে খুব পছন্দ করতেন। সহপাঠিদের সঙ্গে কখনো ঝগড়া করতেন না। এলাকার ছোট বড় সকলে তাঁর কথা মানতো। এলাকাতে রাস্তা না থাকায় হেঁটে শ্রীপুর পর্যন্ত যেতেন। পথিমধ্যে শীতলক্ষ্যা নদী নৌকা দিয়ে পার হতেন। শ্রীপুর থেকে ট্রেনে ঢাকায় যেতেন।

তিনি বলেন, একসময় আমাদের এলাকায় প্রচুর বাঘ ভাল্লুক ছিল। তাজউদ্দীন শিকারিদের সঙ্গে বাঘ শিকারে যেতেন। বয়স অনেক হওয়াতে অছিম উদ্দীন ছেলে বেলার সব কথা মনে করতে পারছেন না বলেও জানান।

রাজনৈতিক স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে তিনি বলেন, আমি তাজউদ্দীনের সঙ্গে মিটিং মিছিলে যেতাম। সবসময় আমাকে সঙ্গে রাখতেন। এলাকায় কোন স্কুল বা মাদ্রাসা না থাকায় আমি পড়ালেখা করতে পারিনি। তাজউদ্দীন পড়ালেখার জন্য ছোটকালেই শহরে চলে যায়। তিনি বলেন, যে কোন রাজনৈতিক সমাবেশে তাজউদ্দীন আমাকে নিয়ে যেতেন। সমাবেশে তিনি মাইকে সকলের সঙ্গে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিতেন। প্রত্যেক মিটিংয়ে যেতাম। কাপাসিয়ায় আমার নের্তৃত্বে মিছিল হতো।

তিনি বলেন, আমি এখন অসুস্থ। আমার তিন ছেলে। এরমধ্যে একজন কিছু পড়াশোনা করেছে। দুইজন কৃষি কাজ করে। আমি নিজেও কৃষি কাজ ও তাজউদ্দীন আহমদের ভাই মফিজ উদ্দীনের সঙ্গে ব্যবসা করে আগে জীবিকানির্বাহ করতাম। স্বাধীনতার পর তাজউদ্দীন বলেছিলেন, আমি যদি বেঁচে থাকি তাহলে তোর পরিবার নিয়ে ভালোভাবে জীবনযাপনের ব্যবস্থা করে দিব। তারপর তাকে মেরে ফেলা হলো। তাঁর ছেলে মেয়েদের কাছে আমি কখনও কিছু চাইনি। সোহেল তাজ সবসময় আমার সব কথা শুনে। তারা সবাই (তাজউদ্দীনের ছেলে-মেয়ে) আমার বর্তমান অবস্থা জানে। তারা আমাকে কখনো সাহায্য করেনি, আমিও তাদের কাছে কিছু চাইনি। তবে সকলে আমার খোঁজ খবর রাখেন।

বন্ধুর সন্তানদের কাছে আপনার কোন চাওয়া আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাকে একটু সাহায্য সহযোগীতা করলে জীবনের শেষ সময়টা একটু ভালো থাকতে পারতাম। তবে আমি তাদের কাছে মুখ ফুটে কখনো কিছু চাইনি, তারা যদি স্বেচ্ছায় কিছু দেয় তাহলে নিব। আমি কখনো কিছু চাইবো না।

তিনি বলেন, তাজউদ্দীনের মৃত্যুর সংবাদ আমি ঢাকায় থাকা অবস্থায় পাই। তখন বুঝতে পারছিলাম না কি করবো। মাথায় আসমান ভেঙে পড়েছিল। আমি প্রিয় বন্ধুকে হারিয়েছি। এখনও প্রতিনিয়ত ছেলে বেলার কথা খুব মনে পড়ে। আমাদের দুর্ভাগ্যে ষড়যন্ত্রকারীদের কারণে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানকে হারিয়েছি।

যেমন আছে তাজউদ্দীন আহমদের জন্মস্থান : মো. রফিকুল ইসলাম খোকা (৫৬) প্রায় ৩৭ বছর ধরে তাজউদ্দীন আহমদের বাড়ির দেখভাল করছেন। পরিবারের সঙ্গে বাড়িতে রাতে না থেকে এখানেই জীবনের এতোগুলো রাত কাটিয়েছেন। মাসে সম্মানী হিসেবে পান ১০ হাজার টাকা। তিনি জানান, পৈত্রিকসূত্রে তাজউদ্দীন স্যারের সম্পদ রয়েছে প্রায় ২৫০ বিঘার মত। প্রায় ৩০ বিঘা জমিতে স্কুল, মাঠ ও বাড়ির ভিটা রয়েছে।

তিনি জানান, গত বছর অগ্রহায়ণ মাসে ৩০০ মণ ধান হয়েছে। বৃষ্টি ও পোকার কারণে ওই বছর ধান কম হয়েছে বলেও জানান তিনি। এছাড়া বাড়িতে প্রায় ৫০ প্রজাতির ফুল-ফল ও কাঠ গাছ রয়েছে। এর মধ্যে নারিকেল গাছ ১০০টির মত, সুপারি গাছ ৩০টির মত, মেহগনি গাছ রয়েছে ৫০০ মত। পুকুরে ৫-৬ প্রজাতির মাছ রয়েছে। সব সম্পতির দেখভাল তিনিই করছেন।

তিনি বলেন, স্যার নিজে মাটির দোতলা বাড়িটি নির্মাণ করেছেন। পরে ওনার স্ত্রী বেঁচে থাকতে এরশাদ সরকারের আমলে কিছু সংস্কার করেছিলেন। তিনি বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী অথচ ওনার বাড়ি সরকার কোন সংস্কার করছেনা। মানুষজন এসে বিষয়টি দেখে অবাক হন। ওনার ব্যবহৃত একটি চেয়ার ও আলমারি রয়েছে এগুলো সংরক্ষণ করা দরকার।

তিনি আরো বলেন, প্রতিদিন বিভিন্ন স্থান থেকে অনেক লোকজন আসে। তাদের বসতে দিতে পারিনা। অনেকে সারাদিন থাকে। আশেপাশে কোন খাবার হোটেল না থাকায় তারা বাড়ির পাশেই নিজেরা রান্না করে খায়।

খোকা বলেন, স্যারের (তাজউদ্দীন আহমদ) সন্তানেরা আমার স্ত্রী বেদেনার রান্না খেতে খুব পছন্দ করেন। তারা অনেক দিন পর পর বাড়িতে আসেন। আমার স্ত্রীর রান্না ছাড়া তারা খাবারে তৃপ্তি পান না।

তাজউদ্দীন আহমদের বাড়ি সম্পর্কে জানতে চাইলে স্থানীয় কয়েকজন জানান, স্বাধীনতা সংগ্রামে যার অবদান ব্যতীত বাংলার স্বাধীনতা সম্ভব ছিল না। অথচ পরিত্যক্ত অবস্থায় পরে আছে তাঁর বাড়িটি, দেখার মতো কেউ নেই। নেই সংরক্ষণের কোন ব্যবস্থা। এমপি সাহেব বাড়িতে আসলে অথবা যদি কোন মিটিং থাকে তবে বাড়িটা ঝাড়ু দিয়ে পরিষ্কার করে রাখা হয়। আশপাশে একটা খাবারের হোটেল নেই, মনোরম পরিবেশ থাকলেও নেই কোন নিরাপত্তার ব্যবস্থা। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক বঙ্গতাজের জন্মস্থান তাঁর ছোটবেলার স্মৃতি নিদর্শন সরূপ সংরক্ষণ করার কথা ছিল সরকারের। বঙ্গতাজের ছেলে সোহেল তাজ বলেছিলেন কাপাসিয়াকে আবাসিক এলাকায় বাস্তবায়িত করবেন। তিনি কাপাসিয়ায়াবাসীকে তাঁর বোন বর্তমান এমপি সিমিন হোসেন রিমি আপার কাছে রেখে গেছেন। তারা বলেন, বঙ্গতাজের জন্মভূমিতে উন্নয়নের তেমন কোন ছোঁয়া লাগেনি। থাকলেও নিদর্শন নেই। আদৌ হবে কিনা তাও নিশ্চিত নয়। এলাকাবাসী প্রশ্ন রেখে বলেন, বর্তমানে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকা সত্তেও বঙ্গতাজ নামটা কেন এতো অবহেলিত।

প্রথম প্রধানমন্ত্রীর বাড়ি দেখতে আসা কয়েকজন জানান, তাজউদ্দীন আহমদের মত নেতা আমাদের দেশে জন্মগ্রহণ করেছিলেন সেটা আমাদের পরম সৌভাগ্যের। এই নেতা আজ দেশের কাছে, এমনকি তাঁর দলের কাছেও প্রাপ্য মূল্যায়নটুকু পাননি। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় একজন ছাত্র প্রথম শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করে তাজউদ্দীন সস্পর্কে শুধু এটাই জানে যে, তিনি মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, এর বাইরে কিছুই জানে না। এটা হতাশার, দুঃখের, কষ্টের ও লজ্জার। ইতিহাস জানতে হলে, ইতিহাসের চেতনাকে বুঝতে হলে, ইতিহাস স্রষ্টাদেরকেও জানতে হবে, বুঝতে হবে।

তাজউদ্দীন আহমদ বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেন ৪৬ বছর বয়সে আর ঘাতকদের বুলেটে মৃত্যু হয় ৫০ বছর বয়সে। তাঁর তো আরো অনেককিছু দেবার ছিল বাঙালি জাতিকে? এ প্রশ্নের জবাব খুঁজতে হবে যুগ যুগ ধরে বর্তমান ও ভবিয্যত প্রজন্মকে। বাংলাদেশ যতদিন থাকবে ততদিন বাংলার ঘরে ঘরে তাজউদ্দীন আহমদের পবিত্র স্মৃতির অনির্বাণ শিখা জ্বলবে। সত্য, ন্যায় ও সুন্দরের প্রতীক সৎ রাজনীতিবিদ তাজউদ্দীন আহমদের রেখে যাওয়া কর্ম, দর্শন ও দিকনির্দেশনা সমাজ ও দেশের রাজনীতিতে সকল প্রকার কলুষতা, অন্যায়, অসত্য ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে বাঙালি জাতীয়তাবাদের চেতনার নবজাগরণ ঘটাতে সহায়তা করবে বলে মনে করেন বিশিষ্টজনেরা।

জেল হত্যার সার সংক্ষেপ : মানব সভ্যতার ইতিহাসে কলঙ্কময়, রক্তঝরা ও বেদনাবিধূর একটি দিন ৩রা নভেম্বর। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর ৩রা নভেম্বর মধ্যরাতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের নির্জন প্রকোষ্ঠে চার জাতীয় নেতা বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, মন্ত্রিসভার সদস্য ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী এবং এএইচএম কামরুজ্জামানকে নির্মম ও নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। ইতিহাসের এই নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞের ঘটনায় শুধু বাংলাদেশের মানুষই নয়, স্তম্ভিত হয়েছিল সমগ্র বিশ্ব। কারাগারের নিরাপদ আশ্রয়ে থাকা অবস্থায় বর্বরোচিত এ ধরনের হত্যাকান্ড পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতার হত্যাকান্ড ছিল একই ষড়যন্ত্রের ধারাবাহিকতা। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর খন্দকার মোশতাক আহমেদের নেতৃত্বে ষড়যন্ত্রকারীরা জাতীয় চার নেতাকে তাদের সরকারে যোগদানের প্রস্তাব দেয়। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর এই চার নেতা সেই প্রস্তাব ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেন। এ কারণে নির্মমভাবে জীবন দিতে হয় তাঁদের।

জেল হত্যার পরদিন তত্কালীন উপ-কারা মহাপরিদর্শক (ডিআইজি প্রিজন) কাজী আবদুল আউয়াল লালবাগ থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। তবে দীর্ঘ ২১ বছর এ বিচার প্রক্রিয়াকে ধামাচাপা দিয়ে রাখা হয়। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে মামলাটি পুনরুজ্জীবিত করার প্রক্রিয়া শুরু করে। মামলায় ১৯৯৮ সালের ১৫ অক্টোবর ২৩ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ। ২০০৪ সালের ২০ অক্টোবর ঢাকা মহানগর দায়রা জজ মো. মতিউর রহমান মামলায় রায় দেন। রায়ে রিসালদার মোসলেম উদ্দিন (পলাতক), দফাদার মারফত আলী শাহ (পলাতক) ও এল ডি (দফাদার) আবুল হাসেম মৃধাকে (পলাতক) মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়। এছাড়া বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত চার সেনা কর্মকর্তা সৈয়দ ফারুক রহমান, সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান, বজলুল হুদা ও একেএম মহিউদ্দিন আহমেদসহ ১২ জনকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেয়া হয়। সাবেক মন্ত্রী কে এম ওবায়দুর রহমান, শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, নুরুল ইসলাম মঞ্জুর ও তাহেরউদ্দিন ঠাকুরকে খালাস দেয়া হয়। ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল হলে হাইকোর্ট ২০০৮ সালে দেয়া রায়ে মোসলেমের মৃত্যুদন্ড বহাল রাখেন। তবে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত মারফত আলী ও হাসেম মৃধাকে খালাস দেয়। এছাড়াও যাবজ্জীবন কারাদন্ডপ্রাপ্ত ফারুক, শাহরিয়ার রশিদ, বজলুল হুদা ও একেএম মহিউদ্দিন আহমেদকেও খালাস দেয় হাইকোর্ট। হাইকোর্টের এ রায়ের বিরুদ্ধে ২০০৯ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর আপিলের আবেদন (লিভ টু আপিল) করে সরকার। ২০১১ সালের ১১ জানুয়ারি আপিল বিভাগ সরকার পক্ষের আপিল আবেদন মঞ্জুর করে আদেশ দেন। আদেশে নিম্ন আদালতে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত তবে হাইকোর্টের রায়ে খালাস পাওয়া দফাদার মারফত আলী শাহ এবং এল ডি (দফাদার) আবুল হাসেম মৃধাকে অবিলম্বে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেয়া হয়। আত্মসমর্পণ না করলে তাদের গ্রেপ্তার করতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশ দেয়া হয়। ২০১৩ সালের ৩০ এপ্রিল ওই আপিলের ওপর রায় দেয় সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। রায়ে জেলখানায় জাতীয় চার নেতা হত্যা মামলায় বহিষ্কৃত দুই সেনা সদস্য দফাদার আবুল হাসেম মৃধা ও দফাদার মারফত আলী শাহকে নিম্ন আদালতের দেয়া মৃত্যুদন্ড বহাল রাখে আপিল বিভাগ। একইসঙ্গে তাদের খালাস দেয়া সংক্রান্ত হাইকোর্টের রায় বাতিল ঘোষণা করে। আবুল হাসেম ও মারফত আলী এরা দুজন সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার দায়ে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি।

যিনি ছিলেন এ দেশের স্বাধীনতাসংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের পুরোধা ব্যক্তিত্ব, যিনি আজীবন জনগণের কল্যাণ নিয়ে ভেবেছেন, যিনি বাঙালি জাতির জন্য সুখী স্বাধীন জীবন গড়ার সংগ্রামে পরমভাবে নিবেদিত ছিলেন, সেই প্রচারবিমুখ ত্যাগী ও কৃতী দেশপ্রেমিক মানুষটিকে রক্তের বন্যায় ভাসিয়ে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করল স্বাধীনতাবিরোধী ঘাতকের দল। মৃত্যু তাজউদ্দীন আহমদকে মহিমান্বিত করেছে। নতুন রূপে উদ্ভাসিত হন তিনি। তাঁর রেখে যাওয়া কর্ম-ভাবনা আলোকদ্যুতি ছড়ায় এ দেশের আকাশে-বাতাসে। বাঙালি জাতি তথা বাঙালির মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসে চির অক্ষয় হয়ে লেখা রয়েছে তাঁর অবদান।