লোক শিল্প » কাপাসিয়া

লোক শিল্প » কাপাসিয়া

কাপাসিয়ার ধারাবাহিক ইতিহাস : পর্ব-৩(৭)

অধ্যাপক শামসুল হুদা লিটন :Biggapon Channel- Liton

কারুশিল্প, হস্তশিল্প, কুটিরশিল্প সমাহারে কাপাসিয়ার লোকশিল্প। এক সময় কাপাসিয়ার লোক শিল্পের ব্যাপক প্রসার ঘটেছিল। কাপাসিয়ার লোক শিল্পগুলো হলো- নকশি কাঁথা, নকশি পাখা, শীতল পাটি, নকশি শিকা, শোলার কাজ, বাশঁ-বেতের কাজ, মলি-ইকরের কাজ, নকশি চৌরিঘর, লোকবাদ্যযন্ত্র, লাঙ্গল-জোয়াল-মই সহ কৃষি সরঞ্জাম, নারিকেলের হুক্কা, নকশি পিঠা, আলপনা, পাটজাত শিল্প, কৃষি উপকরন তৈরী, কাঠ মেস্ত্রীর তৈরী কাঠের নানান জিনিস।

কাপাসিয়ার কড়িহাতা, কুশদী, দরদরিয়া, টোক, বেগুনহাটি, কামড়া এলাকায় ব্যাপক মৃৎশিল্প গড়ে উঠেছিল। এখনো অনেক স্থানে এসব মৃৎশিল্প কোনরকমে টিকে আছে। কড়িহাতা কুমার বাড়ি, কুশদী কুমার বাড়ি মৃৎশিল্পের অস্তিত্ব ধরে রেখেছে। অনেক স্থানেই এ শিল্প বিলুপ্ত হয়ে গেছে। মৃৎশিল্পের মধ্যে রয়েছে, হাড়ি-পাতিল, সানকি, খেলনা, মাটির ব্যাংক, টোপা, ফুলের টব, বদনা, কড়াই, জাজর, তাওয়া, গুড়ের হাড়ি, হরা বা সরা, চাড়া  প্রভৃতি। মৃৎশিল্পীদের কুমার বলা হয়।

কাপাসিয়ার কড়িহাতা ইউনিয়নে কুমার বাড়ি একটি পরিচিত নাম। উপজেলার দূর্গাপুর ইউনিয়নের বেগুনহাটি গ্রামে লাল মাটির উপর বহুকাল যাবৎ ছোট-বড় চাড়ার কনা ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। মাটি খুড়লে বিভিন্ন ধরণের চাড়ার অস্তিত্ব পাওয়া যায়। এক সময় বেগুন হাটি গ্রামে টেক অঞ্চলে বড় ধরণের মৃৎশিল্প গড়ে উঠেছিল বলে জানা যায়। বিভিন্ন ধরণের দৃশ্যমান মাটির চাড়া এ গ্রামে প্রাচীনকালের মৃৎশিল্পের অস্তিত্বিই প্রমাণ করে। বর্তমানে কাপাসিয়ায় মৃৎশিল্পের দূর্দিন চলছে।

কাপাসিয়া তাঁত শিল্পের জন্য সব সময়ই বিথ্যাত। এখানে এক সময় জগত বিখ্যাত মসলিন কাপড়ের তুলা কার্পাস ব্যাপকভাবে উৎপাদিত হতো। গাজীদের শাসন আমল থেকেই কাপাসিয়া অঞ্চলে তাঁত শিল্পের বিকাশ ঘটতে শুরু করে।

কাপাসিয়া উপজেলার খিলগাঁও, বিলজরাইল, ফেটালিয়া,  নাশেরা, দড়ি নাশেরা, লক্ষীপুর, কামড়া ,তরগাঁও,সিংহশ্রী, টোক, বারিষাব, সন্মানিয়া, পাবুর, চাঁদপুর, এলাকায় এক সময় তাঁত শিল্পের তথা বুনন শিল্পের ব্যাপক প্রসার ঘটেছিল। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, কাপাসিয়া উপজেলায় ১৯৪৫ সালে অনেকগুলি তাঁতী সমবায় সমিতি গঠিত হয়। ২০০৩ সাল পর্যন্ত ১০টি নিবন্ধিত তাঁতী সমবায় সমিতির অস্তিত্ব ছিল। নিবন্ধনের বাইরে ছিল অসংখ্যকসমিতি। এক সময় কাপাসিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলের প্রায় পনের-বিশ হাজার লোক তাঁত শিল্পের সাথে জড়িত ছিল। প্রায় পরিবারই বুনন শিল্পের সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত ছিল।

বর্তমানে নরসিংদীর বাবুরহাট এলাকায় যে তাঁত শিল্প গড়ে উঠেছে, তার চেয়ে অনেক সমৃদ্ধশালী তাঁত শিল্প গড়ে উঠেছিল কাপাসিয়ার দূর্গাপুর ইউনিয়নে। বৃহত্তর ঢাকা বিভাগের মধ্যে কাপাসিয়ার তাঁতী সমিতি ছিল সবচেয়ে বৃহত্তর ও শক্তিশালী। ঢাকা বিভাগের তাঁতীদের শীর্ষ  সংগঠন ‘ঢাকা সেন্টাল কো-অপারেটিভ ইন্ড্রাষ্টিয়াল ইউনিয়ন লিঃ’ এর  নেতৃত্বে ছিল কাপাসিয়ার তাঁতী সমিতির নেতৃবৃন্দ। খিলগাঁও গ্রামের বসির উদ্দিন খাঁ ছিলেন ‘ঢাকা সেন্টাল কো-অপারেটিভ ইন্ড্রাষ্টিয়াল ইউনিয়ন লিঃ’ এর সভাপতি। এর আগে কাপাসিয়ার কৃতিসন্তান দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী বঙ্গতাজ তাজউদ্দিন আহমেদ  ‘ঢাকা সেন্টাল কো-অপারেটিভ ইন্ড্রাষ্টিয়াল ইউনিয়ন লিঃ’এর সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। পরে কিছুদিনের জন্য সংগঠনটির সভাপতি হিসেবে কাজ করেন কাপাসিয়ার আরেক কৃতিসন্তানওয়ার্ল্ড সেফগার্ড এন্ড মিডিয়া লিমিটেড  এর  চেয়ারম্যান এন্ড সিইও  মোঃ সাইফুল ইসলাম মোল্লা ।

কাপাসিয়ার অধিকাংশ লোকশিল্পই আজ বিলুপ্তির পথে। পূর্বে এ অঞ্চলে যে সমস্ত লোকশিল্পের দ্রব্য তৈরি হতো তার অনেকগুলোই অত্যন্ত উচ্চমানের ছিল। মসলিন তার অন্যতম। মসলিন অধুনা বিলুপ্ত হলেও জামদানি শাড়ি অনেকাংশে সে স্থান দখল করে আছে। বর্তমানে জামদানি শাড়ি দেশে-বিদেশে পরিচিত এবং আমাদের গর্বের বস্তু। বর্তমানে এ শিল্প ধ্বংস প্রায়। নকশিকাঁথা আমাদের আরেকটি গ্রামিণ লোকশিল্প। এ শিল্প আজ লুপ্তপ্রায় হলেও কিছু কিছু নমুনা এখনো পাওয়া যায়। আপন পরিবেশ থেকেই মেয়েরা তাদের মনের মতো করে কাঁথা সেলাইয়ের অনুপ্রেরণা পেত। কাঁথার প্রতিটি সুচের ফোঁড়ের মধ্যে লুকিয়ে আছে এক একটি পরিবারের কাহিনি, তাদের পরিবেশ, তাদে জীবনগাথা। আমাদের কুমোরপাড়ার শিল্পীরা বিভিন্ন ধরনের তৈজসপত্র ছাড়াও পোড়ামাটি দিয়ে নানা প্রকার শৌখিন দ্রব্য তৈরি করে থাকে। নানা প্রকার পুতুল, মূর্তি ও আধুনিক রুচির ফুলদানি, ছাইদানি, চায়ের সেট ইত্যাদি তারা গড়ে থাকে। আমাদের এই যে লোকশিল্প তা সংরক্ষণ করার দায়িত্ব আমাদের সকলের। আমরা আমাদের লোকশিল্পের মাধ্যমে নিজস্ব ঐতিহ্যকে বিশ্বের কাছে তুলে ধরতে পারি।আপডেট হবে

আগের প্রতিবেদন : কাপাসিয়ার লোক সঙ্গীত

পরবর্তী প্রতিবেদন :  কাপাসিয়ার সংস্কৃতির অষ্টমাংশ

লেখক : শামসুল হুদা লিটন
কবি, সাংবাদিক, কলামিষ্ট
কাপাসিয়ার ইতিহাস ও ঐতিহ্য গবেষক
অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, তারাগঞ্জ কলেজ, কাপাসিয়া, গাজীপুর
মোবাইল: ০১৭১৬৩৩৩১৯১।

দৃষ্টি আকর্ষণ :

  • এই প্রথমবারের মতো কাপাসিয়ার পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস লিপিবদ্ধ করা হচ্ছে।
  • বিজ্ঞাপন চ্যানেলের মাধ্যমে এই ইতিহাস লিখছেন অধ্যাপক শামসুল হুদা লিটন
  • কাপাসিয়ার সঠিক ও নির্ভুল ইতিহাস রচনার স্বার্থে যে কেউ বিজ্ঞাপন চ্যানেলকে প্রয়োজনীয় তথ্য জানাতে পারেন।
  • বিজ্ঞাপন চ্যানেল বিশ্বাস করে, আপনাদের তথ্য সহযোগিতা কাপাসিয়ার ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করবে এবং উত্তরোত্তর প্রজন্ম এই ইতিহাস জানবে ও অনুসরণ করবে।
  • বিজ্ঞাপন চ্যানেলে কাপাসিয়ার ইতিহাস নিয়ে প্রকাশিত ও প্রকাশিতব্য লেখাগুলো আপনাদের মূল্যবান তথ্যের ভিত্তিতে সময় সময় আপডেট করা হবে। তারপর এগুলো বই আকারে প্রকাশিত হবে।
  • কারো কাছে বর্ণিত ইতিহাসের কোনো তথ্য ভুয়া, অসত্য কিংবা আধাসত্য পরিলক্ষিত হওয়ার পর নিচের ঠিকানায় সঠিক ও নির্ভুল তথ্য জানালে কাপাসিয়ার ইতিহাসে আপনার অবদান উল্লেখ করা হবে।
  • ফেসবুক, টুইটার ও অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ সম্পর্কে কোনো মন্তব্য বা পরামর্শ দিলে তা গ্রহণ করা সম্ভব হয়ে উঠে না। সুতরাং,  আপনি বা আপনারা যে কোনো তথ্য, মন্তব্য বা পরামর্শ জানাতে অনুগ্রহপূর্বক যোগাযোগ করুন :-

        »  মোঃ সাইফুল ইসলাম মোল্লা,  চেয়ারম্যান এন্ড সিইও, ওয়ার্ল্ড সেফগার্ড এন্ড মিডিয়া লিমিটেড   

                 মোবাইল : ০১৯১০১০৭৩৪৩, ই-মেইল : [email protected]