শততম টেস্টে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক জয়

স্টাফ রিপোর্টার: দিনটির জন্য ১৭টি বছর অপেক্ষা করেছে বাংলাদেশ। অজস্র বাধা-বিপত্তি মাড়িয়ে ইতোমধ্যে ক্রিকেট বিশ্বে নিজেদের করে তুলেছে মজবুত এক প্রতিপক্ষ। কলম্বো টেস্ট জিতে আরও একবার সেই বীরত্বের সাক্ষর রাখলেন টাইগাররা। উন্মোচন করলেন নতুন দিগন্তের। যে রেকর্ড আজ ইতিহাসের পাতায় খোদাই করেছেন সাকিব-মুশফিকরা। সেটি সত্যিই গৌরবের। যার জন্য দীর্ঘ দেড় যুগ অপেক্ষা করতে হয়েছে লাল-সবুজের বাংলাদেশকে। অবশেষে সেই বহুল প্রতীক্ষার ফসল হাতে পেল চণ্ডিকা হাতুরুসিংহের ছাত্ররা।

অবশ্য ২০১৭ সালটায় পরাজয়ের গ্লানি ছাড়া কিছুই জোটেনি মাশরাফি-মুশফিকদের কপালে। ফলে নিন্দুকদের সমালোচনার খড়গও পিছু ছাড়ছে না টাইগারদের। জয়ের তীব্র ক্ষুধা নিয়েই শ্রীলঙ্কা সফরে যায় বাংলাদেশ। সবার আশা, এবার বোধ হয় হতাশার বৃত্ত থেকে বেরোবে লাল-সবুজের পতাকাধারীরা। কিন্তু প্রথম টেস্টে হতে হতেও হলো না। বাংলাদেশ হারল ২৫৯ রানের বড়সড় ব্যবধানে।

তবুও যে এদেশের ক্রিকেটপাগলেরা আশা ছাড়েননি। শততম টেস্টকে সামনে রেখে বন্ধ করেননি স্বপ্ন দেখা। অবশেষে মিলল সেই প্রতীক্ষার ফল। যে জয়টা মনে-প্রাণে চেয়েছে এদেশের ১৬ কোটি বাঙালি। সেটাই আজ হাতেনাতে পেল বাংলাদেশ। স্বাগতিক শ্রীলঙ্কাকে ৪ উইকেটে হারিয়ে কলম্বোর পি সারা ওভালের সব আলো নিজেদের করে নিল মুশফিক বাহিনী।

টেস্ট হয়েছে টেস্টের মতোই। পাঁচ দিনে দাঁতে দাঁত লাগিয়ে লড়াই করেছে দু’দল। তবে সবকিছু ছাপিয়ে শেষ দিনের রোমাঞ্চটা নজর কেড়েছে সবার। আগের দিনের ৮ উইকেটে ২৬৮ রান নিয়ে আজ ব্যাটিংয়ে নামে শ্রীলঙ্কা। অনেকে ভেবে নিয়েছেন সাতসকালেই বুঝি অলআউট হয়ে যাবে স্বাগতিকরা। কিন্তু লঙ্কান লেজের ঝাঁঝের কথা হয়তো ভুলেই গেছেন তারা। সেটা আরও একবার মনে করিয়ে দেন দিলরুয়ান আর লাকমাল। শেষমেশ জয়ের জন্য ১৯১ রানের লক্ষ্যমাত্রা ছুঁড়ে দিলেন হেরাথ-চান্দিমালরা।

লক্ষ্যটা সাদা চোখে যতটা সহজ, ততটা নয়। ব্যাটিংয়ে নেমে শুরুতেই বড়সড় ধাক্কা খেল বাংলাদেশ। প্রথম সারির দুই ব্যাটসম্যান সৌম্য সরকার ১০ আর ইমরুল কায়েস ফিরে যান খালি হাতেই। দিনের শুরুতে দুই উইকেট হারিয়ে খানিকটা বিপাকে পড়ে বাংলাদেশ। কিন্তু তামিম ইকবাল এবং সাব্বির রহমানের নজরকাড়া ইনিংসে টাইগার শিবিরে বয় স্বস্তির বাতাস। আশার ভেলাটা ধীরে ধীরে ভিড়তে থাকে কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যের দিকে।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ম্যাচের গতিপথও পরিবর্তন হয়। দারুণ এক জুটির পর সাজঘরে ফিরে যান তামিম-সাব্বির। এরপর উইকেটে থিতু হতে পারেননি প্রথম ইনিংসে ১১৬ করা সাকিব আল হাসানও। দুরু দুরু কাঁপন নিয়ে নিস্তব্ধ কলম্বোকে জাগিয়ে তোলেন অভিষিক্ত মোসাদ্দেক হোসেন। তাঁর সঙ্গী হয়ে ভরসার মশাল জ্বালান টাইগার কাপ্তান মুশফিকুর রহিম। আর মাত্র ২ রান হলেই জয়োল্লাসে মাতবে বাংলাদেশ। এমন একটা মুহূর্তে বিদায় হলো মোসাদ্দেকের।

মনের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল টাইগার ভক্তদের। কি হচ্ছে? খারাপ কিছু দেখতে হবে না তো। ততক্ষণে এক পা দুই পা করে উইকেটে মেহেদী হাসান মিরাজ। আক্রমণে ছিলেন রঙ্গনা হেরাথ। প্রথম দুই বল সমীহ করতে বাধ্য করলেন মিরাজকে।  তৃতীয় বলকে ফাইন লেগে ঘুরিয়েই দে দৌড়। দুই রান নিতে দেরি কিন্তু মিরাজকে জড়িয়ে উদযাপনে কোনো দেরি নেই। ভেসে আসল বাংলাদেশ, বাংলাদেশ প্রতিধ্বনি। মাত্র ১০-১২ জন টাইগার সমর্থক পুরো পি সারাকে যেন মাতায় তুলে নিল। আহা, কি আনন্দ আকাশে-বাতাসে।

সংক্ষিপ্ত স্কোর:

শ্রীলঙ্কা দ্বিতীয় ইনিংস: ৩১৯ (দিমুথ করুণারত্নে ১২৬, উপুল থারাঙ্গা ২৬, কুসল মেন্ডিস ৩৬, দিনেশ চান্দিমাল ৫, আসেলা গুনারত্নে ৭, ধনঞ্জয়া ডি সিলভা ০, নিরোশান ডিকওয়েলা ৫, দিলরুয়ান পেরেরা ৫০, রঙ্গনা হেরাথ ৯, সুরঙ্গা লাকমল ৪২, লক্ষণ সান্দাকান ০*; সাকিব আল হাসান ৪/৭৪, মোস্তাফিজুর রহমান ৩/৭৮, মেহেদী হাসান মিরাজ ১/৭১, তাইজুল ইসলাম ১/৩৮)

বাংলাদেশ দ্বিতীয় ইনিংস: ১৯১/৬ (তামিম ইকবাল ৮২, সৌম্য সরকার ১০, ইমরুল কায়েস ০, সাব্বির রহমান ৪১, সাকিব আল হাসান ১৫; মুশফিকুর রহিম ২২*, মোসাদ্দেক হোসেন ১৩, মেহেদী হাসান মিরাজ ২*; দিলরুয়ান পেরেরা ৩/৫৯, রঙ্গনা হেরাথ ৩/৭৫)

ম্যাচ সেরা: তামিম ইকবাল

সিরিজ সেরা: সাকিব আল হাসান

ফল: বাংলাদেশ ৪ উইকেটে জয়ী।