মৌমিতা সেনকে ওয়ার্ল্ড হিউম্যান রাইটসের চ্যালেঞ্জ

স্টাফ রিপোর্টার : বিতর্কিত ফেসবুক ইউজার  মৌমিতা সেন। গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের মান-ইজ্জত নষ্ট করাই তার কাজ। তাকে নিয়ে যারা কিছু বলেন, তাদের পিছনেই লেগে যান মৌমিতা সেন। তার বিরুদ্ধে কাপাসিয়া থানায় এজাহার দাখিলের খবর গত ৬ মে বিজ্ঞাপন চ্যানেলে প্রকাশ হলে চ্যানেলটির ক্ষতি করার জন্য উঠে পড়ে লাগেন মৌমিতা সেন গং। তাদের নানা অপকর্মের জন্য তাদেরকে পুলিশ খুঁজছে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে গাজীপুরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ বিজ্ঞাপন চ্যানেলকে জানান, মৌমিতা সেন হচ্ছে সাইবার অপরাধীদের ফেসবুক আইডি।তারা সংঘবদ্ধভাবে এই আইডি সহ আরও কয়েকটি ফ্যাক আইডি পরিচালনা করছে।আইনী ঝামেলা এড়াতে মৌমিতা সেন গংয়ের সঙ্গে সকল সম্পর্ক ছিন্ন করার জন্য ফেসবুক ইউজারদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন গাজীপুরের পুলিশ সুপার।

তিনি আরও বলেন, মৌমিতা সেন গংয়ের বিরুদ্ধে কাপাসিয়া, শ্রীপুর ও গাজীপুর সদর থানায় একাধিক অভিযোগ রয়েছে । যারা মৌমিতা সেন আইডির ফ্রেন্ড কিংবা ফলোয়ার, যারা তার স্ট্যাটাসে শেয়ার কিংবা লাইক দেন অথবা উস্কানীমূলক মন্তব্য করেন এবং তার পক্ষে যারা সাফাই গান বা অন্য কোনোভাবে তার সঙ্গে যাদের সম্পর্ক রয়েছে, এদের সবাইকে উক্ত অভিযোগগুলোতে মৌমিতা সেনের সঙ্গে আসামী করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, তাদেরকে খুঁজে বের করার জন্য সংশ্লিষ্ট থানার ওসিকে নির্দেশ দিয়েছি।

এদিকে মৌমিতা সেন গতকাল তার ফেসবুক আইডিতে “সচেতন ও বিবেকবান কাপাসিয়াবাসীর কাছে আকুল আবেদন” শিরোনামে একটি লেখা পোষ্ট করেছেন। তিনি সেখানে লিখেছেন, “প্রায় আট মাস পূর্বে কাপাসিয়া উপজেলার টোক ইউনিয়নের ডুমদিয়া স্কুলের গেট থেকে ষষ্ঠ শ্রেণির এক দরিদ্র ও মেধাবী ছাত্রী অপহৃত হয়…..তারপর ওই ছাত্রীর মা কবিরাজীর মাধ্যমে আনুমানিক ৭ দিন হলো মেয়েকে ফেরত পেয়েছেন ।“

মৌমিতা সেনের এই মনগড়া বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা  জানিয়েছেন ওয়ার্ল্ড হিউম্যান রাইটস ডিপার্টমেন্ট সহ বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান।  ওয়ার্ল্ড হিউম্যান রাইটস ডিপার্টমেন্ট-এর মুখপাত্র মোঃ রুহুল আমীন বলেছেন, কবিরাজীর মাধ্যমে অপহরণকৃত কাউকে ফিরিয়ে আনা যায় না। যদি তাই হতো, তাহলে রাষ্ট্রীয়ভাবে করিরাজদের নিয়োগ দেওয়া হতো।  থানায় থানায় “কবিরাজ” পদ থাকত। আর পুলিশ অভিযান না চালিয়ে কবিরাজের মাধ্যমে নিখোঁজ ব্যক্তিকে উদ্ধার করত। অপহরণ হওয়া মানুষকে মন্ত্র বলে থানায় নিয়ে আসত। তারপরও যদি মৌমিতা সেনরা  কবিরাজের মাধ্যমে অপহৃতকে ফেরত আনতে পারেন, তাহলে বসে আছেন কেন? দেশে এখনও হাজার হাজার রাজনীতিক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবি, পেশাজীবী অপহৃত হয়ে আছে। তাদের ফিরিয়ে আনুন। আমরা চ্যালেঞ্জ করছি, আপনারা তা পারবেন না। আর যদি না পারেন, তবে এ ধরণের পোষ্ট কেন দেন।

মুখপাত্র আরও বলেন, প্রকৃত ঘটনা না জেনে পিউর তথ্য প্রমাণ ছাড়া এ বিষয়ে মন্তব্য করা কতটুকু সঠিক তা ভাবা উচিত। তিনি জানান,  ওই ছাত্রী অপহরণের প্রায় ৭ মাস পর ওয়ার্ল্ড হিউম্যান রাইটস ডিপার্টমেন্ট-এর সহায়তায় গত ২ জুলাই বিকাল ৪ টায় কাপাসিয়া উপজেলার ডুমদিয়া গ্রামের রিয়াজ উদ্দিনের বাড়ি থেকে উদ্ধার হয়। এ ব্যাপারে আমাদের কাছে লিখিত ডকুমেন্ট রয়েছে।

আদালত সূত্রে জানা যায়, ওই ছাত্রীর বাড়ি কাপাসিয়া উপজেলার ডুমদিয়া গ্রামে। সে কির্ত্তুনিয়া ইছব আলী ভূইয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্রী। গত ৪ জানুয়ারি স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে ধর্ষণের উদ্দেশ্যে তাকে অপহরণ করে সুমন গং। এ ঘটনায় আত্মস্বীকৃত অপহরণকারীদের বিরুদ্ধে ওয়ার্ল্ড হিউম্যান রাইটস ডিপার্টমেন্ট-এর সহায়তায় অপহৃতার মা বাদী হয়ে গাজীপুরের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে একটি পিটিশন দাখিল করেন।

এর প্রেক্ষিতে গত ১০ মার্চ ঘটনাটি বিচার বিভাগীয় তদন্তের জন্য গাজীপুরের সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মাহবুবা আক্তারকে নির্দেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। সে মতে তিনি অভিযোগ সম্পর্কে অনুসন্ধান করতঃ প্রতিবেদন দাখিল করেন গত ২৬ এপ্রিল। প্রদত্ত প্রতিবেদনে সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মাহবুবা আক্তার উল্লেখ করেন, সুমন গংয়ের বিরুদ্ধে আনীত অপহরণপূর্বক ধর্ষণের অভিযোগ বিষয়ে প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে ।

এর আগেও সুমন গং একাধিকবার ছাত্রীটিকে অপহরণ করে ধর্ষণ করে। পরে এ নরপশুদের কবল হতে ভিকটিমকে উদ্ধার করে পুলিশ। বয়স ও পরিস্থিতি বিবেচনা করে তাকে রাখা হয় নিরাপত্তামূলক হেফাজতে। পরিবেশ কিছুটা শান্ত অনুভব হলে নিরাপদ হেফাজত থেকে বাড়ি চলে আসে এবং সুমন গংয়ের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য ডুমদিয়া উচ্চ বিদ্যালয় ছেড়ে স্থানীয় কির্ত্তুনিয়া ইছব আলী ভূইয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের ৮ম শ্রেণিতে ভর্তি হয় সে । সেখানে গেল বছর কৃতিত্বের সঙ্গে জেএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে এ বছর নবম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত থাকে। কিন্তু বিধি বাম। সে গত ৪  জানুয়ারি স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে সাড়ে তিনটার দিকে তার বাড়ির কাছে সামনা ব্রীজের উত্তর পাশে ইটের রাস্তার উপর পৌছলে সুমন গং তাকে  সিএনজিতে  তুলে নিয়ে যায়।

এ সময়  অপহৃতার মা, ভাই ও খালা সহ অনেকে কিছুটা দূর হতে ঘটনা দেখে ঐ রাস্তার দিকে এগিয়ে যায়। কিন্তু অপহরণকারীরা তাকে দ্রুত দূরে কোথায় নিয়ে যাওয়ায় তাকে পাওয়া যায়নি। ভিকটিমকে অপহরণ ও ধর্ষণের ঘটনা উল্লেখ করে তার মা বাদী হয়ে গত ৫ জানুয়ারি কাপাসিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি)-এর নিকট একটি এজাহার দাখিল করলে, ওসি বাদীর এজাহার নিতে অপারগতা প্রকাশ করে।

পরে বিষয়টি নিয়ে কাপাসিয়ায় মানবাধিকার অফিসে বাদী ও প্রধান অভিযুক্ত সুমনের পিতা বিবাদী রিয়াজ উদ্দিনকে নিয়ে বসা হয়। সেখানে বিবাদী রিয়াজ উদ্দিন স্বীকার করে, অপহৃতা ওই ছাত্রী বিবাদীদের কাছেই আছে। তখন বিবাদী রিয়াজ উদ্দিন ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ তারিখ বিকাল ৪ ঘটিকায় তাকে বাদীর কাছে হস্তান্তর করবে বলে লিখিত প্রতিশ্রুতি দেয়।

কিন্তু  বিবাদীরা তাকে ফেরৎ না দেওয়ায় ওয়ার্ল্ড হিউম্যান রাইটস ডিপার্টমেন্ট -এর সহায়তায় নাবালিকা ছাত্রী অপহরণ, ধর্ষণ ও সহায়তা করার অপরাধে সুমন সহ ৫ জনের বিরুদ্ধে গত ১০ মার্চ গাজীপুরের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে মামলা (নং ৫৯/১৬) করলে তদন্ত প্রতিবেদনের প্রেক্ষিতে বিবাদী সুমনকে গ্রেফতারের আদেশ দেন আদালত।

গ্রেফতারের আদেশ জারী হওয়ার পর আসামীরা সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনালে হাজির হয়ে বলে, সুমন তাকে বিয়ে করেছে। মেয়েটিও আদালতকে জানায়, তারা স্বামী-স্ত্রী। তারা আদালতকে কাবিনের কাগজ দেখায়।এর প্রেক্ষিতে আদালত সুমন গংকে জামিন দেন।

“নাবালিকার বিয়ে” বিষয়টি মেনে নিতে পারেনি ওয়ার্ল্ড হিউম্যান রাইটস ডিপার্টমেন্ট। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে তারা খোঁজ-খবর নিতে থাকে। ডিপার্টমেন্টের অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য। জন্ম সনদ ও স্কুল সার্টিফিকেট অনুযায়ী ২০১৪ সালে মেয়েটির বয়স ছিল ১১ বছর। সেসময় তার বয়স ১৮ দেখিয়ে বিবাহ নিবন্ধন করেন নরসিংদীর মনোহরদী উপজেলার লেবুতলা ইউনিয়নের কাজী এ কে এম আরিফুল্লাহ।

বয়স বাড়িয়ে বিয়ের ব্যাপারে জানতে চাইলে কাজী এ কে এম আরিফুল্লাহ ওয়ার্ল্ড হিউম্যান রাইটস ডিপার্টমেন্টকে জানান,  “কাপাসিয়ার টোক ইউনিয়ন পরিষদ প্রদত্ত জন্ম সনদ (নিবন্ধন নং- ০০৫০১০) অনুযায়ী মেয়েটির জন্ম তারিখ ১ এপ্রিল ১৯৯৬। সে হিসেবে বিয়ের তারিখে, অর্থাৎ ৭ নভেম্বর ২০১৪ তারিখে তার বয়স ১৮ বছর।আর আইনের বিধান হচ্ছে, মেয়ের বয়স ১৮ বছর হলে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারেন।” কিন্তু টোক ইউনিয়ন পরিষদের রেকর্ড অনুযায়ী  ০০৫০১০ নং নিবন্ধন সংবলিত জন্ম সনদটি ভুয়া ও জাল। প্রকৃতপক্ষে মেয়েটির জন্ম তারিখ ১৪ নভেম্বর ২০০২।

বিষয়টি নিয়ে আবারও ওয়ার্ল্ড হিউম্যান রাইটস ডিপার্টমেন্ট-এর কর্মকর্তারা লেবুতলা ইউনিয়নের কাজীর কাছে যান এবং তারা বিষয়টি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেন। দীর্ঘ আইনী লড়াইয়ের পর  সেই বিয়ের নিবন্ধন বাতিল হয়ে যায়।

বিয়ে বাতিল হয়ে যাওয়ায় চরম বেকায়দায় পড়ে সুমন গং। সামনে হাজিরা। সে দিন বিষয়টি আদালতে উঠানো হবে।হয়তো আদালত সুমন গংয়ের জামিন বাতিল করে জেল-হাজতে প্রেরণ করবে। অপহরণ ও ধর্ষণের সাজা হবে। এ ভয়ে এবং ওয়ার্ল্ড হিউম্যান রাইটস ডিপার্টমেন্ট-এর চাপে সুমন গং মেয়েটিকে তার মাতার কাছে হস্তান্তর করতে বাধ্য হয় এবং অপহৃতার মা গত ২ জুলাই বিকাল ৪টায় তার কন্যাকে বুঝে পান। মেয়েকে বুঝে পেয়ে তিনি লিখিতভাবে প্রাপ্তি স্বীকার করেন। এ সংক্রান্ত লিখিত ডকুমেন্ট ওয়ার্ল্ড হিউম্যান রাইটস ডিপার্টমেন্ট-এর কাপাসিয়া কার্যালয়ে রক্ষিত আছে। যে কেউ অফিসে গিয়ে তা দেখতে পারেন, বললেন ওয়ার্ল্ড হিউম্যান রাইটস ডিপার্টমেন্ট-এর মুখপাত্র মোঃ রুহুল আমীন।

মৌমিতা সেনের কাছে ওই মুখপাত্রের প্রশ্ন, আপনি কার কাছ থেকে কিভাবে কখন জানলেন ছাত্রীটি কবিরাজীর মাধ্যমে উদ্ধার হয়েছে? আপনি কী বিশ্বাস করেন কবিরাজীর মাধ্যমে অপহৃতাকে ফেরত পাওয়া যায়? যদি করেন, তাহলে দেশে সকল অপহৃত-অপহৃতাকে কবিরাজীর মাধ্যমে ফিরিয়ে আনুন। আর যদি না পারেন, তবে পাবলিক প্লেসে এ ধরণের পোষ্ট দেন কেন? এসব প্রশ্নের লিখিত উত্তর(নাম-ঠিকানা ও স্বাক্ষর সহ) আগামী ৩১/০৭/২০১৬ তারিখ সকাল ১১ টার মধ্যে ওয়ার্ল্ড হিউম্যান রাইটস ডিপার্টমেন্ট-এর কাপাসিয়া কার্যালয়ে প্রাপ্তিস্বীকার প্রত্যয়ন সহ  প্রেরণ করতে মৌমিতা সেনকে আহ্বান জানায় ওই মুখপাত্র। তিনি বলেন, মৌমিতা সেন অপরাধী না হলে এ কাজটি করে দেখাবেন।

এদিকে মেয়েটিকে উদ্ধারে ব্যয় নির্বাহ বিষয়ে জানতে চাইলে ওয়ার্ল্ড হিউম্যান রাইটস ডিপার্টমেন্ট-এর চেয়ারম্যান মোঃ সাইফুল ইসলাম মোল্লা বলেন, মেয়েটি উদ্ধারে মামলা দায়ের ও পরিচালনা সহ নানা প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে গিয়ে সংস্থার প্রায় ৬৫ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে।

মেয়ের মা জানান, সংস্থার লোকজন সদয় হয়ে আমার কন্যাকে উদ্ধার করে দিয়েছেন। সম্পূর্ণ বিনা টাকায় তারা কাজটি করে দিয়েছেন। এজন্য আমি তাদের কাছে চির কৃতজ্ঞ।

আরও পড়ুন :  মৌমিতা সেন গংয়ের বিরুদ্ধে কাপাসিয়া থানায় তথ্য প্রযুক্তি আইনে এজাহার দাখিল

কাপাসিয়ায় অপহরণের ৭ মাস পর স্কুলছাত্রী উদ্ধার