বদলগাছীতে ফসলি জমির মাটি বিক্রির মহোৎসব চলছে

মাটি বিক্রি

নিয়াজ মোরশেদ, জয়পুরহাট:
নওগাঁর বদলগাছী উপজেলার কসবা গ্রামে ফসলি জমির মাটি কেটে বিক্রির চলছে মহোৎসব । জমির মালিকেরা তাঁদের জমি ব্যবসায়ীদের কাছে ইজারা দিয়েছেন। এসব ব্যবসায়ীরা ফসলি জমির মাটি কেটে ইটভাটার মালিকদের কাছে বিক্রি করছেন। জমি থেকে গভীর করে মাটি তোলায় আশপাশের ফসলি জমিগুলোতে ধস দেখা দিয়েছে। এভাবে মাটি কাটা অব্যহত থাকলে কসবা গ্রামের ফসলি মাঠটি খাল-বিলে পরিণিত হওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

তাঁদের অভিযোগ, দুই-তিন বছর ধরে কসবা গ্রামের ফসলি মাঠের জমির মাটি কাটার মহোৎসব চলছে। এখন মাঠের অনেক জমির শ্রেণি পরির্বতন হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের কাছে অভিযোগ করেও কোন প্রতিকার পাচ্ছেন না। এভাবে মাটি কাটা অব্যহত থাকলে অচিরেই ফসলি মাঠটি খাল-বিলে পরিণিত হবে।

গত বৃহস্পতিবার সরেজমিনে কসবা গ্রামে ফসলি মাঠে গিয়ে দেখা যায়, ফসলি মাঠটিতে মাটি কাটার মহোৎসব চলছে। গ্রামের ফসলি মাঠটির ৮-১০ টি স্থানে বিশাল অংশজুড়ে দুই/তিন ফসলি জমির মাটি গভীর করে মাটি কাটার কাজ চলছে। প্রতিটি স্থানেই এক সঙ্গে ৫-৭ টি ট্র্যাক্টর এসে মাটি নিয়ে যাচ্ছে। অবাধে ট্র্যাক্টর চলাচল করায় সাগরপুর থেকে কসবা গ্রাম পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার সড়ক নষ্ট হয়ে গেছে।

মাটিসাগরপুর গ্রাম থেকে একশ গজ দূরে কসবা ফসলি মাঠে নেমে দেখা গেল, সেখানে ৪-৫ বিঘা জমিজুড়ে গভীর করে মাটি কেটে ট্র্যাক্টরে তোলা হচ্ছে। গণমাধ্যম কর্মীদের দেখে সেখানে থাকা একব্যক্তি তাঁর হাতে থাকা একটি টালি খাতা ফেলে দৌঁড়ে ঝোপ দিয়ে-জঙ্গলের দিকে চলে যান। খাতাটি ঘেঁটে দেখা গেল, সেখানে ফসলি জমির মাটি বিক্রির হিসেব লিপিবদ্ধ আছে। প্রতি ট্র্যাক্টর মাটি একশ বিশ টাকা করে বিক্রি দেওয়ার কথা লেখা রয়েছে। সেখানে গত দুই বছরে ৩ হাজার ৩ শত ২২ ট্র্যাক্টর মাটি বিক্রির হিসেব উল্লেখ করা হয়েছে। ওই জমির গভীরে মাটি তোলায় সেটি এখন খালে পরিণিত হয়েছে। চলতি ইটভাটার মৌসুমে সেখান থেকে ফের মাটি কাটায় আশপাশের উচুঁ জমিগুলো ধসের হুমকিতে রয়েছে। সেখানে থাকা একটি ট্র্যাক্টর চালক বলেন, আমার বাড়ি আক্কেলপুর পৌরশহরের শান্তা মহল্লায়। জমির মালিক তাঁর জমিটি একজনকে ইজারা দিয়েছেন। ইজারাদারেরা প্রতি ট্র্যাক্টর মাটি একশ বিশ টাকা দাম নিচ্ছে। ইটভাটার মালিকেরা প্রতি ট্র্যাক্টর মাটি সাড়ে পাঁচশ টাকায় কিনছেন। প্রতিদিন গড়ে একটি ট্র্যাক্টর ১০-১৫ টি ট্রিপ দিচ্ছে।

ওই স্থানটির প্রায় দুই গজ দূরত্বে একইভাবে মাটি কাটার কাজ হচ্ছিল। সেখানে ৪-৫ টি ট্র্যাক্টর এসে মাটি নিয়ে যাচ্ছে। কসবাগ্রামের পচার মোড়ে গিয়ে দেখা গেল, সেখানে একটি বৈদ্যুতিক খুঁটির পাশ থেকে গভীর করে মাটি কেটে নেওয়া হয়েছে। বৈদ্যুতিক খুঁটির পাশের মাটি আলগা করায় সেটি ঝুঁকির মুখে রয়েছে। সেখান থেকে পঞ্চাশ গজ দূরত্বে ফসলি জমি থেকে মাটি কেটে ট্র্যাক্টরযোগে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। মাটি কেটে নেওয়ার কারণে সেই স্থানটি খালে পরিণিত হয়েছে। উঁচুতে থাকা বসত বাড়িগুলো মাটি ধসের হুমকিতে রয়েছে।

কসবা ও সাগরপুর গ্রামবাসীরা জানান, বিগত দুই বছর আগে থেকে কসবা ফসলি মাঠটি থেকে মাটি বিক্রির শুরু হয়। শান্তি গোপাল, মোতাহার, এরাবদুল, সুখরীসহ ১০-১২ জন জমির মালিক তাঁদের জমি বালু ও মাটি ব্যবসায়ীদের কাছে ইজারা দিয়েছেন। এসব ব্যবসায়ীরা দুই/তিন ফসলি জমির মাটি কেটে ইটভাটার মালিকদের কাছে বিক্রি করছেন। আর প্রতিদিন গড়ে ৭-৮ শ ট্র্যাক্টর মাটি কেটে নেওয়া হচ্ছে। গভীর করে মাটি কেটে নেওয়ার কারণে উচুঁ ফসলি জমি ধসে পড়ছে। এখন পুরো মাঠজুড়ে ৬-৭ টি স্থানে মাটি কাটার কাজ চলছে। অবাধে ট্র্যাক্টর চলাচল করায় গ্রামের সড়কটি নষ্ট হয়েছে। ফসলি জমির মাটি কেটে বিক্রি বন্ধ করতে তাঁরা স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের জানিয়েছিলেন। কিন্তু একাধিক জনপ্রতিনিধিদের ইটভাটা ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থাকায় তাঁরা কোন ব্যবস্থা নেননি। ইটভাটার মালিকদের স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সখ্যতা রয়েছে। ফলে ফসলি জমির মাটি কাটা বন্ধ হচ্ছে না। সরকারের উচ্চ পর্যায়ে কর্মকর্তাদের বিষয়টি নজর দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

সাগরপুর গ্রামের বাসিন্দা আব্দুস সালাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ফসলি জমি কেটে মাটি বিক্রি বন্ধের জন্য ইউএনও অফিস, ইউনিয়ন পরিষদ সবখানেমাটি গেছি। কিন্তু কেউ মাটি কাটা বন্ধ করার উদ্যোগ নেয়নি। আমরা গরীব মানুষ আমাদের জমিজমা ধসে গেল কারও কিছুই আসে-যায় না।
কসবাগ্রামের বাসিন্দা নুর ইসলাম বলেন, গত বছর র‌্যাব সদস্যরা এসে কসবা পচার মোড়ে ট্র্যাক্টরসহ মাটি উত্তোলনকারীকে ধরেছিল। কয়েক দিন পর তাঁরা ছাড়া পেয়েছিল। এবারও তাঁরাই একই স্থানে মাটি কাটার শুরু করেছে।

একই গ্রামের হরিপদ বলেন, ফসলি জমির মাটি কেটে বিক্রি দেওয়ায় মাঠের অন্য জমিগুলো ধসের সৃষ্টি হয়েছে। অবাধে ট্র্যাক্টর চলাচল করায় গ্রামের সড়কটি নষ্ট হয় গেছে। সড়কটি দিয়ে পায়ে হেঁটে চলাচল করা যাচ্ছে না। ইউএনও, স্থানীয় ইউপির চেয়ারম্যানকে তাঁরা ঘটনাটি জানিয়েছেন।
শিমুল নামে এক বালু ও মাটি ব্যবসায়ী বলেন, জমিতে ফসল হয় না। তাই জমির মালিকেরা মাটি বিক্রি করছেন। এতে ফসলের চেয়ে বেশি লাভবান হচ্ছেন বলে জানিয়েছেন তিনি।

বদলগাছী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা হাসান আলী বলেন, ফসলি মাঠে জমির মাটি কেটে বিক্রি দেওয়ায় অন্য জমিগুলো ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। জমির শ্রেণিও পরির্বতনও হচ্ছে।

বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের বদলগাছী কার্যালয়ের উপ-সহকারী প্রকৌশলী হারুনুর আর রশিদ বলেন, বরেন্দ্র উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ সাগরপুর গ্রাম থেকে কসবা গ্রাম পর্যন্ত আটশ মিটার সড়ক পাকাকরণের কাজ চলছে। সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার কার্যাদেশ পেয়ে সড়কটিতে সাববেজ এর কাজ করেছেন ও ডাবলো বিএম এর জন্য রাস্তায় খোয়া ফেলেছেন। মাঠের মাটি উত্তোলন কাজে অবাধে ট্র্যাক্টর চলাচল করছে। ফলে সড়কটির এখন বেহাল অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। ইউএনওকে বিষয়টি জানানো হয়েছে।

বদলগাছী উপজেলা নির্বাহী অফিসার হুসাইন শওকত বলেন, কসবা গ্রামে ফসলি জমির মাটি কেটে বিক্রি করা হচ্ছে বলে জেনেছি। সেখানে সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) যেতে বলা হয়েছে। বালু ও মাটি উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।