আজ বৃহস্পতিবার | ১৩ ডিসেম্বর, ২০১৮ || ২৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ || সময় ০৪:৩৫ পূর্বাহ্ন
photo

গাসিক: নবনির্বাচিত নগর পিতার নিরাপত্তা ভাবনা

     রবিবার, ১২ আগস্ট, ২০১৮

Photo
মেয়র জাহাঙ্গীর আলম

মোহাম্মদ মনজুরুল হক গাজী: গত ২৯ জুলাই রাজধানীর বিমান বন্দর সড়কে বাস চাপায় শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুইজন শিক্ষার্থীর মৃত্যু এবং ১৫ জনের আহত হওয়ার ঘটনার প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে পুরোদেশেই অস্থিরতা বিরাজ করছিল।   শিক্ষার্থীদের ৯ দফা দাবীর আন্দোলন দেশব্যাপি বিক্ষোপে রূপ নিলে এর সাথে যুক্ত হয় বিক্ষোপ আন্দোলন প্রতিহত করার জন্য সহিংস আক্রমন ও গণপরিবহনের অঘোষিত ধর্মঘট, ছাত্র ধর্মঘট।

টানা ৮/৯ দিনের ছাত্র আন্দোলন , বিক্ষোপ, ছাত্র আন্দোলন থামাতে পুলিশের প্রচেষ্টা, সহিংসতা, পরিবহন ধর্মঘট, ছাত্র ধর্মঘট ইত্যাদি ঘটনার প্রেক্ষিতে সরকারের নানামুখী কর্মসূচী ও পদক্ষেপে শিক্ষার্থীরা কাসে ও ঘরে ফিরে যাওয়ায় দেশ এখন শান্ত।

নিরাপদ সড়ক নিশ্চিতকরণ এবং সড়কে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের আন্দোলনে  শিক্ষার্থীদের সুনিদিষ্ট ৯টি দাবী ছিল-১.বাস চাপায় দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনায় নৌ-পরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানের দেয়া বক্তব্য প্রত্যাহার, নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা ও পদত্যাগ। ২.বেপরোয়া চালকের ফাঁসি দিতে হবে। এছাড়া  ঘাতক চালকদের ফাঁসির বিধান সংবিধানে সংযোজন করতে হবে। ৩. এম ই এস ফুট ওভারব্রিজ বা বিকল্প নিরাপদ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ৪. প্রত্যেক সড়কের দুর্ঘটনাপ্রবন এলাকায় স্পিড ব্রেকার দিতে হবে। ৫. সড়ক দুর্ঘটনায় শিক্ষার্থীদের নিহত হওয়ার দায়ভার সরকারকে নিতে হবে। ৬. শিক্ষার্থীরা বাস থামানোর সিগন্যাল দিলে  থামিয়ে তাদের বাসে তুলতে হবে। ৭. শুধু ঢাকা নয়, সারা বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের জন্য হাফ ভাড়ার ব্যবস্থা করতে হবে। ৮. ফিটনেস বিহীন গাড়ি চলাচল করতে দেয়া যাবে না। ৯. বাসে অতিরিক্ত যাত্রী নেয়া যাবে না।

শিক্ষার্থীদের এই ৯ দফা দাবী সম্বলিত আন্দোলন থামাতে সরকারের পক্ষ থেকে  বিভিন্ন কর্মসূচী ও পদক্ষেপের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল ৫ আগস্ট, রবিবার ঢাকার কাকরাইলস্থ আর্ন্তজাতিক মার্তৃভাষা ইনষ্টিটিউটে ঢাকা মহানগরীর সরকারি-বেসরকারি ২৪২টি স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসার ৬১৪জন অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ, প্রধান শিক্ষক ও সহকারি প্রধান শিক্ষকদের নিয়ে শিক্ষামন্ত্রীর বৈঠক। বৈঠকে শিক্ষামন্ত্রী মহোদয় প্রতিষ্ঠান প্রধানদের প্রতি আহ্বান জানান, তারা যেন- প্রতিষ্ঠানের সভাপতি ও শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের নিয়ে দ্রুততার সাথে সভার আয়োজন করে সরকারের পক্ষ থেকে এই মেসেজটি শিক্ষার্থীদের জানিয়ে দেয়-তোমাদের আন্দোলন সফল ভাবে এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব সরকারের। মাননীয় প্রধান মন্ত্রী তোমাদের (শিক্ষার্থীদের) সকল দাবী মেনে নিয়েছেন এবং এগুলোর বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে।

৬ আগস্ট সোমবার ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন আয়োজিত ডিসিসির নগর ভবনে-‘নিরাপদ সড়ক ও আমাদের করণীয়’ শীর্ষক এক মুক্ত আলোচনায় রাজধানীর ৪২১টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা অংশ নেন। মুক্ত আলোচনায় অংশ  নিয়ে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা জানান, সরকার আমাদের যৌক্তিক দাবী মেনে নিয়েছেন, সরকারের গৃহীত পদক্ষেপে আমরা সন্তুষ্ট। অবশেষে ৪২১ টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা কাসে ফেরার ঘোষণা দিয়ে কাসে ফিরে যায়।

সরকারি কর্মসূচীর অংশ হিসাবে অনুরূপভাবে ৫ আগস্ট, রবিবার  রাজধানীর অতি সন্নিকটে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের আওতাধীন স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, মাদ্রাসা সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধানদের সাথে নবনির্বাচিত মেয়র আলহাজ্ব এডভোকেট মো. জাহাঙ্গীর আলম মত বিনিময় করেছেন। দুপুরে টঙ্গী পাইলট স্কুল ও গার্লস কলেজ মিলনায়তনে টঙ্গী সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের অধ্যক্ষ মো.রফিকুল ইসলামের সভাপত্তিত্বে ‘চলমান ছাত্র আন্দোলনে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধানদের করণীয়’ শীর্ষক এই মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে মেয়র বলেন, ‘শুধু নিরাপদ সড়ক নয়, সব ক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে’।  মেয়রের এই উক্তিটির বিশেষ গুরুত্ব ও তাৎপর্য রয়েছে। গত ২৬ জুন এর নির্বাচনে নির্বাচিত মেয়র ২৬ জুলাই প্রধানমন্ত্রীর নিকট শপথ নিয়েছেন এবং আগামী ৫ সেপ্টেম্বর গাজীপুরের সিটি মেয়র হিসেবে দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন। মেয়রের নতুন কর্মস্থলের সবক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ নিয়ে তিনি ভাবছেন। ‘শুধু নিরাপদ সড়ক নয়, সবক্ষেত্রে নিরাত্তানিশ্চিত করা হবে-মেয়রের এই বক্তব্য আমাকে কাবু করে ফেলেছে অর্থাৎ খুবই ভাল লেগেছে এবং সেই  ভাল লাগা থেকেই মতবিনিময় সভা পরবর্তী আলোচনায় বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ সম্পর্কিত মেয়রের ভাবনাগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠেছে এবং মেয়রের নিরাপত্তা ভাবনাগুলোর সাথে নিজের ভাবনাগুলো মিলাবার জন্যই এই লেখনির অবতারণা।

নাগরিকদের নিরাপত্তার জন্য সুন্দর ও বাসযোগ্য নগরী গড়া, দুর্নীতিমুক্ত সিটি কর্পোরেশন, নাগরিকদের স্বাস্থ্য ও শিক্ষার নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ বিষয়ে মত বিনিময় সভায় মেয়র আরও বলেন, আপনাদের সার্বিক সহযোগিতায় গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনকে একটি সুন্দর ও বাসযোগ্য নগর হিসেবে গড়ে তোলা হবে। গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনে কোনো প্রকার দুর্নীতিকে বরদাশত করা হবে না। যদি কোনো ব্যক্তি নগর ভবনের কোনো কর্মকর্তা- কর্মচারীর বিরুদ্ধে ৫ হাজার টাকার দুর্নীতি ধরিয়ে দিতে পারেন, তবে তাকে ৫ হাজার টাকা পুরস্কার দেয়া হবে। তিনি গাজীপুরের প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কোথায় কী কী সমস্যা আছে তা লিখিত আকারে সিটি কর্পোরেশনকে জানানোর অনুরোধ করেন।

বন বাদাড়ের পাশে যারা বাড়ি বানিয়ে থাকেন তারা বন্য-হিস্র জীব-জানোয়ারের আক্রমন থেকে বাঁচার জন্য, রাতে নিরাপত্তার জন্য কপাটে খিল আটেন, শহরে-নগরে যাদের বাস তারাও রাতে চোর-ডাকাত-সন্ত্রাসীদের আক্রমন থেকে বাঁচার জন্য দরজায় সিটকানি দেন। রাজধানীর পাশ ঘেসে গাজীপুর সিটির অবস্থান হওয়ায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সড়ক পথে, রেলপথে এবং নৌ-পথে রাজধানীতে প্রবেশ করতে হলে গাজীপুর সিটির ভিতর দিয়ে যেতে হয়।

এমতাবস্থায়, গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের (জেসিসির) প্রবেশ পথগুলোতে- দক্ষিণে টঙ্গী ব্রীজ, উত্তরে, পশ্চিমে ও পূর্ব দিকে সড়ক সীমানায়, নৌ-পথ সীমানায় এবং রেলপথের সীমানায় কপাট লাগানো যায় কিনা অর্থাৎ সড়কপথে, রেলপথে এবং নৌ-পথে কোনো চোরাচালান ঢুকছে কিনা, মাদক পাচার হচ্ছে কিনা, কোনো সন্ত্রাসীর গমনাগমন হচ্ছে কিনা মেয়র এই বিষয়গুলো ভাবতে পারেন। তিনি জিসিসিকে মাদকমুক্ত সিটি কর্পোরেশন হিসেবে ঘোষণা করতে পারেন।

অনেকগুলো জাতীয় প্রতিষ্ঠান সহ গাজীপুর মহানগর মূলত: শিল্প নগরী, শিক্ষা নগরী এবং ব্যবসা কেন্দ্র। এখানে রয়েছে অনেক সরকারি-বেসরকারি অফিস-আদালত। মানুষের জন্যই উন্নয়ন, মানুষের জন্যই নিরাপত্তা। শিশু, শিক্ষার্থী, শ্রমিক, চাকুরিজীবি, ব্যবসায়ী সহ সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ মূলত: তিনটি স্থানে তার দৈনন্দিন ২৪ ঘন্টা সময় ব্যয় করে। ১. গৃহ বা বাসা/ বাড়িতে, ২. রাস্তায় বা সড়কে এবং ৩. কর্মস্থলে।

গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি, পয়:নিষ্কাশন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, ব্যক্তি আবাসস্থলে যাতায়াতের রাস্তাসহ আনুসঙ্গিক বিষয়ের ব্যবস্থাকরণের মাধ্যমে আবাসিকতার নিরাপত্তা বিধান করা যায়। এসব বিষয়ে সিটি কর্পোরেশনের সম্পৃক্ততা রয়েছে। অবশ্য ব্যক্তি পর্যায়ের নিরাপত্তা ব্যক্তিদের বা পরিবারের মাধ্যমেই নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের ফলে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ এবং আরও কিছু পদক্ষেপের মাধ্যমে রাস্তা বা সড়কের নিরাপত্তা বিধান সম্ভব। কর্মস্থলে সৌহার্দপূর্ণ অবস্থান, কর্ম পরিবেশ অনুকূল রাখা, নিরাপদ রাখা এটিও ব্যক্তি এবং প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ের বিষয়। এটি নির্ভর করে ব্যক্তি-বিশেষের মানস-কাঠামোর ওপর। তবে এ ক্ষেত্রেও মেয়র কোন সৃজনশীল পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারেন।

গাজীপুর মহানগরীতে শিল্পের প্রসারতা বিশেষ করে পোষাক শিল্পের বিস্তার লাভ করায় এসব শিল্প কারখানায় অনেক শ্রমিক কর্মরত। বিশেষ করে নারী শ্রমিক। বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রায়ই চোখে পড়ে এইসব নারী শ্রমিক সন্ধ্যার পর-রাতে কর্মস্থলে আসার পথে বা কারখানা থেকে আবাসস্থলে ফিরার পথে বিভিন্নভাবে নির্যাতন বা ভিকটিমের শিকার হন। আবার প্রায়ই খবরে দেখি এই গাজীপুর জোনে ট্রেন যাত্রীরা বিভিন্নভাবে ভিকটিমের শিকার হয়ে প্রাণ হারাচ্ছে। মেয়র এই বিষয়গুলো নিয়েও ভাবতে পারে। মেয়র নির্বাচিত হওয়ার আগেও মেয়রের যে দুটি কাজ নগরবাসী তথা গাজীপুরবাসীর প্রশংসা কুড়িয়ে ছিল- তার একটি হল- জাহাঙ্গীর আলম শিক্ষা ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সিটি কর্পোরেশনের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের বিভিন্নভাবে সহায়তা করা। অন্যটি ছিল- গাজীপুর চৌরাস্তা- বাইপাস সড়কে যানজট নিরসনে সহায়তা করার জন্য নিজ অর্থায়নে জনবল নিয়োগ করা।

যাক- এইসব কথা। এই তারুণ্যদীপ্ত নবনির্বাচিত মেয়রের হাত দিয়ে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন হবে বাংলাদেশ তথা বিশে^র জন্য অনুসরণযোগ্য মডেল (রোল মডেল) সিটি কর্পোরেশন। নাগরিকদের জন্য বাসযোগ্য, সুন্দরতম, উন্নত, পরিচ্ছন্ন নিরাপদ নগরী। মেয়রের নতুন কর্মস্থলে আগামীর পথ চলা হোক মসৃণ- সুন্দরতম।

লেখক: মোহাম্মদ মনজুরুল হক গাজী, শিক্ষক ও সাংবাদিক, আজীবন সদস্য-বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি




photo
বিশেষ বিজ্ঞাপন