আজ মঙ্গলবার | ১৬ অক্টোবর, ২০১৮ || ১ কার্তিক ১৪২৫ বঙ্গাব্দ || সময় ১১:০৪ পূর্বাহ্ন
photo

শেফালী বুয়া : জান্নাতুল ফেরদৌসী

     বৃহস্পতিবার, ২৮ জুন, ২০১৮

Photo
প্রতিকী ছবি : বুয়া

আইজও দেরি অইয়া গেল, কলিং বেলের আওয়াজ পাইয়া দড়জা খুলতেই মেডামের পরতেক দিন এক কতা “বুয়া তুমি আর একটু আগে আইতে পারো না?” আরে আমারও তো ঘরের কাম সামলাইয়া আইতে অয়, আমার মাইয়াডা পোলাডারে রাহে,হেরে কিছু খাওনের জিনিস কিন্না দিয়াে আইতে অয়। জোনাকির বাপে জাত হারামী ,পাতিলে কয়ডা ভাত থাকলে সব কয়ডা খাইয়া ঘরতন বাইর অইব।

একবারও তার মাইয়া পোলার কথা ভাবুনের সময় নাই।

আইজ বেশি দেরি অইয়া গেলো, কতা হুনন লাগবই। বেশি কাম কইরা অইলে ও মেডামরে আইজ খুশি করতে অইব,দেহি কয়ডা টেহা লইতে পারি কিনা। বালতিতে কাপড় ভিজাইতে ভিজাইতে শেফালী বুয়া বলে, আফাগো কোন চিন্তা কইরেন না সব এহনই কইরা ফালামু । হুদা আজাইরা কাম, ধোয়া কাপড় গুলা ধুইতে অয় একদিন পিনদুনের পর কি এমুন ময়লা অয়। কাপড় ভিজাইতে যাইয়া বাতরুমে সাহেবের পেন্টটা  দেইখ্যা তারাতারি চেক করলাম, যদি দুই একটা বড় নোট পাইয়া যাই। আইজ ভাগ্যডা খারাপ পাইলামনা কিছুই , হুদা কতডি টিসু পকেডে থুইয়া দিছে কিপটা বেডা্।সাহেবের পেন্ট ধুইলে বেশিরভাগ সময়ে কিছুনা কিছু পাই।

এই বাসায় একবছরের লাহান কাম করি, আমি আবার কোন বাসায় দুই-তিন মাসের বেশি কাম করতে পারিনা মেডামরা বাইর কইরা দেয়। আমারও মেজাজডা চড়া ,কামের মানুষ বইল্লা কি কোন দাম নাই? মেডামরা কিছু কইলে কামের পাছায় লাত্তি মাইরা আইয়া পরি।কামের অভাব নাই,বুয়া ছাড়া তগর মেডামগিরি ছুইট্টা যাইবো।এই বাসার মেডামডা ও যে ভালা তাও না, হারাদিন বেডি আমার লগে ক্যাঁও ম্যাঁও করে। “বুয়া ডাইনিং টেবিলের নিচটা ঝাড়ু দাওনি কেন? খাটের পাশে ময়লা জমা কেন? কাপড়ে সাবানের ফেনা কেন? এক কাপড়ের উপর আরেক কাপড় রোদে দিলে কেন? কাপড়ে ক্লিপ দেওয়ার কথা কতবার বলতে হবে তোমাকে? এ কাপড়ের রং যেনো অন্য কাপড়ে না লাগে...।আরে একটু জাগার মইধ্যে একগাট্টি কাপড় লারুন লাগে একটার উরফে আর একটা ত যাইবোই।

 আর হোটেলের লাহান দুনিয়ার খাওন রানবো, এই ঘরে ঢুকলে খাইছে আমারে সহজে কাম ফুরাইবো না। হের পরেও কইবো “বুয়া প্লেট বাসন ভালো করে ধুইতে পারো না? পাতিলে ভিমবার লাগিয়ে রাখো  কেন,ভিমবার একটু কম নিয়া মাজতে পারো না, বেসিনের নিছে ভালো ভাবে পরিস্কার করো”। বাপরে বাপ, একদিনও বেডির কেটকেডানি বন্ধ নাই। তয় মাঝে মধ্যে মনডা খুব ভালা থাকলে কইবো  বুয়া তোমার কাম আমার খুব পছন্দ হয়  তোমাকে ছাড়া আমার চলে না তহন খুশি অইয়া আমার হাতে কিছু দেয়, আইজ অহনও বুজতাছিনা।আইজ মাসের বাজার আইছে, দেহি মেডামরে কইয়া ফিরিজের আগের কিছু মাছ নেওন যায় কিনা। তরা খাবি আমাগো পেট নাই, তগর তো হুদা কামে বেহুদা  খরছ হেইল্লাগ্যা পুড়ায়না, আমি তগোডা  কইরা একটু নেই। যে মাসে কম নেই সে মাসেও বেডি কয় ,বুয়া সব এত তারাতারি  ফুরাইলো কেমনে? কিপটা বেডি , এতো পেয়াজ ,রসুন তেল তগো পেডেই যায়। আমি আর কতডি নেই, সুযোগ পাইলে দুইডা পেয়াজ, একখান রসুন, দুইডা আলু্, মাজে মধ্যে একটু তেল নেই।আমার রান্ধনে আর কি লাগে? কাপড় সিলাইন্না বেডিরে দিয়া ছায়ার(পেটিকোট) মইধ্যে দুইডা পকেট বানায়া লইছি। একবেলার খাওন দেয়, বাসি সালুন থাকলে এই বেডি আমারে দিয়া দেয় ।সব বাসার বেডিরা এক রহমনা, কোন বেডিরা ফিরিজে থুইয়া দুইদিন বাদে ময়লার ঝুড়িত ফালাইবো , ত দেওনের নাম কইতনা। একটু ভালামন্ধ আমাগো কি খাইতে মন চায়না? গরুর গোসত যে দাম কিন্না খাওনের উফাই নাই। আমি করি কি মাছ-মাংস পলিথিনে প্যাচাইয়া প্রথ্থম ময়লার ঝুড়ির এক্কেরে নিচে রাহি, হেরপর যাওনের সময় ঝুড়ি থেইক্কা ময়লা  পলিথিন ব্যাগে ডুকাইয়া ফালানের নাম কইরা  একবারে বাইর অই। ময়লার কাছে আইয়া ময়লা ফালাইয়া আমার মাছ মাংস ব্যাগ লইয়া বাড়ির পুতে হাডা ধরি। আহাম্মক বেডি কিছুই বুঝে না। তয় আফসোস মুরগীর মাংস  নিতে পারিনা।  ইচ্ছা কইরাই নেইনা ,একটা একটা  মুরগী ফিরিজতে বাইর করে, কয়ডা আর টুকরা অয়। হেইথেক্কা সরাইরে আবার টের পাইবো,তহন আমও যাইবো ছালাও যাইবো।হেইল্লাইগা লোভ  কম করি, আর অন্য বুয়াগো লাহান আমার এত লোভ নাই।  এই সুবিধার লাইগ্যাই এই বাসায় এতোদিন ধইরা পইরা রইছি। নাইলে এই বেডির  কেডকেডানি কেডা সইতো।

এই বেডির ঢং দেকলে গতর জ্বলে, দুইডা পোলাপানের মা অইছে অহনও স্বামীর লগে সোহাগ করতে করতে ঢইল্লা পড়ে। সকালে পোলাপাইন ইস্কুলে দিয়া শুরু অয় ফোনে রাজ্জাক শাবানার সিনেমা। বেডায় তো সকালেই গেলো, বেডায় কি কামে যায় নাই? হারাদিন রাইত তর লগে কতা কইলে বেডায় কাম করবো কেমনে? বেডারও আছে হ্যাবলাপনা, খালি বউ বউ করে। মাইসা  কোথায় গেলে গো, টাওয়েলটা দাওতো, এদিকে আসোতো, আমার গেঞ্জিটা কোথায় রাখলাম। দেখোতো এই শার্টের  সাথে কোন টাইটা ম্যাচ হয়? আজ একটা মিটিং আছে তারাতারি শেষ করে বাসায় ফিরবো, তারপর তোমাকে নিয়ে বাইরে খাবো। মাইসা কোথায় গেলে গো,  তোমাকে কতবার বলেছি আমি অফিসে যাওয়ার সময় তুমি রান্না ঘরে যাবেনা।এতো রঙ তামাসা দেখলে আমার শইলডা জ্বলে। আরে বেডা তর বৌ থেইক্কা আমার গায়ের রঙ খারাপ আছিলো না, তয় কফালডা খারাপ।আমারে জোনাকির বাপ  যহন পরথম দেখলো হের পরথন পিছ ছারেনাই। বস্তির কত মশার কামর খাইযা আমারে দেহনের লাইগ্যা খারাইয়া থাকতো।একদিন কয় তুই রাজি না অইলে  মইরা যামু। আমারে  একটা পাওডারের ডিব্বা দিয়া কইলো তুই এমনিতেই অনেক সুন্দর।কাম বাদ দিয়া দুইদিন ভালা কাপড় পিন্দাা ঘরে থাকলে শইলডা চকচক করবো। আমি এই রহম আছিলাম না , আমার ফুফাত ভাই কাজল তো মামুর বাড়ী র সম্পর্ক ছাড়ছে আমারে বিয়া করতে পারে নাই দেইক্কা।

আজকা কয়ডা টেহার দরকার, হেইল্লাইগ্যা পরিস্কার কইরা কাম করলাম। বেডিও আইজকা কাম দেখে খুশি অইয়া কইলো “ বুয়া তোমার কাজ দেখে ভালো লাগে তাই তোমাকে আমি পছন্দ করি, তবে মাঝে মধ্যে একটু অলসতা করো”।  আফা আমনের মনডা আইজ ভালা দেইক্কা আমারে ভালা কইছেন, এমন কোন বাসা পাইবেন্না আমার কামের বদনাম কইবো। আগের বাসার মেডাম আমারে খবর দিছে দেহা করার লাইগ্যা, আমি জানি  বুয়া পাইবো তয় আমার  ‍মুতন  পাইবো না।এইবার মেডাম একটু চিন্তায় পড়ছে দেইখ্খা সুযোগ বুইজ্জা কইলাম , আমারে আইজ কিছু  টেহা দিলে উপকার অইত। মেডাম পাঁচশো টেহার নোট দিয়া কইলো , বুয়া সামনের মাসে ছেলেটার পরিক্ষা ছুটি চাইবানা কিন্তু।

পরতেক মাসে কিছু টেহা জমাই জোনাকির বাপেরে না জানাইয়া, হেয় যা কামায় তা জুয়া আর গাজায় উড়ায়। আইজ ঘরে নাই, টেহাডা পুটলার মইধ্যে বাইন্ধা রাহি।  হঠাৎ চুরের মুতন কই খাড়াইয়া দেইক্কা এক পলকে খাবলা দিয়া পুটলিটা নিয়া গেলো জোনাকির বাহে।কত জুরাজুরি করলাম, হেয় আমারে চুলের মুডি ধইরা ফালাইয়া দিয়া লাত্তি উষ্টা দিয়া চলে গেলো । আমি হের লগে পারি নাই। জীবন সংগ্রামে সব জায়গাতেই লড়তে হয় ,কোথাও কোথাও স্বেচ্ছায় মেনে নিতে হয় পরাজয়। সূর্যাস্তের পর গভীর অন্ধকার কেটে গিয়ে আবার নতুন সূর্যোদয় জীবনের প্রত্যয়।

লেখকঃ জান্নাতুল ফেরদৌসী, রাজনীতিবিদ, কবি, সাহিত্যিক।




photo
বিশেষ বিজ্ঞাপন