বেসরকারি ব্যাংকগুলোর শিশু দিবাযত্ম কেন্দ্র চালু

স্টাফ রিপোর্টার: বেসরকারি ব্যাংকগুলোর উদ্যোগে চালু হলো শিশু দিবাযত্ম কেন্দ্র। ফলে সব মিলিয়ে এখন ৭০ জনের বেশি কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্মকর্তার সন্তানরা এখানে বিশেষ পরিচর্যা পাবে। রোববার (৩১ জানুয়ারি) বিকেলে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে এ কেন্দ্রের উদ্বোধন করেন। এ সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর আবুল কাশেম, বেগম নাজনীন সুলতানা, নির্বাহী পরিচালক এবতাদুল ইসলামসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।

এই কেন্দ্রে ছয় মাস থেকে আট বছরের শিশুরা যাদের মায়েরা বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা, তারা থাকতে পারবে। তাদের জন্য পরিচর্যাকারীসহ খেলাধুলা, টিভি এবং দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা রয়েছে। প্রতিটি শিশুর জন্য পাঁচ হাজার টাকা ব্যয় হবে, যার ৩৫ শতাংশ বহন করতে হবে অভিভাবককে।

সরেজমিন শিশু দিবাযত্ম কেন্দ্র ঘুরে দেখা যায়, এখানে আধুনিক পরিচর্যার সব ব্যবস্থা রয়েছে। রয়েছে বিনোদন, খেলাধুলা ও শিার সুবিধাও। বল কর্নারসহ পুরো এলাকাই যেন শিশুর জন্য সাজানো।

দিবাযত্ম কেন্দ্রের উদ্বোধন করে গভর্নর ড. আতিউর রহমান বলেন, ব্যাংকিং খাতের নারী কর্মীদের জন্য আজকের দিনটি খুবই আনন্দের। কেননা, ব্যাংক পাড়া নামে খ্যাত মতিঝিল এলাকায় তেইশটি বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের যৌথ সিএসআর অর্থায়নে গড়ে ওঠা একটি শিশু দিবাযত্ম কেন্দ্রের শুভ উদ্বোধন হয়েছে। শুনে ও দেখে খুশি হয়েছি যে, দিবাযত্ম কেন্দ্রটি উন্নতমানের ও শিশুদের মনের মতো করে গড়ে তোলা হয়েছে। হালে ব্যাংকগুলো যে অনেকটাই মানবিক, তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে বিবেচনা করা যায় আজকের এই শিশু দিবাযত্ম কেন্দ্রটিকে। এই রকম একটি তাৎপর্যপূর্ণ ও উৎসাহব্যঞ্জক অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে পেরে আমি সত্যিই আনন্দিত।

তিনি বলেন, আমাদের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই নারী। বাংলাদেশের সংবিধানে সর্বক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমান অধিকারের কথা উল্লেখ থাকলেও এ দেশের নারীরা নানা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। এই বৈষম্যমূলক আচরণের মূলে রয়েছে পুরুষের ওপর নারীর অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা। নারীরা পরিবার তথা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে পুরুষের সমান অংশগ্রহণ করতে পারছেন না। ফলে তাদেরকে সর্বদাই পুরুষের ওপর নির্ভরশীল থেকে বঞ্চিত হতে হয়। এই অবস্থা থেকে মুক্তির একমাত্র পথ নারীদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে আরো বেশি করে অংশগ্রহণ। প্রয়োজন নারীর ক্ষমতায়ন বৃদ্ধি ও কর্মক্ষমতার পূর্ণ উপযোগ সৃষ্টি করা।

গভর্নর বলেন, কর্মজীবী মায়েরা কর্মক্ষেত্রে প্রায়ই সমস্যায় পড়েন তাদের ছোট্ট শিশুটির জন্য। সময়মতো শিশুকে গোসল করানো ও খাবার খাওয়ানোর জন্য মায়ের মন সবসময় ব্যাকুল থাকে। তাই একজন মা যখন তার ছোট্ট শিশুটিকে কোনো নিরাপদ আশ্রয়ে রাখার নিশ্চয়তা পান না, তখন চাকরি করার ইচ্ছাটাও তার মরে যায়। তিনি কাজের জন্য ঘরের বাইরে যেতে চাইলেও যেতে পারেন না। এজন্য আমরা প্রায়ই দেখি বা শুনি, অনেক চাকুরিজীবী মা শুধু সন্তানের কথা ভেবে চাকরি ছেড়ে দিচ্ছেন। এটি খুবই পীড়াদায়ক। এভাবে কত শিক্ষিত মা যে ঝরে পড়ছেন তার হিসেব নেই। তাই ছোট শিশুর রক্ষনাবেক্ষণের জন্য নগরের সকল প্রতিষ্ঠানে দিবাযত্ম কেন্দ্র থাকাটা খুব জরুরি। সেদিক থেকে ব্যাংকের কর্মজীবী মায়েদের শিশু সন্তানদের জন্য এই দিবাযত্ম কেন্দ্রটি স্থাপন খুবই সময়োপযোগী হয়েছে বলে আমি মনে করি।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের শ্রম আইনে আছে, চল্লিশ বা তার বেশি বয়সের নারী শ্রমিক নিয়োজিত আছেন এরূপ প্রতিষ্ঠানে তাদের ছয় বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য এক বা একাধিক উপযুক্ত কক্ষের ব্যবস্থা ও রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে। তবে, প্রায় চল্লিশ লাখ নারী শ্রমিক সমৃদ্ধ আমাদের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পসহ সরকারি-বেসরকারি অনেক প্রতিষ্ঠানে শিশু দিদিবাযত্ম কেন্দ্র গড়ে ওঠেনি বললেই চলে। আশার কথা, এখন ব্যাংকগুলো এ ব্যাপারে সক্রিয় হয়ে ওঠছে। এভাবে যদি প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে শিশু দিবাযত্ম কেন্দ্র স্থাপিত হয়, তাহলে মায়েরা কর্মস্থলে নিশ্চিন্তে কাজ করে দেশের টেকসই উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারেন। এর ফলে বাসায় অবস্থানরত শিশু সন্তানদের দেখাশুনা বা শারীরিক অসুস্থতাসহ বিভিন্ন কারণে ব্যাংকার মায়েদের ছুটি নেয়ার প্রবণতা হ্রাস পাবে। অন্যদিকে, তারা নিশ্চিন্ত মনে ব্যাংকের কাজ করতে সক্ষম হবেন। এতে ব্যাংকারদের কাজে-কর্মে গতিশীলতা আরো বাড়বে এবং ব্যাংক ও কর্মী উভয়পক্ষই লাভবান হবেন। অর্থাৎ একটা উইন-উইন সিচ্যুয়েশন তৈরি হবে।

তিনি বলেন, এখন দেশের ব্যাংকিং খাতে নিয়োজিত কর্মবলের একটি বড় অংশই হচ্ছে নারী। এ কারণেই ব্যাংকগুলোকে এককভাবে বা নিকটবর্তী স্থানে যৌথভাবে শিশু দিবাযত্ম কেন্দ্র স্থাপনের জন্য আমরা ২০১৩ সালেই একটি নির্দেশনা দিই। দেরিতে হলেও আজ ব্যাংকগুলো এগিয়ে এসেছে। গেল বছরের আগস্টে আমি এই ভবনেই আগে সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী ও বেসিক ব্যাংক -এসব সরকারি ব্যাংকের যৌথ উদ্যোগে স্থাপিত একটি শিশু দিবাযত্ম কেন্দ্র্র উদ্বোধন করেছি। আর বাংলাদেশ ব্যাংক ২০০৬ সালে বত্রিশ জন শিশুর যত্ন এবং লালন-পালনের সুবিধাদি নিয়ে একটি শিশু দিবাযত্ম কেন্দ্র চালু করে। চাহিদা ও প্রয়োজনের তাগিদে আমরা এটির পরিসর বাড়িয়ে সীট সংখ্যা আশিটিতে উন্নীত করেছি। এর পরিসর আরো বাড়ানো এবং এটিকে আন্তর্জাতিক মানের ডে-কেয়ার সেন্টার হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা আমাদের রয়েছে। আমাদের চট্টগ্রাম অফিসেও একটি ডে-কেয়ার সেন্টার চালু করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীবৃন্দের প্রতি আমার আহ্বান, আজ যাদের মৌলিক চাহিদা নিশ্চিত করতে আমরা এখানে মিলিত হয়েছি, সেই শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে এই কেন্দ্রটি যেন সহায়ক হয় এবং এখানে যেন তাদেরকে পর্যাপ্ত পরিচর্যা দেয়া সম্ভব হয় সেলক্ষ্যে আপনারা দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখবেন। শিশুদের প্রতি আপনাদের সহযোগিতার হাত আরো প্রসারিত করুন। কেননা, আজকের এই শিশুদের হাতেই থাকবে আগামী দিনে দেশ গড়ার দায়িত্ব। তারাই আমাদের উপহার দিবে সুন্দর ও সমৃদ্ধ এক বাংলাদেশ। আপনাদের নিবিড় তদারকিতে এই দিবাযত্ম কেন্দ্রটি সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে পরিচালিত হবে। ভবিষ্যতে এর পরিসর আরো বাড়বে এবং রাজধানীর অন্যান্য জায়গা ও ঢাকার বাইরের গুরুত্বপূর্ণ নগরগুলোতেও এ ধরনের দিবাযত্ম কেন্দ্র গড়ে ওঠবে বলে আমার বিশ্বাস। গুলশানে অবস্থিত ব্যক্তিখাতের ব্যাংকগুলো যৌথভাবে আরেকটি দিবাযত্ম গড়ে তোলার কাজ করছে বলে আমি জানতে পেরেছি। এভাবে দেশে আরো শিশু দিবাযত্ম গড়ে ওঠুক-এটাই আমার প্রত্যাশা।চাহিদার তুলনায় এই ব্যবস্থা খুবই অপ্রতুল। তাই এ ধরনের আরো কেন্দ্র গড়ে তোলার জন্য প্রধান নির্বাহীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।