বঙ্গতাজের বাড়ি কি পর্যটন স্পটের মর্যাদা পাবে না?

বঙ্গতাজের বাড়ি

মোঃ রুহুল আমীন বি.এস-সি: বাংলাদেশের গর্ব মহান স্বাধীনতা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সমর নায়ক বঙ্গতাজ তাজউদ্দীন আহমদের গ্রামের বাড়ি গাজীপুর জেলার কাপাসিয়া উপজেলার ঐতিহাসিক দারদরিয়া গ্রামে শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে। অফুরন্ত সবুজের সমাহার গজারী ও নানা জাতের ফলফুলে আচ্ছাদিত গাছ গাছালীর চাদরে আবৃত স্মৃতি বিজরিত এই বাড়িটি কালের হাজারো ঘটনার স্বাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দুর দুরান্ত থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার উৎসুক জনতা ঘুরে বেড়াতে আসে সকলের শ্রদ্ধাভাজন এই প্রিয় নেতার বাড়িতে।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কাল রাত্রে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে পাকিস্তানী হানাদাররা আটক করে নিয়ে যায়। তখন দৃঢ়ভাবে সুকৌশলে পরিচালিত করেন মহান মুক্তিযুদ্ধকে। আর তাঁরই নেতৃত্বে বীর বাঙ্গালী ছিনিয়ে আনে স্বাধীনতার রক্তিম সূর্য্যকে। অভ্যূদয় ঘটে স্বাধীন বাংলদেশের ।

কালের শত চড়াই উৎরাইয়ের মধ্যেও থেমে থাকেনি এই ঐতিহাসিক বাড়ির গতিশীল নেতৃত্বের অধিকারী সাহসী নেতাদের ভুমিকা। এ বাড়িতেই নববধু ও জননেত্রী হয়ে আসেন সর্বজন শ্রদ্ধেয় জোহরা তাজউদ্দিন। এ বাড়িতেই জন্ম হয়েছে সাবেক গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী আফছার উদ্দিন , সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বঙ্গতাজ পুত্র সাহসী জননেতা তানজিম আহমেদ সোহেল তাজ, কাপাসিয়া (গাজীপুর-৪) আসনের এমপি বঙ্গতাজ কন্যা সিমিন হোসেন রিমি।

মো. রফিকুল ইসলাম খোকা (৫৬) প্রায় ৩৭ বছর ধরে তাজউদ্দীন আহমদের বাড়ির দেখভাল করছেন। পরিবারের সঙ্গে বাড়িতে রাতে না থেকে এখানেই জীবনের এতোগুলো রাত কাটিয়েছেন। মাসে সম্মানী হিসেবে পান ১০ হাজার টাকা। তিনি জানান, পৈত্রিকসূত্রে তাজউদ্দীন স্যারের সম্পদ রয়েছে প্রায় ২৫০ বিঘার মত। প্রায় ৩০ বিঘা জমিতে স্কুল, মাঠ ও বাড়ির ভিটা রয়েছে।

তাজউদ্দিন আহমদের ব্যবহৃত চেয়ার
তাজউদ্দিন আহমদের ব্যবহৃত চেয়ার

তিনি জানান, গত বছর অগ্রহায়ণ মাসে ৩০০ মণ ধান হয়েছে। বৃষ্টি ও পোকার কারণে ওই বছর ধান কম হয়েছে বলেও জানান তিনি। এছাড়া বাড়িতে প্রায় ৫০ প্রজাতির ফুল-ফল ও কাঠ গাছ রয়েছে। এর মধ্যে নারিকেল গাছ ১০০টির মত, সুপারি গাছ ৩০টির মত, মেহগনি গাছ রয়েছে ৫০০ মত। পুকুরে ৫-৬ প্রজাতির মাছ রয়েছে। সব সম্পতির দেখভাল তিনিই করছেন।

তিনি বলেন, স্যার নিজে মাটির দোতলা বাড়িটি নির্মাণ করেছেন। পরে ওনার স্ত্রী বেঁচে থাকতে এরশাদ সরকারের আমলে কিছু সংস্কার করেছিলেন। তিনি বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী অথচ ওনার বাড়ি সরকার কোন সংস্কার করছেনা। মানুষজন এসে বিষয়টি দেখে অবাক হন। ওনার ব্যবহৃত একটি চেয়ার ও আলমারি রয়েছে এগুলো সংরক্ষণ করা দরকার।

তিনি আরো বলেন, প্রতিদিন বিভিন্ন স্থান থেকে অনেক লোকজন আসে। তাদের বসতে দিতে পারিনা। অনেকে সারাদিন থাকে। আশেপাশে কোন খাবার হোটেল না থাকায় তারা বাড়ির পাশেই নিজেরা রান্না করে খায়।

খোকা বলেন, স্যারের (তাজউদ্দীন আহমদ) সন্তানেরা আমার স্ত্রী বেদেনার রান্না খেতে খুব পছন্দ করেন। তারা অনেক দিন পর পর বাড়িতে আসেন। আমার স্ত্রীর রান্না ছাড়া তারা খাবারে তৃপ্তি পান না।

তাজউদ্দীন আহমদের বাড়ি সম্পর্কে জানতে চাইলে স্থানীয় কয়েকজন জানান, স্বাধীনতা সংগ্রামে যার অবদান ব্যতীত বাংলার স্বাধীনতা সম্ভব ছিল না। অথচ পরিত্যক্ত অবস্থায় পরে আছে তাঁর বাড়িটি, দেখার মতো কেউ নেই। নেই সংরক্ষণের কোন ব্যবস্থা। এমপি সাহেব বাড়িতে আসলে অথবা যদি কোন মিটিং থাকে তবে বাড়িটা ঝাড়– দিয়ে পরিষ্কার করে রাখা হয়। আশপাশে একটা খাবারের হোটেল নেই, মনোরম পরিবেশ থাকলেও নেই কোন নিরাপত্তার ব্যবস্থা। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক বঙ্গতাজের জন্মস্থান তার ছোটবেলার স্মৃতি নিদর্শন সরূপ সংরক্ষণ করার কথা ছিল সরকারের। বঙ্গতাজের ছেলে সোহেল তাজ বলেছিলেন কাপাসিয়াকে আবাসিক এলাকায় বাস্তবায়িত করবেন। তিনি কাপাসিয়ায়াবাসীকে তাঁর বোন বর্তমান এমপি সিমিন হোসেন রিমি আপার কাছে রেখে গেছেন। তারা বলেন, বঙ্গতাজের জন্মভূমিতে উন্নয়নের তেমন কোন ছোঁয়া লাগেনি। থাকলেও নিদর্শন নেই। আদৌ হবে কিনা তাও নিশ্চিত নয়। এলাকাবাসী প্রশ্ন রেখে বলেন, বর্তমানে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকা সত্ত্বেও বঙ্গতাজ নামটা কেন এতো অবহেলিত।

প্রথম প্রধানমন্ত্রীর বাড়ি দেখতে আসা কয়েকজন জানান, তাজউদ্দীন আহমদের মত নেতা আমাদের দেশে জন্মগ্রহণ করেছিলেন সেটা আমাদের পরম সৌভাগ্যের। এই নেতা আজ দেশের কাছে, এমনকি তাঁর দলের কাছেও প্রাপ্য মূল্যায়নটুকু পাননি। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় একজন ছাত্র প্রথম শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করে তাজউদ্দীন সস্পর্কে শুধু এটাই জানে যে, তিনি মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, এর বাইরে কিছুই জানে না। এটা হতাশার, দুঃখের, কষ্টের ও লজ্জার। ইতিহাস জানতে হলে, ইতিহাসের চেতনাকে বুঝতে হলে, ইতিহাস স্রষ্টাদেরকেও জানতে হবে, বুঝতে হবে।

তাজউদ্দীন আহমদ বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেন ৪৬ বছর বয়সে আর ঘাতকদের বুলেটে মৃত্যু হয় ৫০ বছর বয়সে। তার তো আরো অনেককিছু দেবার ছিল বাঙালি জাতিকে? এ প্রশ্নের জবাব খুঁজতে হবে যুগ যুগ ধরে বর্তমান ও ভবিয্যত প্রজন্মকে। বাংলাদেশ যতদিন থাকবে ততদিন বাংলার ঘরে ঘরে তাজউদ্দীন আহমদের পবিত্র স্মৃতির অনির্বাণ শিখা জ্বলবে। সত্য, ন্যায় ও সুন্দরের প্রতীক সৎ রাজনীতিবিদ তাজউদ্দীন আহমদের রেখে যাওয়া কর্ম, দর্শন ও দিকনির্দেশনা সমাজ ও দেশের রাজনীতিতে সকল প্রকার কলুষতা, অন্যায়, অসত্য ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে বাঙালি জাতীয়তাবাদের চেতনার নবজাগরণ ঘটাতে সহায়তা করবে বলে মনে করেন বিশিষ্টজনেরা।

বঙ্গতাজের এই বাড়িটাকে সরকারীভাবে পর্যটন স্পটের মর্যাদা দেয়ার দাবী সর্ব শ্রেণি মানুষের।

তথ্য সহায়তায় : সাংবাদিক মাহমুদুল হাসান, গাজীপুর।