হান্নান শাহ‘র প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী স্মরণে

অধ্যাপক শামসুল হুদা লিটন: বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ ও ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাসী জনতার বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অবঃ) আসম হান্নান শাহ্ আজ আর আমাদের মাঝে নেই । অগনিত ভক্তদের চোখের পানি মুছতে না মুছতেই বছর ঘুরে চলে আসল শোকবহ ২৭ সেপ্টেম্বর, তার প্রথম মৃত্যু বার্ষিকী। গত বছর  ২০১৬ সালের এই দিনে  পৃথিবী ছেড়ে না ফেরার দেশে চলে গেছেন বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অবঃ) আ স ম হান্নান শাহ্। তাকে হারিয়ে সারা দেশ  বিশেষ করে জন্মস্থান কাপাসিয়ার জাতীয়তাবাদী দলের নেতা-কর্মী, সমর্থকদের চোখে-মুখে এখনো ভাসছে প্রিয় নেতা হারানোর শোক ও ব্যাথা । তিনি ছিলেন বিএনপি দলীয় নেতা –কর্মীদের অভিভাবক ও ভরসার ঠিকানা। তার জানায়ায় লাখো মানুষের ঢলই প্রমাণ করে তিনি কতো বড় মাপের ও কতো জনপ্রিয় নেতা ছিলেন। তিনি যেমন মানুষকে ভালোবেসে ছিলেন, মানুষও শেষ বিদায়ের দিন চোখের জল ফেলে ভালোবাসার ঋণ পরিশোধের কিছুটা হলেও চেষ্টা করে ছিলেন।

হান্নান শাহ্ ছিলেন জিয়া পরিবারের খুবই বিশ্বস্ত, আপনজন । ছিলেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের যোগ্য সহচর ও জাতীয়তাবাদী আদর্শের পরীক্ষিত সৈনিক। অকতোভয়ে প্রতিটি দুঃসময়ে তিনি জিয়া পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন । জিয়া পরিবারের সাথে কখনো বিশ্বাস ঘাতকতা করেননি। জেল জুলুম হুলিয়া মাথায় নিয়েই তিনি জিয়া পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন বারবার। এক এগার পরবর্তী ফখরুদ্দীন-মঈনুদ্দীনের দুঃশাসনের সময় যখন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের পরিবার ও দলকে নির্মূল করার গভীর ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছিল তখন অনেকেই ছিল নির্বাক কিংবা নিশ্চুপ । মিডিয়ায় কথা বলাতো দূরের কথা,  কেউ যখন টু শব্দটি করার সাহস পাচ্ছিল না, ঠিক তখনই সকল নীরবতা ভেঙ্গে গর্জে উঠেছিলেন যেই নেতা তার নাম হান্নান শাহ। হান্নান শাহ্ সেই দুঃসময়ে বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে বিদেশে পাঠানোর ষড়যন্ত্র এ দেশের মানুষ কখনে মেনে নিবেনা । একই সাথে তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে দাবী করেছিলেন দেশ নেত্রী শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে আসতে বাধা দেয়া যাবেনা।

হান্নান শাহ্ ছিলেন সময়ের সাহসী সন্তান, প্রতিবাদী ও সাহসী রাজনীতিবিদ। মুখ চেয়ে তিনি কখনো কথা বলেননি । সত্যকে তিনি সত্যই বলতেন । সত্যকে আড়াল করে কৌসলে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে অন্য কথা বলা তিনি আদৌ পছন্দ করতেননা। সোজা সাপ্টা কথায় বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি প্রায়ই বলতেন ,“আল্ হাক্কু মুররুন” অর্থাৎ সত্য কথা তিতা। তিনি বলতেন, আমি আল্লাহ ছাড়া কাউকেই ভয় পাই না। তাঁর এই চরম সত্য প্রকাশকে অনেকে পছন্দ করতেন না  এটা জেনেই তিনি বারবার সত্য আবিষ্কারের চেষ্টা করেছেন। সাহস করে সত্য বলার পুরস্কার হিসেবে পেয়ে ছিলেন বাংলাদেশের মানুষের ভালোবাসা।

হান্নান শাহ্ ছিলেন নির্ভীক ব্যক্তিত্বের অধিকারী। রাজনীতির নামে ভন্ডামী কিংবা সস্তা জনপ্রিয়তা অর্জনের অপকৌশলের বিরোধী ছিলেন তিনি। তিনি সুশৃঙ্খল জীবন যাপন করতেন। নিয়মানুবর্তীতা ছিল তার জীবনের পাথেয়। তিনি সব সময় সময়ের গুরুত্ব দিয়ে চলতেন।যথা সময়ে  সভা সমাবেশে হাজির হতেন। সময়ের  কাজ ঠিক সময়েই করতেন।

হান্নান শাহ্ ছিলেন বর্ষিয়ান তুখোর রাজনীতিবিদ। তিনি ছিলেন বিএনপির কান্ডারী ও আলোকবর্তিকা। ইসলামী মূল্যবোধকে তিনি মনে-প্রাণে বিশ্বাস  ও লালন করতেন। মুসলিম চেতনা বুকে ধারণ করেই রাজনীতি করতেন। আধিপত্যবাদী, সাম্রাজ্যবাদী, ভ্রাম্যন্যবাদী, ইহুদী, খৃস্টান অপশক্তি যখনই মুসলমানদের উপর আক্রমন-নির্যাতন করেছে তখনই তিনি সিংহের মতো গর্জে উঠেছিলেন। বর্তমানে মায়ামারে মুসলিম রোহিঙ্গাদের ওপর চলছে ইতিহাসের সবচেয়ে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ। এ সময়ে প্রয়োজন ছিল হান্নান শাহ্’র  মতো সাহসী প্রতিবাদী কণ্ঠস্বরের। একজন মানুষের মধ্যে যতটুকু পার্সনালিটি থাকার কথা সবটুকু তার মধ্যে ছিল। পার্সনালিটি ছিল হান্নান শাহ্’র চরিত্রের নান্দনিকতা ও সৌন্দয্য।

তিনি ছিলেন ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান।তার রাজনৈতিক ও কর্মজীবন ছিল বর্নাঢ্যময়। ক্ষণজন্ম এই কালজয়ী রাজনীতিকের জীবন ছিল পরিচ্ছন্ন ,পরিপাটি ও সংগ্রাম মূখর। তিনি ছিলেন বহুমূখী প্রতিভার অধিকারী। ছিলেন মেধাবী ছাত্র। পেশাগতভাবে ছিল সফল সৈনিক জীবনের অধিকারী। ছিলেন কৃতি খেলোয়ার,  সমাজকর্মী ও অনলবর্ষী বক্তা । টকশোতে তার ক্ষুরধার যুক্তিনির্ভর আলোচনা শোনা জন্য টিভি সেটের সামনে দর্শক-শ্রোতার ভীড় জমতো।

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অবঃ) আ স ম হান্নান শাহ্ ছিলেন বৃটিশ বিরোধী “ফকির আন্দোলন” এর পথিকৃৎ ফকির মজনু শাহ্ এর সুযোগ্য চতুর্থ প্রজন্ম, অর্খাৎ ফকির আন্দোলনের নেতা মজনু শাহ্ ছিলেন হান্নান শাহ্’র পিতার দাদা।

হান্নান শাহ্ ১৯৪২ সালে কাপাসিয়া উপজেলার ঘাগটিয়া গ্রামে সমভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম গ্রহন করেন। তার পিতা ফকির আব্দুল মান্নান ছিলেন পাকিস্তান আমলের খাদ্যমন্ত্রী, মুসলিম লীগ নেতা  ও বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের প্রথিতযশা আইনজীবী। ১৯৫৬ সালে ঢাকার সেন্টগ্রেগরি স্কুল থেকে মেট্রোকোলেশন পাস এবং ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। ১৯৬০ সালে বিএসসি অধ্যয়ণকালে পূর্ব পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন। ১৯৬২ সালে সামরিক একাডেমি কাকুল থেকে কমিশন প্রাপ্ত হন। এরপর তিনি পাকিস্তানের বিভিন্ন সেনানিবাসের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৩ সালে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পদে থাকাকালীন সময়ে এরশাদ সরকার বাধ্যতামূলকভাবে তাকে অবসর প্রদান করেন।তার ছোট ভাই শাহ আবু নঈম মোমিনুর রহমান সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি ছিলেন।

তিনি ছিলেন,বাংলাদেশের প্রথম “এটর্নী জেনারেল” ফকির শাহাবুদ্দিন এর চাচাতো ভাই।

সৈনিক জীবনে হান্নান শাহ ছিলেন বগুড়া, পার্বত্য চট্টগ্রামের বিগ্রেড কমান্ডার, চট্টগ্রামের মিলিটারি একাডেমির কমান্ডেন্ট, যশোর স্কুল অব ইনফ্রেন্টি অ্যান্ড টেকটিক্স এর প্রধান প্রশিক্ষক। পাকিস্তানের কোয়েটার আর্মি কলেজ অব ইলেক্ট্রিক্যাল অ্যান্ড মেকানিংক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের প্রশিক্ষকসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে পালন করেন হান্নান শাহ। ১৯৮১ সালে ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে একদল বিপদগামীর হাতে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যে রাঙ্গুনিয়া থেকে প্রেসিডেন্টের মরদেহ ঢাকায় নিয়ে আসেন হান্নান শাহ। তিনি চট্রগ্রাম থেকে জিয়ার লাশ এনে ঢাকার চন্দ্রিমা উদ্যানে দাফনের ব্যবস্থা করতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন।

এইচ এম এরশাদ সরকার হান্নান শাহকে সেনাবাহিনী থেকে বাধ্যতামূলক অবসর দেয়।স্বৈরাচার এরশাদ-বিরোধী আন্দোলনে আ স ম হান্নান শাহ কয়েকবার কারাগারে যান। তিনি সরকারের সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (এপিডি) ও বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের (বিএডিসি) এর  চেয়ারম্যানও ছিলেন। তিনি ১৯৮৩ সালে বিএডিসির চেয়ারম্যান পদ থেকে পদত্যাগ করে বিএনপিতে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দেন। রাজনৈতিক জীবনে শুরুতে ১৯৮৩ সালে হান্নান শাহ মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক, ১৯৮৬-১৯৯৩ সাল পর্যন্ত দলের সাংগঠনিক সম্পাদক (ঢাকা বিভাগ) এবং ১৯৯৩-২০০৯ সাল পর্যন্ত দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্যের দায়িত্ব পালন করেন।

বর্ণাঢ্য সামরিক জীবনের অধিকারী আ স ম হান্নান শাহ  গাজীপুর জেলা বিএনপির সভাপতির দ্বায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯১ সালে গাজীপুর- ৪(কাপাসিয়া) থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং খালেদা জিয়ার সরকারের পাট ও বস্ত্রমন্ত্রী ছিলেন তিনি।

২০০৯ সালে বিএনপির পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলে আ স ম হান্নান শাহ দলীয় সবোর্চ্চ ফোরাম স্থায়ী কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। ষষ্ঠ কাউন্সিলেও তিনি এই পদে পুনর্র্নিবাচিত হন। হান্নান শাহ ছিলেন মিডিয়া ব্যক্তিত্ব। বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে তার ক্ষুরধার যুক্তি বক্তব্যের কারণে দর্শকদের কাছে তিনি ছিলেন খুবই জনপ্রিয়।

হান্নান শাহ্ কৃতি ফুটবলার, হকি ও গল্ফ খেলোয়ার ছিলেন । তিনি ১৯৫৮ সালে ঢাকার ওয়ান্ডার্স কাবের গোল রক্ষক ছিলেন। তিনি বক্সিংয়ে সেনাবাহিনীতে রেকর্ড তৈরী করেছিলেন। বাংলাদেশ সুটিং ফেডারেশনের সভাপতিও ছিলেন। পৃথিবীর ৫০ টির মত দেশ ভ্রমন করেছেন।রাজনৈতিক কারণে তার বিরুদ্ধে ৩০টির বেশি মামলা হয়ে ছিল। তিনি ছিলেন বাব বার কারা নির্যাতিত জননেতা।

তার র্দীঘ রাজনৈতিক জীবনে নির্বাচনী এলাকা  কাপাসিয়র  স্কুল, কলেজ, মসজিদ, মাদরাসা সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রাস্তার উন্নয়নে তার বিশেষ ভূমিকা ছিল। বিশেষ করে স্থানীয় শীতলক্ষ্যা নদীর উপর তার নির্মিত ‘ফকির মজনু শাহ সেতু’ স্মরণীয় হয়ে থাকবে।ফকির মজনুশাহ সেতু নির্মাণ হান্নান শাহ‘র অমরকীর্তি।হান্নান শাহ্ নেই কিন্তুু তার রাজনৈতিক আদর্শ ও কর্মকান্ড অমর হয়ে থাকবে তার অগনিত ভক্তদের কাছে। আল্লাহ যেন তাকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করেন। আমিন।

লেখকঃ অধ্যাপক শামসুল হুদা লিটন
কবি,সাংবাদিক ও কলামিষ্ট
মোবাইলঃ০১৭১৬৩৩৩১৯১