ভ্রান্ত কালের সমীক্ষা : জান্নাতুল ফেরদৌসী

আকাশের রং আজ বিবর্ণ। কখনও অপরাজিতার মতো নীল আবার কখনও কাশফুলের মতো শুভ্র মেঘ হয়ে ভেসে বেড়ায় দূর দিগন্তে। মানুষের জীবনও প্রকৃতির মতো বিচিত্রতায় ক্ষণে ক্ষণে বদলে যায়। জীবনের কিছু স্বপ্ন উরন্ত বালুকনা হয়ে উড়ে যায় আবার কিছু স্বপ্ন জীবনের গতি পাল্টে দেয় বাস্তবতায়। আমরা হেরে যাই স্বপ্নের কাছে জিতে যায় বাস্তবতা।

সময়টা চৈত্র এবং বৈশাখের মাঝামাঝি। প্রচন্ড গরমে অলস দুপুরে ঘরে বসে পড়াশোনায় কিছুতেই মন বসছিলো না।বারবার বিরক্তি আসছিলো। হঠাৎ চোখ পড়ল বাড়ির পশ্চিম দিকে পুকুর পারে আম বাগানে। আমের মুকুল থেকে সবেমাত্র কিছুদিন হলো আম বের হলো। কোনো কোনো গাছের আম একটু আগেই বড় হতে দেখা যায়। ভাবলাম, কচি আম কাঁচা লঙ্কা ও লবন মাখিয়ে খেলে মন্দ হয় না। বাগানে ঘুরাঘুরি করছি, এমন সময় দেখি রাজন ও রফিক এ পথদিয়ে আসছে।আমাকে গাছের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে রাজন হাতে থাকা কিছু আম দেখিয়ে বলল, খেতে চাইলে আমার কাছ থেকে নিতে পারো। আমি সুযোগটা হাতছাড়া করতে চাইনি। হাত বাড়িয়ে নিয়ে কিছু একটা বলতে গিয়ে থেমে গেলাম। তার মায়া ভরা স্মিতহাসির বদনখানি আটকে দিলো আমার ভাষা। অপলক দৃষ্টিতে আমাকে দেখছিলো এক মূহুর্তের জন্য। ওর দৃষ্টি আমার হৃদয় স্পর্শ করলো। মৃদুস্বরে শান্ত গলায় জানতে চাইলাম, আমাকে কেনো দিলে? অস্ফুট বাক্যে স্পষ্ট করে লাজুক ভঙ্গিমায় রাজন বলল, “আজ দিলাম ,সময় মতো প্রতিদান নিবো”। আমি পিছন থেকে হাসতে হাসতে জবাব দিলাম, সুযোগ পেলে দিয়ে দিবো চাইতে হবেনা। সেদিন আমার প্রত্যূত্তর শুনছিলো কিনা জানিনা। আজ আমি দীর্ঘদিন পরে এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। আমার জীবনের পড়ন্ত বেলায় ধূসর বর্ণের গভীরতায় এ কেমন বেদনার সুর। কৈশোরে, অন্য সহপাঠিদের মতো রাজনের সাথেও দেখা হলে ভালো মন্দ জানা কিংবা দু একটি কথা হতো। তাহলে তার জন্য আমার কিসের এতো দায়? ছেলেবেলা তো উড়ে গেছে নাটাই হাতে সুতা কাটা ঘুড়ি হয়ে। সেখানে তো অনেকেই ছিলো, জীবন নদীর বাকেঁ বাঁকে তীরে তীরে নীড় গড়েছে যে যার মতো। হয়ত কখনও কারো সাথে দেখা হয় আবার কারো সাথে দেখা হলেও কথা বলার সময় হয়না। জীবনের রং পাল্টে যাচ্ছে প্রকৃতির সাথে সাথে। সেই সাথে বদলে যাচ্ছে সময়ের গতি।

রাজন ও রফিক আমাদের প্রতিবেশী। ওদের বাড়ি আমাদের বাড়ি একটা পাড়ার ব্যবধান। রাজনের বাবা সরকারী কর্মকতা। তার মা ও কর্মজীবী। সে ছিলো খুব লাজুক,তার অবয়বে ফোটে উঠতো রজনিগন্ধার মতো স্নিগ্ধতা। দেখতে ছিলো আকর্ষণীয়, কথা বলতো খুব সুন্দর করে। তার স্পষ্ট শুদ্ধ বাংলায় কথা বলার মধ্যে ছিলো এক ধরনের মুগ্ধতা। সমবয়সি মেয়েরা আড়ালে লুকিয়ে থেকে তার কথা শুনতো। আমি নিজেও কতবার সামনে যেতে না পেরে লুকিয়ে দেখেছি। অনেক ছেলেরাও গল্প করতো তার সৌর্ন্দয্য বর্ণনা করে। রাজন খুব কম কথা বলতো এবং বন্ধুদের সাথে মিশতো ও কম। আমরা সমবয়সি হলেও খুব একটা দেখা স্বাক্ষাত হতোনা। একই কাসে পড়তাম আমাদের স্কুল ছিলো আলাদা। ও পড়তো হাইস্কুলে, আমি গার্লস স্কুলে।পড়াশোনায় ছিলো অসম্ভব মেধাবি, প্রতিটা বিষয় নিয়ে অনুসন্ধান করতে প্রচুর বই পড়তো। কখনও ঘরের কোণে কখনও ঘরের উচু পাটাতনের উপর গোপন কক্ষে একাকি নীরবে বসে বিভিন্ন ধরনের শিক্ষামূলক বই ও পত্রিকা পড়তো। যে কোনো ঘটনার বা পরিস্তিতির সত্য উৎঘাটন করতে চেষ্টা করতো। কোনো ব্যপারে অবিস্বাস করা পছন্দ করতোনা, সব সময় বলতো মানুষের প্রতি মানুষের বিস্বাস রাখা উচিৎ। এক কথায় সে একটু ব্যতিক্রমি ছিলো । রাজনের ছোট বোন ইরা আমার ছোট বোন তমার সাথে পড়তো, সে সুবাদে ওর কথা একটু আধটু জেনে নিতাম। আগে তেমন খেয়াল করিনি। ঐ দিনের পর থেকে রাজন সমন্ধে কৌতুহল বেড়ে গেলো। একটা সময় তাকে জানার কৌতুহলে চৈত্রের খরতার মতো ছটফট করতাম কিন্তু কাউকে কিছু বলতে পারতাম না। হয়তো বয়সটাই ছিলো এমন। বৈশাখি ঝড়ের আগে আবহাওয়া যেমন অস্থির চঞ্চল। যৌবনে পর্দাপণের পুর্বের সময়টা থাকে তেমনি দুরন্ত দূর্বার। সময়ের ব্যবধানে কর্মে ব্যস্ততায় বদলে গেলো অনেক কিছু। আমিও নিজেকে মানিয়ে নিলাম পরিবেশের সাথে।

আমি গ্রামের সাধারণ পরিবারের দস্যি মেয়ে। খুবই ডানপিটে ছিলাম। বার তের বছর বয়সে আমার দুরন্তপনায় মা সব সময় শংকিত থাকতো। মায়ের শাসন বারণ কিছুই শুনতামনা। যখন যা ইচ্ছা করতো তাই করতাম। এক গাছ থেকে অন্য গাছের মগডালে চড়ে বেড়াতাম। গাছের কাচাঁপাকা ফল নিজে পেড়ে নিয়ে আসতাম। মা চোখ পাকালেও বাবা কিছু বলতো না। সারাদিন মা হাজার বার মনে করিয়ে দিতেন আমি রড় হযে গেছি, যেনো সাবধানে চলি। বাবা আমাকে একটু বেশী আদর করতো। তাই মায়ের হাজারটা নালিশ থাকলেও ভয় পেতাম না। বাবা মাথায় হাত বুলিয়ে বলতো, তুই আমার ছেলে তুই আমার মেয়ে তুই আমার মা। তোকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন অপরাজিতা। বাবা, কি ভেবে যে নামটা রাখলো জানিনা। আমি বাবাকে সব কাজে সাহায্য করতাম। কিন্তু মাকে সাহায্য করার সুযোগ পাইনি। কারণ বাবার সব কিছুতেই আমার তাবেদারি ছিলো। সংসার খরচ থেকে শুরু করে জমিতে কোন ফসল আবাদ হবে সব বাপ বেটিতে মিলে আলোচনা করতাম। মা কিছু জানতে চাইলে বাবা বলতো বাপ বেটির মাঝখানে মা যেনো না আসে। মাকে ক্ষেপাতে দেখে আমি খুব মজা পেতাম। তবে, বাবার একটাই চাওয়া ছিলো মেয়ে পড়াশোনা করে বড় হয়ে সফলতা অর্জন করবে। বাবা, এস এস সি পাশ করে কলেজে পড়তে পারেনি সংসারের চাপে। তাই হয়তো নিজের সন্তানের মাঝে নিজেকে বিকশিত করতে চাইতেন। প্রতিটা বাবা মা তার সন্তানকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেন, সন্তানের থেকে মূল্যবান পিতামাতার কাছে আর কিছু হতে পারেনা। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে রোজগার করেন, যেনো সান্তানের জন্যই বেঁচে থাকা।

একবার আমার স্কুলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বাবা উপস্থিত ছিলেন। আমার একটা গান শুনে বাবা এতোটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে রেডিও কিংবা টেলিভিশনে গান শুনে বলতেন আমার আপরাজিতার মতো। মা বলতো, ওরা তো অনেক বড় শিল্পি আমার অপরাজিতা কি এতো বড় মানুষ হতে পারবে। বাবার কাছে আমি ছিলাম সেরা। কারো সাথে আমাকে তুলনা না করে আমার সাথে তিনি তুলনা করতেন। সত্যি বলতে কি তিনি বাবা বলেই এমন ভাবতে পারতেন। স্নেহ সব সময় নিম্নগামী। আমাদের সন্তানেরাও আমাদের স্নেহের অধিকারী। আমি বাবার কাছ থেকে শিখেছি, কিভাবে মমত্ববোধে জড়িয়ে রাখতে হয় চারপাশটাকে, অন্যায়কে কিভাবে প্রতিরোধ করতে হয় প্রতিবাদে।

১৯৯৫ সালে এইচ এস সি পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে বাংলা পরীক্ষা দিয়ে হল থেকে বের হয়ে, হঠাৎ দেখি আমার সামনে রাজন। কুশলবিনিময় করে জানতে পারলাম সেও পরীক্ষার্থী। পরীক্ষা কেমন হলো জিজ্ঞাসা করায় তার যে উত্তর তা আজও ভুলিনি। স্নিগ্ধ শান্ত মধুর কন্ঠে বলল, আচ্ছা বলতো হৈমন্তি গল্পের হৈমন্তির চরিত্র কি এতো অল্প সময়ে লিখা সম্ভব? হৈমন্তি সমাজ ব্যবস্থাপনার বলির শিকার হয়েছে ,তার প্রতি কেনো এই অমানবিকতা? আরও অনেক প্রশ্ন করতে লাগলো উত্তরের অপেক্ষা না করে। আমি থামিয়ে দিয়ে বললাম, পরীক্ষার খাতায় কয়টা উত্তর করেছো? সে বলে, একটাই তো হয়নি। আমি বুঝেছিলাম মাথাটা তার একেবারেই গেছে। পিছনে যারা শুনছিলো তারা হাসতে হাসতে চলে গেলো। আমি তাকে একটা রেস্টোরেন্টে নিয়ে বসলাম তার সমন্ধে জানতে। সে দীর্ঘ দিন যাবত নাকি বাড়ীর বাহিরে। কি জানি কি অজানা হৃদয়ের টানে কৌতুহল বেড়ে গেলো রাজনকে জানার। বললাম, কেনো তুমি এমন ছন্নছাড়া উদাসিন। সেই ছোট বেলার শান্ত স্নিগ্ধ রাজন অস্থির হয়ে আমাকে পশ্ন করলো, আচ্ছা তুমি তো নারী বলোতো মায়ের কাছে জীবন বড় নাকি তার সন্তান? একজন মায়ের কি দায়িত্ব না পরিবার টিকিয়ে রাখা? মায়ের স্বেচ্ছাচারিতার জন্য কেনো সন্তানের জীবন বিপন্ন হবে? আমি তাকে থামিয়ে দিয়ে বললাম, তোমার সব কথা আমাকে খুলে বলো। সে অস্থিরতার সাথে আমাকে একের পর এক উল্টা পাল্টা প্রশ্বন করে যাচ্ছে। রাজনকে আমি শান্ত হয়ে পড়াশোনায় মনোযোগী হওয়ার কথা বলায় সে ক্ষেপে গেলো আমার উপর। প্রায় চিৎকার করে বলতে লাগলো, আমি তো সেই অধিকার টুকুই চাই, পড়াশোনা করার পরিবেশ চাই, মানুষের মতো মানুষ হয়ে বাঁচতে চাই। রাজন কখনও কারও প্রতি অন্যায় করতো না। কিন্তু কেনো তার মানবিকতা বিপন্ন হচ্ছে, সে তার অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, সে ব্যপারে সঠিক ভাবে জানতে পারলাম না। তার সব কথা বুঝতে না পারলেও এটুকু বুঝেছিলাম, সে ভালো নেই। আমি স্পষ্ট দেখছিলাম তার ভিতর থেকে অগ্নিগীরির উত্তপ্ত লাভা নির্গত হচ্ছে, যার উত্তাপ আমি অনুভব করছি। তাকে আর কিছু বলার সাহস পেলামনা।

রাজন, কেনো জীবন সমন্ধে পরিবার সমন্ধে জানতে চাইলো জানা না হলেও আমার কাছে প্রশ্ন তৈরী করে গেলো। এ প্রশ্ন গুলোর মুখোমুখি দাড়িয়ে আমি উত্তর খুঁজি প্রতিনিয়ত, কারন আমি একজন নারী। নারী পুরুষের সামাজিক বন্ধনের ফলে পরিবার গড়ে উঠে। এই সম্পর্ক শুধু পরিবার নয়, সমাজ এবং রাষ্ট্রের দায়দায়িত্ব বহন করে। পরিবার টিকিয়ে রাখার ব্যপারে শুধু মায়ের নয়, বাবারও দায়িত্ব আছে। পুরুষের কারনেও পরিবার ভেঙ্গে যেতে পারে। পিতামাতার কাছে সন্তানের থেকে বড় তো কিছু হতে পারেনা। পরিবারে স্বামী স্ত্রীর সম্পর্কের অবনতির কারনে সন্তানের জীবন বিপন্ন হতে পারে। কেনো রাজনের জীবন বিপন্ন? আমার মনে আছে জোসনা খালাম্মার কথা। খালাম্মা প্রতিদিনের মতো সকালের কাজ সেরে রান্নাবান্না করতেছিল স্বামীর সংসারে, হঠাৎ বাড়ীর বাহির থেকে একজন এসে জানালো তার স্বামী বিয়ে করেছে তাকে তালাক দিয়ে। খালাম্মার একমাত্র মেয়ে সন্তানটি সেদিন কেড়ে না নিলেও অন্য একদিন নিয়ে গিয়েছিলো। মায়ের যেমন সন্তানকে বুকে রাখার অধিকার আছে সন্তানেরও মায়ের কাছে থাকার মানবিক অধিকার আছে। শুধু মাত্র পরিবার ভেঙ্গে যাওয়ার কারনে এ অধিকার ক্ষুন্ন হয়। দৃশ্যটি আমার কাছে প্রতিয়মান। আমরা নিজেদের নিয়ে সংসারের যাতাকলে এতো ব্যস্ত, মর্মান্তিক কাহিনী ও আমাদের ভাবায় না। ভুলে যেতে বাধ্য হই জীবনের প্রয়োজনে। রাজনের কথাও ভুলে গেছি, দীর্ঘ দিন যাবৎ তার সাথে যোগাযোগ নেই। এখন মোবাইলে সহজেই সবার খবর নেওয়া যায় ,তখন এমন সুযোগ ছিলো না। তাই দু‘ একবার মনে পড়লেও ব্যস্ততায় হারিয়ে গেছে।

আমি স্বামী সন্তান নিয়ে ব্যস্ততম শহরে বসবাস করছি। এরই মধ্যে আমাকেও জীবনের অনেক চড়াই উতরাই পাড় হতে হয়েছে। পরিবার পরিজনের পাশাপাশি আমার জগতের পরিধিটাও বেড়ে গেছে। আমি সংসারের ফাঁকে ফাঁকে নিজেকে তৈরী করেছি, বাবার স্বপ্ন পূরণে বিপন্ন মানবতার পাশে দাড়াতে। পড়াশোনা শেষ করে আমি জজ কোর্টের একজন আইনজীবী হিসাবে কাজ করি। হঠাৎ করে একদিন একটা মামলার ফাইলে পরিচিত নাম শুনে চমকে উঠি, আমার সমস্ত দেহ নীথর হয়ে যায়। রাজনের বোন ইরা আমাকে দেখে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। জানতে পারি এটা সে রাজন। যে রাজন ছিলো মায়ের কাছে সাতরাজার ধন, সুন্দরীদের কাছে কাংখিত পুরুষ, সমাজের কাছে আদর্শ মানুষ। আজ সে একটা খুনের আসামি। কিভাবে কি ঘটে ছিলো জানার জন্য ইরাকে নিয়ে আসলাম আমার বাসায়। তার কাছে সমস্ত ঘটনা শুনে আমি নির্বাক। রাজনের জন্য কিছু একটা করতে বিবেকের কাছে তাগিদ অনুভব করলাম।

আমি আইনজীবী হিসাবে রাজনের মামলাটা হাতে নিলাম এবং তার সাথে দেখা করতে কাশিমপুর জেল খানায় গেলাম। আমাকে দেখে রাজনের কোনো প্রতিক্রিয়া নেই, স্বাভাবিক ভাবে কথা বলল। যেনো সেই ছোট বেলার শান্ত সুবোধ বালক। আমি জানতে চাইলাম কেনো তুমি এমন করলে? রাজন স্নিগ্ধ শান্ত গলায় বলল, আমার কথা কেও শুনতে চায়না বুঝতে চায়না । আমি বললাম তোমার সব কথা শুনতে চাই, আজ কোনো কিছু গোপন করোনা আমার কাছে। সে নিজের মতো করে শুরু করলো, আমরা এক ভাই এক বোন, বাবা মায়ের আদরেই বড় হতে লাগলাম। আমার স্বপ্ন ছিলো একজন আদর্শ মানুষ হবো, পিতামাতার গর্বিত সন্তান হবো। সমাজের মানুষের সেবা করে মানুষকে স্বশিক্ষায় শিক্ষিত করে ক্ষমতায়ন করবো। কখনও কেও যেনো তার অধিকার থেকে বঞ্চিত না হয়, সে জন্য তার পাশে দাড়াবো। কিন্তু আমি আমার নিজের আধিকার থেকে বঞ্চিত হতে হতে নিজেকে স্বাভাবিক রাখতে পারিনি। কিছুক্ষন চুপ করে ছিলো, আমি বললাম আমাকে সব খুলে বলতে। একটা দীর্ঘ নিঃস্বাস ছেড়ে বলল, বাবা চাকুরীর কারনে কর্মস্থলে থাকতেন। প্রতি সপ্তাহে একবার বাড়ি আসতেন, কখনও পনের দিন পরে আসতে হতো। সংসারের প্রায় সবই ছিলো মায়ের হাতে। মা একটা বেসরকারী অফিসে চাকুরী করতেন। মায়ের এক সহকর্মী বিভিন্ন সময় অফিসের একাজে ওকাজে আমাদের বাড়ী আসতো। ঘন্টার পর ঘন্টা মায়ের রোমে থাকতেন, আমার বিছানায়ও শুয়ে বসে গল্প করতো মায়ের সাথে। আমার পরীক্ষার সময়ও ঐ লোকটার জন্য আমি ভালোভাবে পড়তে পারতাম না। মা সব সময় প্রয়োজনীয় অপ্রয়োজনীয় সব কথা ঐ লোকটার সাথে আলোচনা করতেন। প্রথম প্রথম ভাবতাম লোকটা মনে হয় মাকে কোন ব্যপারে সাহায্য করে, তাই হয়তো মা সংসার নিয়ে কথা বলে। প্রায়ই শুনতাম লোকটা মাকে নোংরা নোংরা কথা বলতো, মা রাগ না করে উপভোগ করতো। বাড়িতে কেও না থাকলে অনেক রাত পর্যন্ত অবস্থান করতো। আমরা বড় হয়েছি, তাদের সম্পর্কটা বুঝতে পারতাম। ছোট খাটো কোন ঘটনা নিয়ে আপত্তি করে মাকে কিছু বললে কথায় কথায় আমাকে বাড়ি থেকে চলে যেতে বলতো। মায়ের সাথে এ নিয়ে কথা কাটাকটি করে অনেকবার বাড়ি থেকে চলে যেতে বাধ্য হয়েছি। দিনমজুরের কাজ করেছি, পোল্টি ফার্মে ময়লার গন্ধে কাজ করেছি, ষ্টেশনে ষ্টেশনে কুলির কাজ করতে চাইছি, কিন্তু পারিনি। নোংরা জামা পরতে হয়েছে, বাজে বন্ধুদের সাথে ঘুমাতে গিয়ে পালিয়ে এসেছি। অনেক বন্ধু আমার শরীরে বীর্য আউট করেছে। লজ্জায় ঘৃনায় ওখান থেকে অন্য কোথাও আশ্রয় খুজতাম। এক মুহুর্ত নীরব থেকে বলল, অপরাজিতা তুমি চলে যাও আমার নোংরা জীবনের কথা আর শুনতে চেয়োনা।

আমি চল্লিশ বছর বয়সে এসে এক নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন করলাম। আমি জানতাম নারীরা বাড়ির বাহিরে নিরাপদ নয়। কিন্তু পুরুষেরাও ধষর্ণের শিকার হয় এটা জানতাম না। একটা সম্ভ্রান্ত শিক্ষিত পরিবারের সন্তান সব যায়গায় নিজেকে মানাতে না পেরে, অস্বাভাবিক জীবনযাপন করে। অনেক সময় এমন পরিস্থিতিতে মস্তিস্ক বিকৃত ঘটে।

রাজন শুধু বাজে বন্ধুদের কথা বলেনি, এক শিল্পপতিও তাকে কাজ দিবে বলে তার শরীর ব্যবহার করেছে। মসজিদের ইমাম থেকেও সে রক্ষা পায়নি। অশিক্ষায় কুশিক্ষায় চারপাশের বিকারগ্রস্ত পরিবেশে রাজনের নিগৃহীত জীবন নেশাগ্রস্ত হয়ে পরে। এক সময় সে কেদেঁ ফেলে কথা বলতে বলতো। সে কোথাও স্থির হতে না পেরে বাড়ী ফিরে আসে। এবার রাজন নীরব হয়ে ফেলফেলিয়ে তাকিয়ে রইলো আমার দিকে, কোনো কথা নেই। তার মতো তরতাজা সম্ভাবনাময় একটি তরুন , পরিবারের অবহেলার কারনে কি হয়ে গেলো। যে দেশের সম্পদ হতে পারতো আজ সে নিজেই বিপন্ন। আমার সময় শেষ হয়ে যাচ্ছে তাগিদ দেওয়ায় রাজন বলল, আমি তো একটা খুন চাইনি? আমি দু‘জনকে এক সাথে খুন করতে চেয়েছি।

পরিবারে মুল্যবোধের অভাবে আমাদের চারপাশে রাজনের মতো অসংখ্য খুনি তৈরী হচ্ছে। আমরা যদি আমাদের শ্রেয়বোধকে কাজে লাগাতে পারি এরা দেশের সম্পদে পরিনত হতে পারে। একশ্রেনীর পুরুষরা ঘরে সুন্দরী স্ত্রী থাকার পরেও পরনারী ভোগে আনন্দ পায়। এদের লোভ লালসার কাছে হেরে যায় বিপদগামী নারী। যার প্রভাব পড়ে সন্তানের উপর সমাজের উপর, ক্ষতিগ্রস্ত হয় রাষ্ট্র। হয়তো রাজন আজ খুনি না হয়ে প্রতিভাকে কাজে লাগিয়ে দেশের জন্য বরেণ্য ব্যক্তিত্ব হতে পারতো।

রাজন এখন মায়ের খুনের অপরাধে যাবজ্জীবন কারাভোগ করছে। ছোট বোন ইরার দুর সম্পর্কের এক আত্মিয়ের সাথে বিয়ে হয়েছে। রাজনের বাবা পরিস্থিতির হিসাব কষতে কষতে কবেই পরপারে চলে গেছেন। ইরা মাঝে মধ্যে ভাইয়ের জন্য এদিক সেদিক ছুটাছুটি করে। টাকার জন্য উচ্চ আদালতে আপিল করতে পারছেনা। আমি সিনিয়র অভিজ্ঞ আইনজীবীদের সাথে নিয়ে রাজনের শাস্তি মওকুফের জন্য উচ্চ আদালতে আপিল করার ব্যবস্থা করছি। প্রয়োজনে রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদন করবো। রাজন কোন অপরাধীর নাম নয়, এটি বর্তমান সমাজের একটি ট্রাজেডি। সে সমাজের পরিস্থিরি শিকার। মানবিক কারনে রাজন মুক্তি পেতে পারে, হয়তো আবার শুরু হতে পারে ক্ষয়ীষ্ণু জীবন থেকে একটি আদর্শ পরিবার।

লেখক : আইনজীবী ও রাজনীতিবিদ