সন্তানকে দুর্নীতি শেখাচ্ছে বাবা-মা নিজেই!

শেখ আদনান ফাহাদ : ‘প্রকাশ্যে চুমু খাওয়া এইদেশে অপরাধ, ঘুষ খাওয়া কখনোই নয়’। নচিকেতার এই গানের কথা ছোটবেলায় শোনা। আমার ছোটভাই (আসলে বড় ভাই) চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যখন ছুটিতে বাড়িতে আসতেন, তখন উনার একটা ছোট ক্যাসেটপ্লেয়ারে বাজাতেন। সেই ছোটবেলার গানের কথা এখনো কত সত্য! মেয়েদের মাথার ঘোমটা নিয়ে সমাজে যত মাথাব্যাথা, তার একটুও যদি নানা রকমের দুনম্বরি নিয়ে থাকত তাহলে সমাজের নিশ্চয় একটা ঘোমটা থাকত।

সমাজের ঘোমটা কি আছে? সমাজের থাকবে কি? অনেক পরিবারেরই এখন নাই! বাবা-মা নিজেই সন্তানকে দুর্নীতি শেখাচ্ছে। গোপনে নয়, প্রকাশ্যে! কেন এমন হবে? এরকম অনিয়মপ্রিয়, দুর্নীতিপরায়ণ বাবা-মা আর সন্তান দেখার জন্য কি আমাদের ৩০ লাখ মানুষ শাহাদাত বরণ করে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন?

আমাদের বাবা-মায়েরা আগেও সন্তানের জন্য একটু-আধটু দুনম্বরি করতেন। যদিও সেটা খুব বেশি বড় করে দেখার কিছু নেই! বয়স কমিয়ে স্কুলে ভর্তি করতেন আমাদের বাবা-মায়েরা। এখনও করেন। তবে বয়স কমিয়ে দুনম্বরি করতে শিক্ষকরাই উৎসাহিত করতেন। আজকালতো ‘ভালো মানুষ’ এর সংজ্ঞাও পাল্টে গেছে। ঘুষদাতাদের মুখে একটা কথা বেশ শোনা যায়; ঘুষ নিয়ে টাকা মেরে না দিলেই ইদানীং বলা হয় ‘ভালো মানুষ’।

ঘুষদাতারা বলেন, ‘লোকটা একেবারে ফেরেশতার মত, কত্ত ভালো মানুষ, টাকা নিয়াতো মাইরা দিতে পারতো! মারে নাই। চাকরি না হোক, টাকাতো মাইর যায় নাই’!!  যিনি বা যারা ঘুষ খান, তারাও মনে করেন না, যে ঘুষ খাওয়া কোনো অপরাধ। নিয়মের বাইরে বাড়তি টাকা বা অন্য কোনো সুবিধা নিয়ে কাজ করে দেয়া বা করার চেষ্টা করা যে দুর্নীতি, এটা অনেকের মনেই হয় না।

ধর্মীয় গুরুরা পর্যন্ত দুনম্বর হয়ে যাচ্ছেন। অনেক মসজিদ বা মন্দির কমিটিতে দেখা যায়, সমাজের সবচেয়ে বিতর্কিত, খারাপ মানুষগুলো সেখানে আছেন। হুজুর/পুরোহিতরাও তাদের সাথেই সম্পর্ক রাখেন যাদের টাকা আছে। সৎ মানুষ যখন টাকা দিতে পারে না, তখন এদের সাথে যোগাযোগ রাখেন না ধর্মীয় নেতারা। টাকা যার বেশি তার সাথেই উঠাবসা বেশি তাদের। এই টাকা কোত্থেকে আসল, এ নিয়ে হুজুর/পুরোহিতদের অনেকেরই কোনো মাথাব্যথা নেই। স্বাভাবিকভাবেই সৎ লোকের পক্ষে দান-খয়রাত করা সম্ভব হয় না। ফলে এদের তেমন পাত্তা দেয়া হয় না। এভাবেই দুর্নীতিবাজ আর ধর্মীয় নেতাদের যোগসাজশে সমাজে তৈরি হচ্ছে এক ভয়াবহ শ্রেণি।

ফলে গত কয়েকবছর ধরে যা শুরু হয়েছে তাতে পুরনো সেই বয়স কমিয়ে ভর্তি করানো বর্তমানের দুনম্বরির সাথে তুলনায়ই আসবে না। আগে আমরা ধর্মশিক্ষা বইতে- ‘মিথ্যা বলা মহাপাপ’, ‘লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু’ বা ‘অর্থই অনর্থের মূল’ ইত্যাদি নীতিবাক্য পড়তাম। যে স্যাররা ক্লাসে পড়াতেন সমাজে তাদের একটা বিশ্বাসযোগ্যতা ছিল। স্যাররা বাস্তব জীবনে যা ছিলেন, ক্লাসেও সেরকম ব্যবহার করতেন। আর এখন? শিক্ষকদের একটা অংশ কানে-কানে, ইশারায়, অনেকে প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে নিজের দল ভারী করার চেষ্টা করেন। স্কুল-কলেজের শিক্ষকদের এই দুনম্বর অংশটা ছাত্র-ছাত্র দখলের চেষ্টা করেন প্রাইভেট পড়িয়ে বাড়তি ইনকামের আশায়। নিজেদের সামর্থ্য এবং কারিশমা  বোঝানোর জন্য লোভী শিক্ষকদের এই অংশটা প্রশ্ন ফাঁস পর্যন্ত করতে লজ্জা পাচ্ছেন না। অনেক ছাত্র/ছাত্রীর কাছে সেই ভালো শিক্ষক, যে নিজের স্কুলের প্রশ্ন ফাঁস করে দেন, উত্তর বলে দেন, পরীক্ষার হলে নিজে না হোক, প্রতিনিধি পাঠিয়ে সহযোগিতা করেন। এমনও হয় বলে শুনেছি যে, পরীক্ষার কেন্দ্রে কেন্দ্রে বোঝাপড়া হয়। সাধারণত একটা স্কুলের কেন্দ্র হয় অন্য স্কুলে। ফলে এ প্লাস বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় ভালো করা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই এক স্কুল আরেক স্কুলের সাথে মৌখিক চুক্তিতে অনিয়মের কারবার করেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নৈতিকতার মান নিয়েও ইতিমধ্যেই সমাজে অনেক প্রশ্ন উঠেছে। চোখের সামনেই ঘটে যাওয়া অনেক ঘটনা থেকে বলা যায়, নৈতিকতার প্রশ্নে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষক সমান পরিচ্ছন্নতা দেখাতে পারেননা। কোনো জনপ্রিয় শিক্ষককে ঘায়েল করার জন্য বিশ্ববিদালয়ে অন্য কোনো শিক্ষক বা শিক্ষকবৃন্দ ছাত্র-ছাত্রীদের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেন।

অনেক ভিসি বিরোধী আন্দোলনে বা ক্যাম্পাসকে অস্থিতিশীল করার জন্য কোনো স্বার্থান্বেষী শিক্ষকগ্রুপ নানা অনৈতিক কাজের আশ্রয় নিয়ে থাকেন। সেসব কাজে কখনো কখনো ব্যবহার করা হয় ছাত্র-ছাত্রীদের। এভাবে কেউ কেউ ছাত্র-ছাত্রী ভাগিয়ে নিজের আধিপত্য চর্চা কিংবা প্রতিপক্ষ সহকর্মীকে ঘায়েল করার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেন। ফলে কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের কাছে লাই পেয়ে অনুকূল পরিবেশে অনেক ছাত্র-ছাত্রীও দুনম্বরি চর্চা করা শুরু করে।

তবে বিশ্ববিদ্যালয় লেভেলে কাউকে নীতি-নৈতিকতা বা সততার শিক্ষা দেয়া খুব সহজ হয় না। যে ছাত্র/ছাত্রী পরিবার থেকে, স্কুল-কলেজ থেকে অনিয়ম, চালাকি, ধূর্ততা , অসততা শিখে আসে তার মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় লেভেলে পরিবর্তন আনা সহজ কাজ হয় না। নীতি-নৈতিকতা একটা মানসিক বিষয়, যা তৈরি করতে পারে পরিবার, স্কুল এবং ধর্ম। আইন দিয়ে, লেকচার দিয়ে এগুলো শেখানো যায় না। পরিবারের শিক্ষা বড় শিক্ষা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পরিবার বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও বড় প্রতিষ্ঠান।

সেই পরিবারে এখন কী হচ্ছে? পত্রিকায় দেখলাম স্কুলড্রেস পড়া ছাত্র-ছাত্রীর দল পরীক্ষা শুরুর আগে ফাঁস হয়ে যাওয়া প্রশ্ন বাবা-মা এবং শিক্ষকের উপস্থিতিতে সমাধান করছে! এ নিয়ে দেশের শীর্ষ একটি সংবাদপত্রে বিশেষ প্রতিবেদনও ছাপা হয়েছে। সাংবাদিক ছবি তুলতে যাওয়াতে তার দিকে তেড়ে এসেছে ছেলে-মেয়ের বাবা-মা ও তাদের শিক্ষক! এ কেমন সমাজ হয়ে গেল আমাদের।

দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন হচ্ছে, কিন্তু এদিকে যে সমাজের মেরুদণ্ডটাই ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। আপন জূয়েলার্স এর ‘অর্থনীতি’ও কিন্তু বেশ ভালো ছিল। কিন্তু এত শান-শওকত দিয়ে কী হল? বনানীর নারী ধর্ষণের ঘটনায় গ্রেপ্তারকৃত আপন জুয়েলার্স এর মালিকের ছেলের প্রতিদিনের খরচ নাকি ছিল দুই লাখ টাকা! এত সোনার ছেলে সোনা দিয়ে কী আকামটাই না করল!

আপনার সন্তানকে আপনি কী শেখাচ্ছেন? গাড়ি নিয়ে সন্তানের সামনে সিগন্যাল ভঙ্গ করে ভাবছেন দারুণ একটা চালাকি করলেন! আপনার সন্তান গাড়িতে বসে ললিপপ চুষছে, আপনি বা আপনার ড্রাইভার বিকট হর্ন দিয়ে আতংক সৃষ্টি করছেন। অথচ সামনের রিকশায় কিন্তু আরেকটি শিশু বসে আছে, যার কানে, মগজে ভয়াবহ প্রভাব ফেলছে এই হর্ন, অথচ আপনি নির্বিকার পত্রিকা পড়ছেন না হয় হর্ন বাজাচ্ছেন।

মোটর সাইকেলের পেছনে বসিয়ে সন্তানকে নিয়ে স্কুলে যাওয়ার সময় ফুটপাত দিয়ে চালিয়ে যাচ্ছেন। ভাবছেন যাক একটু সময়তো বাঁচানো গেল। সন্তানকে যে দুনম্বরি শেখাচ্ছেন সেটি কি একবারও ভেবে দেখেছেন। শিশু পার্কগুলোতে গেলে দেখা যায়, লাইন ভেঙে কীভাবে বাচ্চাকে আগে আগে রাইডে উঠানো যায় সে চেষ্টা করছে কিছু বাবা-মা। শিশু পার্কে গিয়ে নির্মল আনন্দ-বিনোদন পাওয়ার বদলে কিছু শিশু শিখছে কীভাবে চুরি করে আগে যাওয়া যায়। কিন্তু এই আগে যাওয়া তো আগে যাওয়া নয়, অনেকদিনের জন্য পিছিয়ে পড়ার সূচনা কেবল।

বাবা-মা যদি এভাবেই তাদের সন্তানদের দুনম্বরি শেখাতে থাকেন, স্কুল-কলেজের শিক্ষকরা যদি এভাবেই বাড়তি কিছু উপার্জনের আশায় সমস্ত নীতি-নৈতিকতা বিসর্জন দেন তাহলে এই সমাজ টিকবে না। আমি ধ্বংস হলে আপনিও ধ্বংস হবেন। আমার ঘরে আগুন লাগলে, আপনার ঘরেও যেতে পারে সে আগুন।

লেখকঃ সহকারী অধ্যাপক, সাংবাদকিতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়