আজ বৃহস্পতিবার | ১৩ ডিসেম্বর, ২০১৮ || ২৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ || সময় ০৪:৩৯ পূর্বাহ্ন
photo

জন্ম দিনের শ্রদ্ধাঞ্জলী : কাপাসিয়ায় তাজউদ্দীন আহমদের নামে বিশ্ববিদ্যালয় চাই

     রবিবার, ২২ জুলাই, ২০১৮

Photo
মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম মহানায়ক প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ

মোহাম্মদ মনজুরুল হক গাজী : ১৯২৫ সালের ২৩ জুলাই মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম মহানায়ক বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী বঙ্গতাজ তাজউদ্দীন আহমদ গাজীপুরের কাপাসিয়ার রায়েদ ইউনিয়নের দরদরিয়া গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মৌলভী মো. ইয়াসিন খান ও মাতা মেহেরুননেসা খানম।

চার বোন ও তিন ভাইদের মধ্যে তাজউদ্দীন আহমদ ছিলেন দ্বিতীয়।

তাজউদ্দীন আহমদ শৈশব ও কিশোর বয়স পেরিয়ে যৌবনে পর্দাপণের প্রারম্ভেই দেশ ও দেশের মানুষের মঙ্গল চিন্তায় প্রগতিশীল ছাত্র রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। পরবর্তীতে দেশের প্রতিটি স্বাধীকার আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে জাতীয় রাজনীতির সম্মুখভাগে চলে আসেন।

বাংলাদেশের রূপকার জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শহীদ শেখ মুজিবুর রহমান এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত মুক্তিযুদ্ধকালীন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রথম প্রধানমন্ত্রী বঙ্গতাজ শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ - বাংলাদেশ তথা বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে দুই মহান রাজনীতিবিদ ও রাজনৈতিক নেতার নাম। মুক্তিযুদ্ধের ডাক, মুক্তিযুদ্ধ, বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন, বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠায় এই দুই মহান নেতার অবদান আজ বিশ্ব স্বীকৃত। দেশের এবং দেশের নিপীড়ত মানুষের নেতা হিসেবে দেশ স্বাধীনের পূর্বেই ১৯৬৯ এর ২৩ ফেব্রুয়ারি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এক ঐতিহাসিক সংবর্ধনায় জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছিল। অনুরূপভাবে বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে দেশবাসীকে অন্তর আলো দ্বারা সফল মুক্তিযুদ্ধ উপহার দেওয়ায় বিশেষ করে বঙ্গবন্ধুর পাশে থেকে বঙ্গবন্ধুকে রাজনৈতিক দিক নিদের্শনার আলো প্রদান করার স্বীকৃতি স্বরূপ গাজীপুরের কালিগঞ্জের জামালপুর কলেজ মাঠে ১৯৭২ সালে এক সংবর্ধনায় গাজীপুর বাসীর পক্ষ থেকে তাজউদ্দীন আহমদকে ‘বঙ্গতাজ’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গতাজ ছিলেন দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত রাজনৈতিক বন্ধু ও সহচর। এ প্রসঙ্গে শুধু বঙ্গবন্ধুর দু’টি উক্তি তুলে ধরছি। বঙ্গতাজ সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু বলেন-‘৪৪ সাল থেকে আমরা এক সাথে আছি।’ ‘ওকে (তাজউদ্দীনকে) ছাড়া কিন্তু সব অচল।’

বাঙালি জাতির সৌভাগ্য যে বঙ্গবন্ধুর মতো একজন নেতা পেয়েছিলেন আর বঙ্গবন্ধুর সৌভাগ্য যে তাজউদ্দীন আহমদের মতো একজন মেধাবী নেতা ও বন্ধু পেয়েছিলেন।

মূলত: তাজউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধে বিজয় লাভ এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ঘটনা - প্রবাহের মাধ্যমে তাজউদ্দীন আহমদ ইতিহাসের কিংবদন্তী হয়ে উঠেন। তিনি শিখিয়েছেন রাজনীতি ভোগের বিষয় নয়; ত্যাগের বিষয়।

মূল আলোচনায় আসা যাক- প্রতিবারের মতো এবারও দেশে জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে (জন্মভূমি কাপাসিয়ায়) বঙ্গতাজের ৯৪ তম জন্মদিন ও ৯৩ তম জন্মবার্ষিকী পালিত হচ্ছে। জাতীয় পর্যায়ে বিভিন্ন জাতীয় ও আর্ন্তজাতিক সেমিনার, আলোচনা সভা ইত্যাদি এবং স্থানীয় পর্যায়ে কাপাসিয়ায় এবার দশদিন ব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে তাজউদ্দীন আহমদের জন্মবার্ষিকী পালিত হচ্ছে। এসব অনুষ্ঠানে তাঁর কর্ম ও জীবনীর বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হচ্ছে- যেগুলো স্মরণীয় এবং অনুসরণীয়।

বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরেই যার স্থান তিনি হলেন জাতির সূর্র্য্য সন্তান বঙ্গতাজ শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ- তা আজ সর্বজন স্বীকৃত। বঙ্গতাজের ৯৩ তম জন্মদিন উপলক্ষে বঙ্গতাজ তাজউদ্দীন আহমদের নামে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রসঙ্গটি নিয়ে আলোচনা করতে চাই।

বাংলাদেশের বিভিন্ন জনপথে দেশের মহান ব্যক্তিদের নামে এবং তাঁদের স্মৃতি বিজড়িত স্থানে বেশ ক’টি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। যেমন - ঢাকায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯১১ সালে জাতির জনকের জন্মভূমি গোপালগঞ্জে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, মাওলানা ভাসানীর স্মৃতি বিজড়িত স্থান টাঙ্গাইলের সন্তোষে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে মাওলানা ভাষানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বেগম রোকেয়ার জন্মভূমি ও স্মৃতি বিজড়িত স্থান রংপুরে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়,  শের এ বাংলা এ.কে ফজলুল হকের নামে ঢাকায় শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, জাতীয় কবির স্মৃতি বিজড়িত স্থান ময়মনসিংহের ত্রিশালে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। ২০১৫-১৬ অর্থ বছরের বাজেটে পাঁচটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবনা করা হয়েছিল- যেগুলোর মধ্যে অন্যতম দু’টি ছিল বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতি বিজড়িত সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে ‘রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়’ এবং ঢাকার মিরপুরে ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয়’। বিশ্ববিদ্যালয় দু’টির কার্যক্রম দ্রুততার সাথে সম্পন্ন হচ্ছে।

গাজীপুরের কাপাসিয়ার দরদরিয়ায় বঙ্গতাজ শহীদ তাজউদ্দীন আহমদের সেই দোতলা বাড়ি, বাড়ির পাশে মডেল প্রাথমিক বিদ্যালয়, মসজিদ, পুকুর, লিচু বাগান, বাড়ির সামনে বিশাল মাঠ, পাশ ঘেসে মায়াবী গজারি বন- যেন বঙ্গতাজের পদচিহ্ন লেগে আছে সবখানে। উপজেলা স্কাউটিং প্রোগ্রাম সহ বিভিন্ন অনুষ্ঠান চলে এই বিশাল মাঠে,  সারা বছরই দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে স্কুল-কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থী এখানে শিক্ষা সফরে আসেন বঙ্গতাজের বাড়ি-জন্মভূমি দেখতে। তদুপরি রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের আগমন তো রয়েছেই। এই স্থানটিই হতে পারে তাজউদ্দীন আহমদ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উপযুক্ত স্থান। তাছাড়া কাপাসিয়ার পূর্ব প্রান্ত খিরাটিতে ১৯৭২ সালে এলাকাবাসী বঙ্গতাজের নামে কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছিল। শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ অর্থমন্ত্রী থাকা কালে তার হাত দিয়েই কলেজটি মঞ্জুরী প্রাপ্ত হয়েছিল এবং তিনি ছিলেন ঐ কলেজ প্রতিষ্ঠার প্রধান পৃষ্ঠপোষক। এখানেও রয়েছে বিশাল মাঠ- উন্মুক্ত স্থান অথবা কাপাসিয়া সদরে কাপাসিয়া ডিগ্রি কলেজের পাশে অথবা কাপাসিয়ার যে কোনো উপযুক্ত স্থানে বঙ্গতাজ তাজউদ্দীন আহমদ বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলা যায়।

বঙ্গতাজ তাজউদ্দীন আহমদের নামে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করার প্রসঙ্গটি জাতির সামনে তুলে ধরতে চাই। বিষয়টি সম্পর্কে বর্তমান সরকারের নীতি নির্ধারকগণ সর্বোপরি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃষ্টি আকর্ষন করতে চাই। আশা করি- বঙ্গতাজ তাজউদ্দীন আহমদের নামে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করার বিষয়টি মূল্যায়ণ ও বিশ্লেষণ পূর্বক কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।

লেখক: মোহাম্মদ মনজুরুল হক গাজী, কলেজ শিক্ষক ও সাংবাদিক, আজীবন সদস্য,

বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি। মোবাইলঃ ০১৯৪০১৯৪১১৪




photo
বিশেষ বিজ্ঞাপন