৮ বছর ধরে আহসান হাবিবের ‘রশি বাঁধা জীবন’

৮ বছর ধরে আহসান হাবিবের  ‘রশি বাঁধা জীবন’

নিয়াজ মোরশেদ, জয়পুরহাট :
পাগল বলে পরিবারের সদস্যরা তাঁকে প্রায় আট বছর ধরে আটকে রেখেছেন। বাড়ির সাথে লাগানো একটি আম গাছে রশিতে বাঁধা আছে ছাগল সেই গাছেই এক তরুণের পায়ে লোহার বালা পরিয়ে রশি দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে। তাঁর নাম আহসান হাবিব মন্ডল (২৪)। তিনি জয়পুরহাটের আক্কেলপুর উপজেলার উত্তর নলডাঙ্গা গ্রামের রিকসা-ভ্যানচালক দুদু মন্ডলের ছেলে।

কোন একদিন ওই গ্রামে শাবান হোসেন নামে আক্কেলপুর থানার এক কনস্টেবল এক ব্যক্তির নামে নোটিশ তামিল করতে গিয়ে তাঁর চোখে তরুণকে বেঁধে রাখা দৃশ্যটি পড়ে। এরপর তিনি কয়েক বার গ্রামটিতে গিয়ে একই দৃশ্য দেখতে পান। তিনি অমানবিক দৃশ্যটি দেখে তরুণের অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে তাঁকে বেঁধে রাখার কারণ জানতে পারেন। তিনি বিষয়টি গণমাধ্যম কর্মীদের নজরে আনেন।

গত বুধবার দুপুরে গিয়ে দেখা যায়, একটি মাটির বাড়ির দেয়ালের পাশে একটি আমগাছে রশি দিয়ে ছাগল বেঁধে রাখা আছে। সেখানেই এক তরুণকে তাঁর পায়ে লোহার বালা পরিয়ে লম্বা রশিতে দিয়ে আমগাছটিতে বেঁধে রাখা হয়েছে। এঅবস্থায় তরুণটি মাটিতে উবত হয়ে ঘুমাচ্ছিলেন। পরিবারের সদস্যরা তাঁকে ডাকাকাকি করে ঘুম থেকে জেগে তোলেন। আপনার নাম কি জানতে চাইলে তিনি শুধু তাকিয়ে থাকেন। কয়েক বার জিজ্ঞেস করেও তাঁর মুখ থেকে কোন জবাব পাওয়া যায়নি।

গ্রামবাসীরা জানান, রিকসা-ভ্যানচালক দুদু মন্ডলের চার সন্তান। তাঁর দুই ছেলে ও দুই মেয়ে। সন্তানদের মধ্যে আহসান হাবিব মন্ডল দ্বিতীয়। আহসান হাবিব চৌদ্দ বছর বয়সে ভ্যান চালাতে শুরু করে। দুই বছর ভ্যান চালানোর পর তার মাথা খারাপ হয়। তিনি গ্রামে বিদ্রুপ শুরু করেন। তখন আহসান হাবিবের অত্যচারে অতিষ্ট হয়ে তার মা-বাবা তার পায়ে লোহার বালা পরিয়ে তাঁকে রশি দিয়ে বেঁধে রাখা শুরু করেন। প্রথমে শরীরে কাপড়- চোপড় রাখত এখন আর শরীরে কোন কাপড় রাখতে চায় না। তাই এখন সব সময় গামছা দিয়ে তার লজ্জা স্থান ঢেকে রাখা হয়। ঝড়-বৃষ্টি হলে তাঁকে বাড়ির ভেতরে নিয়ে যায়।

আহসান হাবিবের মা কহিনুর বেগম বলেন, ছোট বেলায় আহসান ভালো ছিল। সে ভ্যান চালাতো। হঠাৎ করেই ছেলেটার মাথা খারাপ হয়ে গেল। বহু কবিরাজ দেখিয়েছি কেউই ছেলেটাক ভালো করতে পারেনি। এখন কথাবার্তা ঠিকমত বলতে পারে না। যতই দিন যাচ্ছে ততই পাগলামী বাড়ছে। গরীব মানুষ টাকার অভাবে ছেলেটাক ভালো চিকিৎসা করতে পারিনি। আট বছর ধরে পায়ে বালা পরিয়ে রশি দিয়ে বেঁধে রেখেছি।

আহসান হাবিবের বাবা দুদু মন্ডল জানান, তিন বছর আগে আহসান হাবিবকে বগুড়ার একটি বেসরকারি কিনিকে চিকিৎসা করাতে নিয়ে গিয়েছিলেন। ডাক্তার দেখে বলেছিন আহসান হাবিব সুস্থ হবে। ডাক্তার চিকিৎসা খরচা বাবদ ৩২ হাজার টাকা চেয়েছিলেন। চিকিৎসার টাকা জোগাড় করতে না পারায় আর ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়নি। এত টাকা-পয়সা খরচা করার সামর্থ তাঁর নেই। তাই তিনি ছেলেবে কবিরাজ দেখিয়েছেন কিন্তু সুস্থ হয়নি। বাধ্য হয়ে ছেলের পায়ে বালা পরিয়ে বেঁধে রেখেছেন।

রুকিন্দীপুর ইউপির সাত নম্বর ওর্য়াডের সদস্য ফরিদ হায়দায় বলেন, দুদু মন্ডল গবীব মানুষ। তার এক ছেলে ভারসাম্যহীন বলে শুনেছি।

আক্কেলপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ রাধেশ্যাম আগরওয়ালা বিজ্ঞাপন চ্যানেলকে বলেন, জম্মগতভাবে অনেকেই মানসিক প্রতিবন্ধী হন। চিকিৎসা দিলেও তাঁদের সুস্থ করে তোলা সম্ভবপর হয়ে ওঠে না। আহসান হাবিব জম্মগতভাবে মানসিক প্রতিবন্ধী নয় তাই চিকিৎসা দিলে সুস্থ হতে পারে।