স্মৃতিতে ভাস্বর আমার সেই প্রাক্তন ছাত্রের কথা | আলী আকবর

আলী আকবর

প্রতি দিনের মতো বাসে করে বিদ্যালয়ে যাচ্ছিলাম। গন্তব্য টঙ্গী শিল্প এলাকা। ব্যক্তিগত কাজে গাজীপুর চৌরাস্তা নামতে হল। কাজ সেরে টুপ -টুপ বৃষ্টির কারনে পরিবহনে উঠতে না পেরে, জাগ্রত চৌরঙ্গীর পূর্ব পাশে আনমনা হৃদয়ে দাঁড়িয়ে আছি। শত শত বাস, ট্রাক আর বড় লোকদের বিলাস বহুল প্রাইভেট কার এর হর্ণের আওয়াজে কর্ণদ্বয়ে জ্বালাপোড়া লাগচ্ছিল। উপায় নেই। বৃষ্টি না থামলে বাসে উঠতে পারবো না। ঠিক সে সময় হঠ্যাৎ, একটি আর্মি জীপ গাড়ি এসে থামল আমার সামনে। গাড়ি থেকে নামলেন এক আর্মি অফিসার। বুকে লাগানো নেইম প্লেট দেখে বুঝতে পারলাম তিনি এক জন আর্মি মেজর। হাঁ, তিনি আমার দিকেই আসছেন। জীবনে কোন দিন থানা- পুলিশের ঝামেলায় পড়িনি। এক জন আর্মি অফিসারকে আমার দিকে চোখ রেখে এগিয়ে আসতে দেখে , আমি প্রথমত হতচকিত হয়ে পড়লাম। না, খানিকক্ষ পর আমার সে ভুল ধারনা ভেঙ্গে গেল , যখন ঔ আর্মি অফিসার আমার কাছে এসে বৃষ্টি জনিত কারনে আটকে পড়া শত শত মানুষের সন্মুখে আমার পাঁ ছুঁয়ে সালাম করে বলল’,স্যার আমি রায়হান মাহমুদ । আপনি কি আমাকে চিনতে পরেছেন? পঁচিশ বছর পুর্বে আমি আপনার ছাত্র ছিলাম”। এত বছর পুর্বের কিশোরের পরিবর্তিত চেহারা আমার না চেনারই কথা। উল্লেখিত নামটি উচ্চারণ করায় আমার চোখের সামনে ভেসে উঠল, পঁচিশ বছর আগের সেই রায়হানের ছবি -যে ছি ল আমার বিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থীদের মাঝে অন্যতম। থাক সে কথা। পরিচয় পর্ব শেষে আমার ঐ প্রাক্তন ছাত্রটি বিনীত ভাবে আমাকে একটু নির্জন স্হানে যেতে বলল।অপেক্ষাকৃত কম লোকালয়ে গেলে সে আমার হাত ধরে বলল,”স্যার, পঁচিশ বছর আগের আপনার সেই সাহায্য আমি এখনো ভুলতে পারিনি। বাবা চাকুরি হারিয়ে আমাদের সংসারে অভাব যখন ছিল নিত্য সাথী, সেই সময়ে আপনি সমুদয় টাকা দিয়ে আমার এস, এস,সি ফর্ম পূরণ করে দিয়ে ছিলেন। সে দিনের সে স্মৃতি আমাকে আজো তাড়া করে ফেরে। আমি তাকে বললাম- “বাবা। রাখ ওসব কথা। তোমার দুর্দিনে অন্য দশ জন শিক্ষকের মত এটা ছিল আমার কর্তব্য। আমার সৌভাগ্য যে, তুমি আজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছ। আমি গর্ব করে বলতে পারবো আমার হাতে গড়া আমার শিক্ষার্থী আজ আলোকিত মানুষ হয়েছে।একজন শিক্ষক হিসেবে এটাই আমার পরম প্রাপ্তি।” কথা বলতে বলতে আমার মেজর ছাত্র আমাকে এক লাইব্রেরীতে নিয়ে আসল। পছন্দের একগাদা বই কিনে উপহার দিয়ে তার বিলাস বহুল গাড়িতে বসাল। পথ চলতে চলতে আমার প্রিয় বিদ্যাপীঠে পৌছে গেলাম। সে দিন থেকে আজ অবধি তার স্মৃতি গুলো আমাকে অনুরণিত করছে। ভাবছি, অবক্ষয়ের এ যুগেও কিছু সোনার মানুষ আছে- যারা শিক্ষকদের সন্মান করতে জানে।নিজের বড়ত্ব প্রকাশ না করে শিক্ষকদের সবার উপরে স্হান দেয়। আমাদের হৃদয় নিংড়ানো শত আর্শিবাদ, দোয়া আর ভাল বাসা শুধু তাদের তরেই।

লেখক: শিক্ষক/কলামিস্ট ও বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি, গাজীপুর জেলা শাখার সাধারন সম্পাদক।