মানিলন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে বাংলাদেশের ব্যবস্থা উন্নত বিশ্বের সমতুল্য

প্রেস রিলিজ : বাংলাদেশের মানিলন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধ কার্যক্রমের বিদ্যমান ব্যবস্থা পরিবীক্ষণের লক্ষ্যে এশিয়া প্যাসিফিক গ্রুপ অন মানিলন্ডারিং (এপিজি) কর্তৃক ৩য় পর্বের মিউচ্যুয়াল ইভ্যালুয়েশন প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত প্রতিবেদন (Mutual Evaluation Report-MER) প্রকাশ উপলক্ষ্যে ২৮ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান ভবনের ৫ম তলায় জাহাঙ্গীর আলম কনফারেন্স হলে একটি সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ও হেড অব বিএফআইইউ আবু হেনা মোহাঃ রাজী হাসান উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া অন্যান্যের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও ডেপুটি হেড অব বিএফআইইউ মোহাম্মদ নওশাদ আলী চৌধুরী, বিএফআইইউ এর অপারেশনাল হেড জনাব দেবপ্রসাদ দেবনাথ, বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী মূখপাত্র ও ডিপার্টমেন্ট অব কমিউনিকেশন্স এন্ড পাবলিকেশন্সের মহাব্যবস্থাপক এফ. এম. মোকাম্মেল হক এবং বিএফআইইউ এর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠানের শুরুতে জনাব রাজী হাসান সবাইকে স্বাগত জানিয়ে মানিলন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধ কার্যক্রমের বিদ্যমান ব্যবস্থার মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের অর্জনকে সকলের সামনে তুলে ধরেন। তিনি জানান, গত ০৭ সেপ্টেম্বর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার সান ডিয়েগো শহরে অনুষ্ঠিত এপিজি’র ১৯ তম বার্ষিক সভায় বাংলাদেশের প্রতিবেদনটি চূড়ান্তভাবে অনুমোদিত হয় যা গত ২৬ সেপ্টেম্বর তারিখে বাংলাদেশকে মতামতের জন্য প্রেরণ করা হয়েছে। এপিজি কর্তৃক প্রণীত চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বাংলাদেশের বিদ্যমান আইনী ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো পর্যালোচনা করে এফএটিএফ এর ৪০ টি সুপারিশের বিপরীতে বাংলাদেশ ৬ টি সুপারিশে Compliant (C), ২০ টি সুপারিশে Largely Compliant (LC) এবং ১৪ টি সুপারিশে Partially Compliant (PC) রেটিং অর্জন করেছে। পাশাপাশি আইনী ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর কার্যকারিতা মূল্যায়নে বাংলাদেশকে ১১টি Immediate Outcome (IO) এর মধ্যে ৩ টি IO তে  Substantial, ৪ টি IO তে Moderate এবং ৪ টি IO তে Low লেভেলের রেটিং প্রদান করা হয়েছে। এর ফলে চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বাংলাদেশের রেটিং নরওয়ে, শ্রীলংকা, ফিজি হতে ভালো অবস্থানে রয়েছে এবং কোন কোন ক্ষেত্রে অস্ট্রেলিয়াসহ অনেক উন্নত দেশ হতেও ভালো অবস্থানে রয়েছে যা সন্ত্রাস, সন্ত্রাসে অর্থায়ন, জঙ্গীবাদ, মানিলন্ডারিংসহ অন্যান্য অপরাধ নির্মূলকরণে বাংলাদেশের অবস্থানকে আন্তর্জাতিকমানে উন্নীত করেছে বলে জানানো হয়।

রাজী হাসান বলেন, মঙ্গোলিয়ার অপারগতার সূত্রে এপিজি’র অনুরোধে বাংলাদেশ ২০১৩ সালের নভেম্বর মাসে ৩য় পর্বের মিউচ্যুয়াল ইভ্যালুয়েশন প্রক্রিয়ার বিষয়ে মাননীয় অর্থমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জাতীয় সমন্বয় কমিটির অনুমোদনক্রমে বাংলাদেশ সম্মতি জ্ঞাপন করে।

এ প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ কর্তৃক মানিলন্ডারিং ও এর সাথে সম্পৃক্ত ২৭টি অপরাধ, সন্ত্রাস ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন ও অন্যান্য অপরাধের সাথে সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশের সকল আইন, বিধিমালা, সরকারী আদেশ; বিভিন্ন নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের সার্কুলার, নিদের্শনা, গাইডলাইন্স পর্যালোচনাপূর্বক বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত এপিজি’কে প্রদান করা হয়। পরবর্তীতে উক্ত আইন ও বিধিমালাসমূহের কার্যকারিতা মূল্যায়নের নিমিত্তে সরকারের ২৬টি মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থা এবং ১৭ ধরণের রিপোর্ট প্রদানকারী সংস্থার কার্যক্রম সন্নিবেশিত করে প্রস্তুতকৃত জবাব আন্তঃসংস্থা রিভিউ কমিটি কর্তৃক রিভিউ করার পর জুন, ২০১৫ এ এপিজি বরাবরে দাখিল করা হয়।

বাংলাদেশ কর্তৃক প্রেরিত প্রতিবেদনসমূহ বিবেচনায় নিয়ে এপিজি সেক্রেটারিয়েট এর নেতৃত্বে ভারত, ইন্দোনেশিয়া, চীন, ব্রুনাই দারুস সালাম, নিউজিল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে ৮ (আট) সদস্যের একটি মূল্যায়নকারী দল গত ১১-২২ অক্টোবর, ২০১৫ মেয়াদে বাংলাদেশ সফর করে। বাংলাদেশে অবস্থানকালে উক্ত মূল্যায়নকারী দলটি বাংলাদেশ সরকারের ২৬টি মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থা এবং ২৫ ধরণের বেসরকারী খাতের প্রতিনিধি যথা ব্যাংক, বীমা, আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ বিচারক, শিক্ষাবিদ, সাংবাদিকদের সাথে ৪৫ টি সভায় মিলিত হয়ে মতবিনিময়ের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করে।

এক্ষেত্রে রাজী হাসান মিউচ্যুয়াল ইভ্যালুয়েশন প্রক্রিয়ায় অন-সাইট ভিজিটে অংশগ্রহণ করে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরে বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশের মানিলন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন সম্পর্কিত বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনের জন্য সকল সংবাদ মাধ্যমকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। উক্ত অন-সাইট ভিজিট ও জন সম্মুখে প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদ, গবেষনা প্রতিবেদন হতে প্রাপ্ত তথ্য ও বাংলাদেশ প্রদত্ত বিভিন্ন প্রতিবেদনের উপর ভিত্তি করে এপিজি বাংলাদেশের উপর খসড়া প্রতিবেদন প্রস্তুত করে। বাংলাদেশ এপিজি প্রণীত ১ম, ২য় ও ৩য় খসড়া প্রতিবেদনের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক মতামত প্রদান করে। পরবর্তীতে ৩য় খসড়া প্রতিবেদনের উপর মুখোমুখি আলোচনার জন্য মূল্যায়নকারী দলটি গত ০১-০৫ মে, ২০১৬ মেয়াদে আবারও বাংলাদেশ সফর করে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থার সভায় মিলিত হয়। মুখোমুখি আলোচনার পর প্রণীত ৪র্থ খসড়া প্রতিবেদন এপিজি’র বার্ষিক সভায় অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হয় যা ০৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ তারিখে এপিজি’র ১৯ তম বার্ষিক সভায় অনুমোদিত হয়।

রাজী হাসান আরও জানান, ১৮০ পৃষ্ঠার মিউচ্যুয়াল ইভ্যালুয়েশন প্রতিবেদনে বাংলাদেশের মানিলন্ডারিং, সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধ ব্যবস্থার বিস্তারিত পর্যালোচনা করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থার কার্যক্রম মূল্যায়ন করা হয়েছে। কোন সংস্থার কোথায় দুর্বলতা রয়েছে তা যেমন আলোচনা করা হয়েছে তেমনি ঐ সংস্থার সক্ষমতাও তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে বাংলাদেশ সরকারের সন্ত্রাস ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধের যেমন প্রশংসা করা হয়েছে তেমনি দুর্নীতি ও মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ কার্যক্রমের দূর্বলতা/ সীমাবদ্ধতার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন জাতীয় সমন্বয় কমিটি, জঙ্গিবাদ প্রতিরোধ ও প্রতিকার কমিটি, ওয়ার্কিং কমিটির মাধ্যমে নীতি প্রণয়নের সমন্বয়, আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের উম্মুক্ত নীতি ও বিএফআইইউ এর কার্যক্রমের ভুয়সি প্রশংসা করা হয়েছে প্রতিবেদনে। এছাড়াও বাংলাদেশের মানিলন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে  “BFIU is the strongest building block in the AML/CFT regime of Bangladesh” মর্মে মন্তব্য করা হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লিখিত বিভিন্ন দুর্বলতা দূরীকরণে বিভিন্ন সুপারিশও করা হয়েছে যা পর্যায়ক্রমে বাংলাদেশকে বাস্তবায়ন করতে হবে। এ বিষয়ে জাতীয় সমন্বয় কমিটির নির্দেশনার আলোকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থা প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করবে।

রাজী হাসান বলেন, এপিজি’র বার্ষিক সম্মেলনে অনুমোদিত মিউচ্যুয়াল ইভ্যালুয়েশন প্রতিবেদনটি বাংলাদেশ সরকারের স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, আইনের শাসন, বিচারিক প্রক্রিয়া ইত্যাদির বিস্তারিত আখ্যান যা একটি স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় বিশ্ববাসীর সামনে উপস্থাপন করা হয়েছে। প্রতিবেদনে প্রাপ্ত রেটিং এর ফলে বাংলাদেশ আর ঝুঁকিপূর্ণ দেশের কাতারে নেই বরং একটি আন্তর্জাতিক মান পরিপালনকারী দেশ হিসেবে বিবেচিত হবে এবং এর ফলে বাংলাদেশ বিশ্ব দরবারে মাথা উচুঁ করে দাড়াতে পারবে। পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকায় থাকলে বাংলাদেশ হতে বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বাবদ অতিরিক্ত ব্যয় হিসেবে যে লক্ষ লক্ষ ডলার চলে যেত তা সাশ্রয় হবে।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কর্তৃক স্বীকৃত এ প্রতিবেদন বাংলাদেশের চলমান অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে টেকসই করতে সহায়তা করবে। কারন বর্তমানে আমদানী-রপ্তানী বাণিজ্য, বৈদেশিক ঋণ, অনুদান সকলক্ষেত্রেই মানিলন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে বিবেচনায় নেয়া হয়। এমনকি বেসরকারী পর্যায়ে ঋণ গ্রহণ, ব্যবসায়িক সম্পর্ক বিস্তারে আলোচ্য রেটিং সহায়ক হবে। সর্বোপরি সরকারের ভিশন ২০২১ ও ২০৪১ বাস্তবায়নে এ প্রতিবেদন সহায়তা করবে; পাশাপাশি জাতিসংঘ কর্তৃক গৃহীত Sustainable Development Goal (SDG) বাস্তবায়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। কেবল তাই নয়, জাতিসংঘ, বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অংশীদারদের সাথে বিদ্যমান সুসম্পর্ক উন্নয়নেও তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এছাড়া বিভিন্ন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক জোটে বাংলাদেশের উপস্থিতি এবং বিভিন্ন দায়িত্ব পালনের সুযোগ আরও প্রসারিত হবে।

মানিলন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন বিষয়ের পরিপালন নিয়ে বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা এতদিন শুধু বাংলাদেশকে প্রশ্ন করেছে; এখন বাংলাদেশও অন্যদেশকে প্রশ্ন করার সামর্থ্য অর্জন করেছে। করেসপনডেন্ট ব্যাংকিং সম্পর্ক স্থাপন কালে এখন শুধু আমাদের ব্যাংকগুলোই মানিলন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন সম্পর্কিত প্রশ্নের জবাব দিবে না; বরং বিশ্বের অন্যান্য ব্যাংকগুলোকে প্রশ্ন করতে পারবে। এর ফলে বাংলাদেশ জাতি হিসেবে মাথা উঁচু করে দাড়াবার আরেকটি সক্ষমতা অর্জন করলো।

বিজ্ঞাপন চ্যানেলে আজ প্রেস রিলিজটি প্রেরণ করেছেন এফ.এম. মোকাম্মেল হক, মহাব্যবস্থাপক, ডিপার্টমেন্ট অব কমিউনেকশন্স এন্ড পাবলিকেশন্স, বাংলাদেশ ব্যাংক, প্রধান কার্যালয় মতিঝিল, ঢাকা। Phone: 9530141(Direct) PABX 3201 E-mail:  [email protected]