শ্রীপুরের ১০ হাজার শিক্ষার্থী সড়ক নিরাপত্তায় হাতে কলমে প্রশিক্ষিত

শ্রীপুর (গাজীপুর) মোঃ আকতার হোসেন :

শ্রীপুর উপজেলার ১০ হাজার শিশু শিক্ষার্থী সড়ক চলাচলের স্বাভাবিক নিয়ম কানুন জানে। এ শিশুদের সকলেই সড়ক চলাচলের ওপর প্রশিক্ষিত। শিক্ষার্থীদের শেখানো নিয়ম কানুন তাদের অভিভাবকেরাও আয়ত্বে নিয়ে এসেছেন। বাদ নেই এলাকার সাধারণ মানুষও।

সড়কের কোন্ পাশ দিয়ে যেতে হবে, কোন্ অংশ দিয়ে এবং কখন কিভাবে সড়ক অতিক্রম করতে হবে তাও তারা জানে। আজ ২৪ অক্টোবর সকালে সোমবার সড়ক চলাচলের ওপর এসব নিয়ম কানুনের পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে চার’শ শিক্ষার্থী। তারা সকলেই শ্রীপুর উপজেলার মোহাম্মদ আলী একাডেমীর বিভিন্ন শ্রেণীর শিক্ষার্থী। অংশগ্রহণকারী সকলেই সবগুলো প্রশ্নের সঠিক উত্তর প্রদান করতে সক্ষম হয়েছে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের তত্বাবধানে ও বিশ^ ব্যাংকের অর্থায়নে ব্র্যাক পরীক্ষা কার্যক্রমের আয়োজন করেন। সেকেন্ড রুরাল ট্রান্সপোর্ট ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্টের আওতায় প্রোগ্রামটি পরিচালিত হয়।

মোহাম্মদ আলী একোডেমীর চতুর্থ শ্রেণীর শিক্ষার্থী সিনথিয়া জানায়, সব সময় রাস্তার ডান পাশ দিয়ে হাঁটতে হবে। রিক্সায় বসার সময় শক্ত করে ধরে বসতে হবে। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কম থাকে।

একই শ্রেণীর শিক্ষার্থী ওয়ালিদ জানায়, কখনও লাল বাতির সিগনাল অতিক্রম করা যাবে না। গাড়ী চালানোর সময় চালকের সাথে কথা বলা যাবে না। হেলমেট ছাড়া মোটর সাইকেল চালানো যাবে না। মোটর সাইকেলের সকল আরোহীকে হেলমটে পরতে হবে। সারাজীবন সড়ক চলাচলে অন্যান্য নিয়মের পাশাপাশি এ নিয়মটি আমি মেনে চলব।

চতুর্থ শ্রেীণীর শিক্ষার্থী তামিম জানায়, রাতে সড়ক চলাচলের জন্য সড়কে টর্চ লাইটের আলো ফেলে চলতে হবে।

৬ষ্ঠ শ্রেণীর শিক্ষার্থী জাহিদুল হাসান জানায়, ফুটপাতবিহীন সড়ক চলাচলের সময় ছোটদের হাত ধরে হাঁটতে হবে, ছুটে গিয়ে যেন কোনো দুর্ঘটনার শিকার না হয়।

একই শ্রেণীর শিক্ষার্থী মাহিম জানায়, দাঁড়িয়ে থাকা কোনো গাড়ীর সামনে অথবা পেছন দিয়ে হঠাৎ দৌড়ে সড়ক পার হওয়া যাবে না। সড়কের ডানে বামে দেখে সতর্কতার সাথে সড়ক পার হতে হবে।

অভিভাবক বাচ্চু মিয়া বলেন, সাধারণত সড়কের বাম দিক দিয়ে হাঁটতে হবে বলে জেনে এসেছি। আমার সন্তানের কাছ থেকে জানতে পারলাম সড়কে নিরাপদে চলতে হলে ডান দিক দিয়ে হাঁটতে হবে। জেব্রা ক্রসিং চিহ্নিত স্থান দিয়ে সড়ক অতিক্রম করতে হবে। জেব্রা ক্রসিং না পেলে ডানে বামে দেখে সড়ক পার হতে হবে।

অপর অভিভাবক মুন্নী আক্তার জানায়, নিরাপদ সড়কের জন্য সন্তানের কাছ থেকে শুনে নিজেকেও অনেক জানার প্রয়োজন রয়েছে বলে উপলব্ধি করেছি। অভিভাবক ফারহানা আক্তার বলেন, ছেলে স্কুলে এসে নিজেও সরক নিরাপত্তা এবং সড়ক চলাচলের নিয়ম কানুন শিখেছি। যারা সড়কে চলাচল করেন তাদের প্রত্যেককেই সড়ক চলাচলের নিয়ম কানুন জেনে ও মেনে চলা উচিত। তবেই সড়ক দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব।

শ্রীপুরের মোহাম্মদ আলী একাডেমীর পরিচালক রেজানুর রহমান জানান, সড়ক নিরাপত্তার ব্যাপারে তার বিদ্যালয়ের ৩৯৩ জন শিক্ষার্থী প্রশিক্ষণ লাভ করেছে। প্রতি শ্রেণীতে প্রতি বৃহষ্পতিবার একটা নির্দিষ্ট সময়ে গত এক বছর যাবত তাদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। প্রতি কাশে ফিপ চার্ট স্থাপনের পাশাপাশি নিয়মিত ভিডিও প্রদর্শনীর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষিত করা হয়েছে। সোমবার একাডেমীর সকল শিক্ষার্থী সড়ক নিরাপত্তা কর্মসুচীর পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে সকলেই পূর্ণ নাম্বার পেয়েছে। ফলে লটারীর মাধ্যমে ৯ জনকে পুরষ্কৃত করা হয়েছে। এসময় শ্রীপুর রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি আবু বকর সিদ্দিক আকন্দ সোহেল, বিদ্যালয়ের শিক্ষক শাহজাহান মোড়ল, শিক্ষক শিক্ষিকা ও অভিভাবকেরা উপিস্থিত ছিলেন।

শ্রীপুরের বরামা এলাকার কমিউনিটি রোড সেফটি গ্রুপ (সি আর এস জি) তত্বাবধায়ক আলী হোসেন বলেন, পথচারীদের নির্বিঘ্নে চলাচল উপযোগী করার জন্য এলাকার সড়কগুলোর সমস্যা চিহ্নিত করা হয়। পরে সমস্যা সমাধানের জন্য প্রয়োজনে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তপক্ষকেও অবগত করানো হয়। পরিস্থিতিভেদে স্থানীয়ভাবেও সমাধান করা হয়। যেমন স্পীড ব্রেকার স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা, সড়কে গর্ত ইত্যাদি।

তিনি জানান, স্থানীয় বরামা-গোসিঙ্গা সড়কের বরামা বাজারের পাশে বর্ষা মৌসুমে পানি জমে ৫০ ফুট রাস্তা কর্দমাক্ত থাকে। গেল বর্ষা মৌসুমে সি আর এস জি এর সদস্যদের অংশগ্রহণে সড়কের ওই অংশের পানি নিষ্কাশনের জন্য ড্রেন করে দেয়া হয়েছে। এখন সড়কের ওই অংশে আর পানি জমে না, সকলের যাতায়াত উপযোগী হয়েছে।

ব্র্যাক এর সড়ক নিরাপত্তা কর্মসুচীর কর্মসুচী ব্যবস্থাপক এ কে এম খায়েরুজ্জামান জানান, সারাদেশে চারটি উপজেলা এ কর্মসুচীর আওতায় নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে গাজীপুরের শ্রীপুর ও কাপাসিয়া এবং কক্সবাজার উপজেলার উখিয়া ও টেকনাফ। তৃণমূলে কমিউনিটি রোড সেফটি গ্রুপ (সি আর এস জি) গঠন করা হয়েছে। শ্রীপুর উপজেলা চারটি গ্রুপে মোট ৪৮ জন সদস্য রয়েছেন। প্রতি গ্রুপে ১২ জন সদস্য। এলাকার অরাজনৈতিক এবং বিভিন্ন কমিউিনিটির লোকদেরকে সদস্য করা হয়েছে। এ গ্রুপগুলোর মধ্যে সমন্বয় করার জন্য তৃণমূল থেকে আবার দু’জন তত্বাবধায়ক রয়েছেন।

তিনি জানান, সড়ক চলাচলের নিয়ম কানুনের ব্যাপারে শ্রীপুর উপজেলার ২৪টি স্কুলের প্রধান শিক্ষকসহ সকল শিক্ষক এবং প্রায় ১০ হাজার শিক্ষার্থীকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের সেকেন্ড রুরাল ট্রান্সপোর্ট ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্টের পরিচালক মোস্তফা কামাল বলেন, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে সড়ক নিরাপত্তায় প্রকৌশলগত দিকটি মূলত স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর তত্বাবধান করছে। শিক্ষা বা সচেতনতামূলক সাইটি ব্র্যাক প্রতিষ্ঠান এলজিইডির সাথে সমন্বয় করে বাস্তবায়ন করছে। প্রকল্পটির মেয়াদ এখন শেষের দিকে। ফলাফল মূল্যায়ন করে এর ভবিষ্যত নির্ধারণ করা হবে।